হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে আরব বসন্তের কথা কি ৩ কোটি মিসরীয় জানেন

মিসরে হোসনি মোবারকবিরোধী গণ-আন্দোলনের ১৫ বছর পূর্ণ হয়েছেফাইল ছবি: এএফপি

মিসরে আরব বসন্ত শুরুর পর ১৫টি বসন্ত পেরিয়ে গেছে। এর মাত্র ১১ দিন আগে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট বেন আলীকে ক্ষমতাচ্যুত করেন আন্দোলনকারীরা। সেখানকার সফল গণ-অভ্যুত্থান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মিসরের জনগণও মুক্তি চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন তাঁদের কথাও যেন শোনা হয়।

বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ১৮ দিন ধরে সড়কে অবস্থান নেন মিসরের লাখ লাখ বিক্ষোভকারী। তাঁরা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পদত্যাগের দাবি জানান।

মিসরের জনগণের গড় বয়স প্রায় ২৪ বছর। বিশ্বের যেসব দেশে তরুণদের সংখ্যা বেশি, মিসর তার মধ্যে একটি। দেশটির প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৩১ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের কম। এই শিশুদের জন্য আরব বসন্ত এক ঐতিহাসিক ঘটনা, যা তারা বড়দের কাছ থেকে জেনেছে।

মিসরের তরুণ জনগণ

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে মিসরের জনসংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৩০ লাখ। বেকারত্বের হার ১২ শতাংশ। মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২ হাজার ৫৯০ মার্কিন ডলার। ওই সময় ১ ডলারে ৫ দশমিক ৮ মিসরীয় পাউন্ড পাওয়া যেত।

১৫ বছর পর মিসরের জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ বেড়ে ১২ কোটি হয়েছে। দেশটির বেকারত্বের হার কমে এখন ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। আর মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৩ হাজার ৩৩৯ মার্কিন ডলার। তবে এ সময় ডলারের বিপরীতে মিসরের মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়ন হয়েছে। বর্তমানে ১ মার্কিন ডলারে প্রায় ৪৭ মিসরীয় পাউন্ড পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি অনেক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।

মিসরের জনগণ তুলনামূলক তরুণ। দেশটির অর্ধেকের বেশি নাগরিকের বয়স ২৪ বছরের নিচে, যা বিশ্বের সব দেশের তরুণদের গড় বয়স ৩১ বছরের চেয়ে প্রায় ৭ বছর কম।

ইকোনমিক রিসার্চ ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, মিসরে প্রতিবছর ১৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান দরকার। কিন্তু গত দুই দশকে দেশটিতে বছরে মাত্র ছয় লাখের কর্মসংস্থান হয়েছে।

মিসরে ৩ কোটি ৭০ লাখ নাগরিকের বয়স ১৫ বছরের কম
ফাইল ছবি: রয়টার্স

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন কারিগরি ইনস্টিটিউটসহ প্রায় ৩৬ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। আধুনিক অর্থনীতির চাহিদা পূরণ করতে ২০৩২ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ৫৬ লাখে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

মিসরে ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। এর প্রায় পুরোটাই তরুণদের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে মোবাইল সংযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার বড় ভূমিকা রাখছে।

মিসরের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান সংস্থার (সিএপিএমএএস) তথ্য অনুযায়ী, বেকারত্বের হার রেকর্ড সর্বনিম্ন ৬ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এলেও ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার এখনো প্রায় ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ।

আরব বসন্তের সময় ১৮ দিনে মিসরে কী কী ঘটেছিল

২৫ জানুয়ারি ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে মিসরে আরব বসন্তের শুরু হয়, যা ১৮ দিন পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। অবশেষে ১১ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক পদত্যাগ করে সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা তুলে দেন।

আরব বসন্তের সময় মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মিসরীয়রা তাঁদের লড়াই-সংগ্রামের ছবি ও ভিডিও বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন।

আরও পড়ুন

সে সময়ের ১৮ দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রধান ঘটনা সংক্ষিপ্ত আকারে নিচে তুলে ধরা হলো—

২৫ জানুয়ারি: পুলিশের বার্ষিক অনুষ্ঠানের দিন সারা দেশে হাজার হাজার মানুষ মিছিল করেন। ৩০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পদত্যাগের দাবি ওঠে।

২৮ জানুয়ারি: জুমার নামাজের পর হাজার হাজার মানুষ কায়রোর তাহরির স্কয়ারের দিকে রওনা দেন। প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক প্রথমবার টেলিভিশনের সামনে হাজির হন এবং গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

১ ফেব্রুয়ারি: দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা যাতে কায়রো পৌঁছাতে না পারেন, তা ঠেকাতে সব ধরনের ট্রেন পরিষেবা বন্ধ করে দেয় সরকার।

২ ফেব্রুয়ারি: হোসনি মোবারকের সমর্থকেরা কেউ উটে চড়ে কেউ–বা ঘোড়ায় চড়ে কায়রোর বিক্ষোভ দমন করতে নিষ্ঠুর চেষ্টা চালান। তাঁরা ব্যাট ও ছুরি ব্যবহার করে তাহরির স্কয়ারে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু করেন।

১০ ফেব্রুয়ারি: হোসনি মোবারকের পদত্যাগের গুঞ্জন ওঠে। তিনি ওই দিন এক ভাষণে ঘোষণা দেন, তিনি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। এতে তাহরির স্কোয়ারে জনতার ক্রোধ ফেটে পড়েন।

ফেব্রুয়ারি ১১ (মোবারকের পদত্যাগ): ১৮ দিনের ব্যাপক বিক্ষোভের পর ভাইস প্রেসিডেন্ট ওমর সুলেইমান ঘোষণা করেন, হোসনি মোবারক পদত্যাগ করে সেনাবাহিনীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন।

আরব বসন্তের প্রাণকেন্দ্র ছিল মিসরের তাহরির স্কয়ারে
ফাইল ছবি: রয়টার্স

আরব বসন্তে অন্যান্য দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী

মিসরের মতো, আরব বসন্তের সময় আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের চারটি দেশের সরকারপ্রধানদের উৎখাত করা হয়েছে। সেসব দেশের বড় একটি অংশ তরুণ জনগোষ্ঠী।

তিউনিসিয়ায় মোট জনসংখ্যা ১ কোটি ২২ লাখ। তার মধ্যে ২০ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ অর্থাৎ ২৪ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের নিচে। অন্যদিকে লিবিয়ায় বর্তমান জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ বা ৭৪ লাখের বয়স ১৫ বছরের নিচে।

সিরিয়ায় আড়াই কোটি মানুষের মধ্যে ৭২ লাখ কিংবা ২৯ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের কম। ইয়েমেনে এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশে ৪ কোটি মানুষের মধ্যে ৪১ শতাংশ বা ১ কোটি ৭০ লাখের বয়স ১৫ বছরের কম।

আরও পড়ুন