সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, মানবজাতির সামনে দুটি কঠিন বিকল্প রয়েছে—বৈশ্বিক উষ্ণতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একসঙ্গে কাজ করা কিংবা ‘সম্মিলিত আত্মহত্যা’।

আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, মানবজাতির সামনে বিকল্প হলো পারস্পরিক সহযোগিতা, না হয় বিনাশ। তাপমাত্রা বাড়ানো গ্যাস নির্গমনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী দরিদ্র দেশগুলোর সহায়তায় এগিয়ে আসতে দূষণকারী ধনী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব। তিনি বলেন, হয় একটি জলবায়ু সংহতি চুক্তিতে আসতে হবে, নয়তো একটি সম্মিলিত আত্মহত্যার চুক্তি হবে।

বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশ ক্রমবর্ধমান তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করছে। বন্যা, খরা, দাবদাহসহ নানা দুর্যোগে চলতি বছরেই হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শত শত কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ধনী নির্গমনকারী ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে একটি ‘ঐতিহাসিক’ চুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন আন্তোনিও গুতেরেস। যে চুক্তিতে নির্গমন থামানোর বিষয়ে দেশগুলোর জোরালো অঙ্গীকার থাকবে। বর্তমান প্রবণতা চলতে থাকলে চলতি দশকের শেষ নাগাদ কার্বনদূষণ ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ কার্বন নিঃসরণ। যেসব দেশে কার্বন নিঃসরণ বেশি হয়, সেসব দেশ কম কার্বন নিঃসরণ করেও ক্ষতির মুখে পড়া দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় ক্ষতিপূরণের এ অর্থ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব দেশ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এবারের কপ-২৭ সম্মেলনে ক্ষতিগ্রস্ত এসব দেশের পক্ষ থেকে উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ে সোচ্চার হওয়ার দাবি উঠেছে।

সম্মেলনে তুলে ধরা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিবছর প্রায় দুই ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়া গেলে তা দিয়ে চীন ছাড়া অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর চাহিদা পূরণ করা যাবে।

গবেষণা প্রতিবেদনের প্রধান লেখক জলবায়ু অর্থনীতিবিদ নিকোলাস স্টার্ন বলেন, ‘ধনী দেশগুলোকে স্বীকার করতে হবে যে বিষয়টি তাদের স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তাদের বর্তমান এবং অতীতে কার্বন নিঃসরণের ফলে সৃষ্ট গুরুতর প্রভাবের জন্য ন্যায়বিচার। আগামী দশকে জ্বালানি অবকাঠামো এবং খরচের বেশির ভাগ উদীয়মান বাজার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হবে। দেশগুলো যদি কার্বন নিঃসরণ ও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর থাকে, তবে বিশ্ব বিপজ্জনক জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এড়াতে পারবে না। এতে ধনী বা গরিব সব দেশেই কোটি কোটি মানুষের জীবনের ক্ষতি করবে।’

স্টার্ন বলেন, দরিদ্র দেশগুলোতে কম কার্বন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে অর্থায়ন করা গেলে কোটি কোটি মানুষের দারিদ্র্য দূর করা যাবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এ গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমবে।

এবারের জলবায়ু সম্মেলনে লাভ-ক্ষতির বিষয়টি নিয়েই বেশি আলোচনা হচ্ছে। উন্নত দেশগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিবছর জলবায়ু পরিবর্তন ক্ষতিপূরণ তহবিলে ১০০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রের, বছরে ৪০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ২০২০ সালে দেশটি মাত্র ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে। গত বছরের এ হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা তাদের প্রতিশ্রুত অর্থের মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ দিয়েছে। এদিকে যুক্তরাজ্যও এখনো এক-তৃতীয়াংশ অর্থ ছাড় করেনি।

এবারের জলবায়ু সম্মেলনেও ক্ষতিপূরণ বিষয়টি নিয়ে অগ্রগতির তেমন কোনো আশা দেখা যাচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীতে যে জরুরি পরিস্থিতি চলছে, তার পেছনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর দায় সামান্যই। তবে ধনী দেশগুলোর তহবিল বরাদ্দের মাধ্যমে বৈশ্বিক এ সংকট মোকাবিলায় সব দেশের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে একটা আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর টিকে থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার বিষয়টি ধনী দেশগুলো মেনে নিয়েছে। সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম অর্থসহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা পূরণ করছে না তারা।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবহাওয়া বিরূপ আচরণ করছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রাও বাড়ছে। কার্বন নিঃসরণ কমানো ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে বাঁচাতে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ধনী দেশগুলো ১০০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যদিও এ অঙ্ক প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু ধনী দেশগুলো প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ করছে না। এতে এ সংকট মোকাবিলার বিষয়ে তেমন অগ্রগতি নেই।