চার হাজার বছর পর আবিষ্কৃত হলো নীল নদের হারানো শাখা নদী

মিসরের লুক্সর শহরে অবস্থিত কারনাক মন্দিরছবি: এএফপি

প্রাচীন মিসরের কারনাক মন্দির গড়ে উঠেছিল পাথর আর পানির এক গভীর সম্পর্কের ভেতর দিয়ে। সেখানে এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ মূলত মন্দির, দেয়াল ও শিলালিপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। মাটির নিচে কী লুকিয়ে আছে, সেদিকে খুব একটা নজর দেওয়া হয়নি। তবে সাম্প্রতিক এক ভূপ্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা সেই চিত্র বদলে দিয়েছে।

গবেষকেরা কারনাক ও আশপাশের এলাকায় খনন করে পলিমাটির স্তরযুক্ত কয়েক ডজন নমুনা সংগ্রহ করেছেন। সেগুলো বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখার চেষ্টা করেছেন, অতীতে নীল নদ ঠিক কীভাবে এই এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হতো। গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশাল এই মন্দির কমপ্লেক্স গড়ে উঠেছিল একটি প্রাকৃতিক নদী–সোপানের ওপর, যা একসময় চারদিক থেকে জলধারা ও খালে ঘেরা ছিল।

এই ভৌগোলিক বাস্তবতা মিসরীয় সৃষ্টিতত্ত্বের একটি ধারণার সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে বলা হয়, আদিম জলরাশি থেকে একটি পবিত্র টিলা জেগে উঠেছিল। একই সঙ্গে এই গবেষণা এটিও স্পষ্ট করেছে, ঠিক কোন সময় থেকে কারনাক এলাকায় স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ সম্ভব হয়ে ওঠে। প্রকৃতি ও বিশ্বাস কীভাবে একসঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে, তারই একটি শান্ত কিন্তু পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায় এই গবেষণা থেকে।

লুকানো দ্বীপে নির্মিত হয়েছিল কারনাক

‘কনসেপচুয়াল অরিজিনস অ্যান্ড জিওমরফিক ইভোল্যুশন অব দ্য টেম্পল অব আমুন-রা অ্যাট কারনাক (লাক্সর, ইজিপ্ট)’ শীর্ষক এই গবেষণায় বলা হয়েছে, কারনাক মন্দিরের নিচে রয়েছে হাজার হাজার বছর আগে প্রবল স্রোতে ভেসে আসা বালুর স্তর। এই বালু ধীরে ধীরে জমে একটি উঁচু ভূখণ্ড বা সোপান তৈরি করেছিল।

গবেষকদের মতে, শুরুর দিকে এই বালুচর স্থায়ী বসতির উপযোগী ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নীল নদ তার গতিপথ বদলে এই উঁচু ভূমির দুই পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। এতে মাঝখানের অংশটি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল একটি ভূখণ্ডে পরিণত হয়—প্রায় একটি দ্বীপের মতো। এই নিরাপদ ও উঁচু জায়গাই পরে প্রাচীন মানুষ বসতি ও মন্দির নির্মাণের জন্য বেছে নেয়।

নদীর গতি বদলেই গড়ে ওঠে জনপদ

পলিমাটির স্তর বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২ হাজার ৫২০ বছর আগে আশপাশে এই উঁচু ভূখণ্ড প্রথমবারের মতো স্থায়ীভাবে শুষ্ক ও বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। তার আগে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে নীল নদের বন্যার কারণে এখানে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ প্রায় অসম্ভব ছিল।

গবেষকদের এই দাবির পক্ষে জোরালো প্রমাণ দিচ্ছে সেখানে পাওয়া প্রাচীন মাটির পাত্রের নিদর্শন। সেগুলো মূলত ‘ওল্ড কিংডম’-এর শেষভাগ কিংবা ‘ফার্স্ট ইন্টারমিডিয়েট পিরিয়ড’-এর সময়কার। অর্থাৎ নদীর গতিপথ বদলে ভূমি যখন স্থিতিশীল হয়ে ওঠে, তখনই সেখানে মানুষের বসতি গড়ে ওঠার প্রমাণ পাওয়া যায়।

দ্বীপের মতো ঘেরা ছিল মন্দির এলাকা

খনন করা নমুনায় দেখা গেছে, কারনাকের পূর্ব ও পশ্চিম—উভয় দিকেই নীল নদের পুরোনো শাখা বা গতিপথের চিহ্ন রয়েছে। একসময় এই জলধারাগুলো উঁচু ভূখণ্ডটিকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছিল। ফলে পুরো এলাকাটি কার্যত একটি দ্বীপের মতো মনে হতো।

গবেষণায় আরও জানা গেছে, ছোট ছোট কিছু নালা মন্দির কমপ্লেক্সের ভেতর দিয়েও প্রবাহিত হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর কিছু অংশ পলি জমে প্রাকৃতিকভাবে ভরাট হয়ে যায়, আবার কিছু জলধারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সক্রিয় ছিল। এতে বোঝা যায়, কারনাকের ভূপ্রকৃতি কখনোই স্থির ছিল না। বরং নীল নদের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেটিও রূপ বদলেছে।

প্রকৃতিকে বশ করেছিলেন প্রাচীন স্থপতিরা

গবেষকদের মতে, ‘মিডল কিংডম’-এর সময় নীল নদের কিছু শাখা ও খাল পলি জমে ভরাট হতে শুরু করে। এতে একসময় বিচ্ছিন্ন থাকা ভূখণ্ডগুলো একীভূত হয়ে বড় একটি এলাকায় পরিণত হয়। তবে প্রাচীন মিসরীয়রা কেবল প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে বসে থাকেননি।

‘নিউ কিংডম’-এর সময় বড় নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনে নদীর কিছু অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে বালু দিয়ে ভরাট করা হয়। এতে স্পষ্ট হয়, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রয়োজন মেটাতে তারা সচেতনভাবেই প্রকৃতিকে নিজেদের মতো করে রূপ দিয়েছিল।

কারনাকের আগে ছিল নীল নদের বিশাল শাখা

এই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো, কারনাক মন্দিরের পূর্ব দিকে নীল নদের একটি প্রশস্ত শাখার অস্তিত্ব। সেখানে পাওয়া মৃৎপাত্র ও পলিমাটির স্তর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ‘ফার্স্ট ইন্টারমিডিয়েট পিরিয়ড’ থেকে শুরু করে ‘নিউ কিংডম’ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় এই জলধারা সক্রিয় ছিল।

গবেষকদের ধারণা, একসময় এই শাখার প্রস্থ কয়েক শ মিটার পর্যন্ত ছিল। পরে নীল নদ ধীরে ধীরে আরও পূর্ব দিকে সরে যায়। ধ্রুপদি যুগের শেষ দিকে এই জলধারা পলি জমে প্লাবণভূমিতে পরিণত হয়।

ভূপ্রকৃতিতেই মিলছে ধর্মীয় বিশ্বাসের ছাপ

চারপাশে পানিবেষ্টিত একটি উঁচু ভূখণ্ডের ওপর কারনাক মন্দির দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়টি প্রাচীন শিলালিপি ও মন্দিরের প্রতীকে বহুবার উঠে এসেছে। মিসরীয় সৃষ্টিতত্ত্বে আদিম জলরাশি থেকে একটি ‘পবিত্র টিলা’ জেগে ওঠার যে বর্ণনা পাওয়া যায়, কারনাকের এই দ্বীপসদৃশ ভূখণ্ড তার সঙ্গে আশ্চর্য রকমভাবে মিলে যায়।

গবেষকেরা কোনো চূড়ান্ত দাবি না করলেও এটি স্পষ্ট, কারনাকের এই বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থান প্রাচীন মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করেছিল। মূলত নদীর বুক থেকে জেগে ওঠা এই দ্বীপ তাদের কাছে সৃষ্টির আদিম গল্পেরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল। প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যই হয়তো তাদের এই বিশ্বাসকে দৃঢ় করেছিল, এটিই সেই পবিত্র স্থান—যদিও এই কারণের মন্দির নির্মাণের জন্য জায়গাটি নির্বাচনের মূল ভিত্তি কি না, তা নিয়ে গবেষণার অবকাশ রয়েছে।

বিখ্যাত নিদর্শনের এক ভিন্ন রূপ

এই গবেষণা কারনাকের ইতিহাসকে আমূল বদলে না দিলেও এতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পলিমাটির স্তর, প্রাচীন মৃৎপাত্র এবং আধুনিক কালনির্ণয় পদ্ধতি একত্রে ব্যবহার করে আগের গবেষণার অনেক ফাঁক পূরণ করা সম্ভব হয়েছে।

এর ফলে এমন এক গতিশীল ভূপ্রকৃতির চিত্র ফুটে উঠেছে, যেখানে নীল নদের গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে উঠেছে বিশাল সব মন্দির। কারনাক এখন আর কেবল পাথরের তৈরি স্থির কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নয়, বরং এটি সময়ের পরিক্রমায় পানি, প্রকৃতি আর মানুষের ইচ্ছায় গড়ে ওঠা এক জীবন্ত প্লাবনভূমির অংশ।