মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে কেন দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন বুরকিনা ফাসোর তরুণ নেতা ইব্রাহিম ত্রাওরে
আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোর অন্তর্বর্তী নেতা ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে একসময় দেশটির প্রভাবশালী মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের সমর্থন পেয়েছিলেন। তবে এখন সেই সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক নতুন আইন, কয়েকজন প্রভাবশালী ইমামকে আটক এবং ধর্মীয় উগ্রবাদের নামে চালানো অভিযানকে কেন্দ্র করে সরকারের সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশের বিরোধ তীব্র হয়েছে।
সম্প্রতি ত্রাওরে ঘোষণা দিয়েছেন, বুরকিনা ফাসোয় ‘মৌলবাদী ইসলামের’ কোনো স্থান নেই। যাঁরা ধর্মীয় উগ্রবাদ উসকে দিচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে বলেও সতর্ক করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে প্রভাবশালী মুসলিম ধর্মীয় পণ্ডিতদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ আরও প্রকাশ্যে এল।
যেসব ধর্মীয় পণ্ডিতের বিরুদ্ধে ত্রাওরে ধর্মীয় উগ্রবাদ ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘যদি এটাই আপনাদের ইসলাম হয়, তবে আমরা এর বিরুদ্ধে লড়ব। উগ্রবাদীদের অবশ্যই বদলাতে হবে। না বদলালে লড়াই শুরু হয়ে গেছে।’
ইব্রাহিম ত্রাওরের এসব মন্তব্য সরকারের সঙ্গে বুরকিনা ফাসোর মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশের ক্রমবর্ধমান বিরোধের প্রতিই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বুরকিনা ফাসোর প্রভাবশালী সুন্নি ধর্মীয় নেতারা একসময় ত্রাওরের সমর্থক গোষ্ঠীর একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল। তবে এসব নেতাদের অনেকে এখন সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরোধিতা করছেন।
বুরকিনা ফাসোর প্রভাবশালী সুন্নি ধর্মীয় নেতারা একসময় ত্রাওরের সমর্থক গোষ্ঠীর একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল। তবে এসব নেতার অনেকে এখন সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরোধিতা করছেন।
ত্রাওরের মতে, সহিংসতা কিংবা জোরজবরদস্তি নয়, বরং ধর্মের প্রচার হওয়া উচিত ব্যক্তিগত আচরণ ও উদাহরণের মাধ্যমে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কিছু কিছু মুসলিম নেতা কেন নতুন আইনের বিরোধিতা করছেন।
ত্রাওরে সতর্ক করেন, যেসব ইমাম খুতবায় উগ্রবাদী চিন্তাধারা প্রচার করেন, তাঁদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।
অন্যদিকে শান্তিপূর্ণ ইসলামের ব্যাখ্যা দেওয়া আলেমদের রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ত্রাওরে। একই সঙ্গে তাঁর অভিযোগ, বিদেশি শক্তি ধর্মকে ব্যবহার করে বুরকিনা ফাসোয় অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।
বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীরা
ত্রাওরে ঘোষণা দিয়েছেন, আরব দেশগুলোয় ইসলামি আইন নিয়ে পড়াশোনা করা বুরকিনা ফাসোর শিক্ষার্থীদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। তাঁর দাবি, আট লাখের বেশি শিক্ষার্থী বিদেশে ধর্মীয় শিক্ষা নিচ্ছেন, কিন্তু ব্যবহারিক পেশাগত দক্ষতা অর্জন করছেন না।
ত্রাওরে সতর্ক করেছেন, যাঁরা দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানাবেন, তাঁদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হতে পারে।
গত ২০ জুন অন্তর্বর্তী পার্লামেন্টে সর্বসম্মতিক্রমে ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক আইন পাস করা হয়। এর পর থেকেই ধর্মীয় কার্যক্রম ও বিদেশে ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হচ্ছে।
এর আগে জুনের শেষ দিকে দেশটির সরকার নির্দেশ দেয়, বিদেশে পড়তে যেতে হলে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আগাম অনুমোদন নিতে হবে। সরকারের ভাষ্য, দেশের উন্নয়ন–অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদেশে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত।
গত ২০ জুন অন্তর্বর্তী পার্লামেন্টে সর্বসম্মতিক্রমে ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক আইন পাস করা হয়। এর পর থেকেই ধর্মীয় কার্যক্রম ও বিদেশে ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হচ্ছে।
সরকারের দাবি, রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র আরও শক্তিশালী করাই এ আইনের উদ্দেশ্য। আইনে ধর্মের নামে শিশুদের দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করানো বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতার নিয়ম লঙ্ঘনের মতো কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশের অভিযোগ, এই আইন ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করবে।
সমর্থক থেকে বিরোধী
গত মে মাসের শেষ দিকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী সুন্নি আলেম ইমাম মোহাম্মদ ইসহাক কিন্দো নতুন আইনের সমালোচনা করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ নিয়ে প্রতিবাদ শুরু হলে ত্রাওরে সেটিকে ‘উগ্রপন্থী একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর তৎপরতা’ বলে উড়িয়ে দেন।
কিন্দোর মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভের পর রাজধানী উয়াগাদুগুর সবচেয়ে বড় সুন্নি মসজিদ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় সরকার। পরে প্রায় ১০০ সমর্থককে একটি সামরিক শিবিরে নিয়ে ‘নাগরিক প্রশিক্ষণ’ দেওয়া হয় বলে নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
ত্রাওরে ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন। নতুন আইনও কার্যকর হয়েছে। তবে আটক ধর্মীয় নেতাদের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের এই কঠোর অবস্থান রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করবে, নাকি দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী সামাজিক শক্তিগুলোর একটির সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়িয়ে তুলবে।
এর আগে এপ্রিলের মাঝামাঝি বোবো-দিউলাসো শহরে আরেক প্রভাবশালী আলেম মাহমুদ বারোকেও আটক করা হয়েছিল। শান্তি ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান টিমবুকটু ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, কিন্দোকে আটকের পর থেকে তাঁর অবস্থান এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, বিরোধ শুধু নতুন আইনকে ঘিরেই নয়, বরং ত্রাওরে সরকার ও প্রভাবশালী মুসলিম আলেমদের মধ্যে এত দিন যে অলিখিত সমঝোতা ছিল, সেটিই ভেঙে পড়ছে। ক্ষমতা দখলের পর এই আলেমদের সমর্থন ত্রাওরের রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছিল।
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক
অভ্যন্তরীণ এ উত্তেজনার মধ্যেই সম্প্রতি বুরকিনা ফাসোয় নিযুক্ত নতুন ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত সিমন সেরুসি ত্রাওরের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেছেন।
আফ্রিকা ইন্টেলিজেন্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে জমা দেওয়া রাষ্ট্রদূতকে স্বীকৃতির আবেদন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর সম্প্রতি তা নীরবে অনুমোদন দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবাজ ও উগ্রবাদী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে প্রকাশ্যে স্বাগত জানানো ত্রাওরের অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। একই সময়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বুরকিনা ফাসো, মালি ও নাইজার নিয়ে গঠিত অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটস (এইএস) জোটের দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
ত্রাওরে ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন। নতুন আইনও কার্যকর হয়েছে। তবে আটক ধর্মীয় নেতাদের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের এই কঠোর অবস্থান রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করবে, নাকি দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী সামাজিক শক্তিগুলোর একটির সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়িয়ে তুলবে।