দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী আন্দোলন কেন তীব্র হচ্ছে

দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের কেন্দ্রস্থলে বিদেশি–বিদ্বেষের বিরুদ্ধে আয়োজিত মিছিলে প্ল্যাকার্ড হাতে অংশ নেন বিক্ষোভকারীরারয়টার্স

দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদেশি নাগরিকদের প্রতি বিদ্বেষমূলক হামলা গত কয়েক বছরে বেড়েছে। জিম্বাবুয়েসহ অন্যান্য দেশের নাগরিকদের লক্ষ্য করে দেশটির অভিবাসনবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী প্রতিবাদে ক্রমে সোচ্চার হচ্ছে। এসব গোষ্ঠীর অনেকে নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে।

নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এসব বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

‘মার্চ অ্যান্ড মার্চ’ ও ‘দুদুলা অপারেশনস মুভমেন্ট’ দক্ষিণ আফ্রিকার দুটি সুপরিচিত অভিবাসীবিরোধী আন্দোলন। জোহানেসবার্গ, প্রিটোরিয়া, ডারবানসহ বিভিন্ন শহরে তাদের অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ বেড়েছে। এসব বিক্ষোভ থেকে নথিপত্রবিহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের দাবি জানানো হচ্ছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার অধিকার রক্ষা সংগঠন ‘কোপানাং আফ্রিকা এগেইনস্ট জেনোফোবিয়া (কেএএএক্স)’–এর মিডিয়া সমন্বয়কারী মাইক এনডলোভু আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা আমাদের কমিউনিটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অভিবাসী ও শরণার্থীদের ভয়ভীতি দেখানো, হুমকি, হয়রানি, অবৈধভাবে উচ্ছেদ, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, পুলিশের চাঁদাবাজি এবং স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত করার বিষয়ে অনেক প্রতিবেদন পাচ্ছি।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা বার্তা ও ভিডিওতে দেখা যায়, অভিবাসনবিরোধী কর্মীরা বিদেশি নাগরিকদের আগামী ৩০ জুনের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।

এনডলোভু আরও বলেন, ‘ক্ষতির সবচেয়ে সাধারণ ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে গালাগাল, উচ্ছেদ, ক্লিনিক ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, মালামাল বাজেয়াপ্ত করা। কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক লাঞ্ছনার ঘটনাও ঘটছে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা বার্তা ও ভিডিওতে দেখা যায়, অভিবাসনবিরোধী কর্মীরা বিদেশি নাগরিকদের আগামী ৩০ জুনের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।

ধারণা করা হচ্ছে, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে যেসব ঘটনা ঘটছে, তার সবগুলোর খবর প্রকাশিত হচ্ছে না। কারণ, এতে প্রতিশোধ গ্রহণ, গ্রেপ্তার বা দেশান্তরের আশঙ্কা থাকে।

জনরোষের কারণ কী

সার্বিক পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও বেকারত্বে জর্জরিত শহর ও শহরতলিতে অভিবাসীবিরোধী আন্দোলনগুলো জনসমর্থন পাচ্ছে।

প্যাট্রিয়টিক অ্যালায়েন্স, অ্যাকশন-এসএ এবং উমখন্টো উই সিজওয়ের মতো রাজনৈতিক দলগুলো কর্মসংস্থান ও সরকারি সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে অভিবাসীদের ‘প্রতিযোগী’ হিসেবে তুলে ধরছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানদারেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকের মালামাল লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আবার অনেকে তাঁদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
জউয়েলিবানজি ভেলেম্পিনি খুমানো, দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত বিদেশি

দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার ও অধিকার রক্ষা জোট ‘কনসোর্টিয়াম ফর রিফিউজিস অ্যান্ড মাইগ্রেন্টস ইন সাউথ আফ্রিকা’র সদস্য ও ‘কেএএএক্স’–এর কর্মী এমপোফু মাখুবেলা বলেন, সমাজে ব্যাপক হতাশা বিরাজ করছে। তা থেকে অভিবাসনবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্ম হচ্ছে, যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে।

এমপোফু মাখুবেলা আল–জাজিরাকে বলেন, এসব গোষ্ঠী বেকারত্ব, আর্থসামাজিক অবক্ষয় ও বৈষম্য দূর করার প্রচেষ্টার অভাব থেকে তৈরি হওয়া হতাশার সুযোগ নিচ্ছে। এসব কারণে দেশটিতে বর্ণবাদের রেখে যাওয়া বিভিন্ন ক্ষত কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে নতুন করে বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেন স্থানীয় বাসিন্দারা
ফাইল ছবি: এএফপি

মানবিক বিপর্যয়

চলমান সহিংসতা ও হয়রানির ঘটনা দক্ষিণ আফ্রিকার অভিবাসীদের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

খাদ্য ও পার্সেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘মিস্টার ডেলিভারি’তে কয়েক মাস আগেও কাজ করতেন জিম্বাবুয়ের নাগরিক এমপোফু। গত জানুয়ারিতে তিনি প্রিটোরিয়ার বাণিজ্যিক কেন্দ্রে কঙ্গো ও মালাউইয়ের সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করার সময় একটি স্বঘোষিত আইন রক্ষাকারী গোষ্ঠীর সদস্যদের হামলার মুখে পড়েন।

এ ঘটনার স্মৃতিচারণা করে এমপোফু বলেন, ‘আমার সহকর্মীরা কোম্পানির ভ্যান থেকে লাফিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান। আমি একা হয়ে পড়ি। তারা (হামলাকারীরা) আমাকে হয়রানি করতে শুরু করেন। জিজ্ঞাসা করেন, কেন আমার সহকর্মীরা পালাচ্ছেন?’

এমপোফু জানান, এ ঘটনার পর তাঁর কর্মক্ষেত্রে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর বিশ্বাস, এ ঘটনা নথিপত্রবিহীন অভিবাসী শ্রমিকদের ছাঁটাইয়ের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

ক্ষতির সবচেয়ে সাধারণ ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে গালাগাল, উচ্ছেদ, ক্লিনিক ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, মালামাল বাজেয়াপ্ত করা। কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক লাঞ্ছনার ঘটনাও ঘটছে।
মাইক এনডলোভু, মিডিয়া সমন্বয়কারী, কেএএএক্স

চাকরি হারানোর পর এখন দক্ষিণ আফ্রিকার এ প্রবাসী অনানুষ্ঠানিক রান্নাবান্না ও ডেলিভারির কাজ করে কোনোমতে টিকে আছেন। তবে আগের তুলনায় তাঁর আয় অনেক কমেছে।

জউয়েলিবানজি ভেলেম্পিনি খুমানো নামের আরেক অভিবাসী দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান ও পিটারমারিৎজবার্গের আশপাশের এলাকায় নানা ধরনের বিদ্বেষমূলক ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, চলতি বছরের শুরুর দিকে এমপুমুজায় উত্তেজনার ফলে বিদেশি নাগরিকদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। অস্থিরতার সময় অনেকে তাঁদের আসবাব, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও ব্যবসার মালামাল হারিয়েছেন।

সার্বিক পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও বেকারত্বে জর্জরিত শহর ও শহরতলিতে অভিবাসীবিরোধী আন্দোলন জনসমর্থন পাচ্ছে।

ভেলেম্পিনি খুমানো বলেন, ‘ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানদারেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকের মালামাল লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আবার অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।’

খুমানো অ্যাকাউন্টিংয়ে প্রভাষক হিসেবে চাকরি করতেন। কাজ করার বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তিনি চাকরি হারিয়েছেন। তবে তাঁর স্ত্রীর বৈধ কাগজপত্র আছে। বর্তমানে তিনিই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

খুমানো বলেন, ‘আমরা আমাদের নথিপত্র বৈধ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তা বেশ কঠিন।’

সরকারি প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা যুক্তি

তবে উত্তেজনা বৃদ্ধি সত্ত্বেও দক্ষিণ আফ্রিকা জানিয়েছে, তারা আইনের শাসন ও বিদেশি নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সরকারি মুখপাত্র নোমন্ডে মনুকওয়া বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসনের চরিত্রটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।’ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, অভিবাসীদের কঠোরভাবে আটকে না রেখে সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করাই ছিল ১৯৯৪ সাল–পরবর্তী নীতিমালার লক্ষ্য।

বেকারত্ব, সম্পদের ওপর চাপ, নথিপত্রবিহীন অভিবাসন ও অপরাধের সঙ্গে জনরোষের সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকার করেন মনুকওয়া। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কোনো শত্রুভাবাপন্ন আচরণ সহ্য করা হবে না।

প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা বলেছেন, অধিকার আন্দোলনের ছদ্মবেশে অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা বেআইনি।

মুখপাত্র মনুকওয়া জানান, অভিবাসন আইনগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সীমান্ত ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং জবাবদিহি শক্তিশালী করা হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের সংবিধান জাতীয়তা–নির্বিশেষে সব বাসিন্দার মর্যাদা ও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দেয়।’

অভিবাসনবিরোধীদের কঠোর অবস্থান

দুদুলা অপারেশনস মুভমেন্টের মুখপাত্র প্যাট মোকগালুসি বলেন, অবৈধ বিদেশিদের ব্যাগ গুছিয়ে চলে যেতে হবে। নথিপত্রবিহীন অভিবাসন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে এবং কর্মসংস্থান ও পরিষেবার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

মোকগালুসি বলেন, নথিপত্রবিহীন অভিবাসীদের সঙ্গে অপরাধ ও দুর্বল পরিকল্পনার সম্পর্ক রয়েছে। তবে তিনি বলেন, বৈধ অভিবাসীরা আইন মেনে চললে তাঁদের স্বাগত জানানো হবে।

মার্চ অ্যান্ড মার্চের প্রতিষ্ঠাতা জাসিন্টা এনগোবেসে জুমা বলেন, অনথিভুক্ত অভিবাসন সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে এবং শহর, স্কুল, হাসপাতাল ও শ্রমবাজারে ভিড় বাড়াচ্ছে।

জাসিন্টার যুক্তি, আরও জোরালো শনাক্তকরণ ও আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থার মাধ্যমে অভিবাসনকে অধিকতর কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।

অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে সোমালিয়ার এক নাগরিককে সরিয়ে নিচ্ছে পুলিশ
ফাইল ছবি: এএফপি

বৈশ্বিক উদ্বেগ

জিম্বাবুয়ের বিচার, আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী জিয়াম্বি জিয়াম্বি জানান, তাঁর দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় ক্রমবর্ধমান অভিবাসনবিরোধী উত্তেজনার দিকে চোখ রাখছে। তবে তিনি বলেন, তাঁরা প্রিটোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।

জিয়াম্বি বলেন, ‘আপনি অন্যের বাড়িতে গিয়ে তাঁদের কী করতে হবে, তা শিখিয়ে দিতে পারেন না। জিম্বাবুয়ে কূটনৈতিক চ্যানেল ও দূতাবাসের মাধ্যমে সংকটে পড়া নাগরিকদের সহায়তা করার জন্য কাজ করছে।’

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও আফ্রিকান কমিশন অন হিউম্যান অ্যান্ড পিপলস রাইটস (এসিএইচপিআর) দক্ষিণ আফ্রিকার অভিবাসনবিরোধী প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশটির কর্তৃপক্ষকে সহিংসতার তদন্ত করা, অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং অভিবাসীদের ন্যায়বিচার ও পরিষেবা পাওয়ার অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, অভিবাসীদের বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। এটা সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে।

মানবাধিকার সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, অপরাধ, বেকারত্ব ও নিম্নমানের পরিষেবার জন্য অভিবাসীদের দায়ী করার ফলে বিদেশিদের প্রতি বিদ্বেষ বা জেনোফোবিয়া আরও গভীর হওয়ার এবং মানবাধিকার সুরক্ষা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ আফ্রিকাবিষয়ক গবেষক নোমাথামসানকা মাসিকো-এমপাকা বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মানুষকে প্রতিবাদ করার অধিকার দেয়। কিন্তু এর মানে এই নয় যে কেউ প্রতিবাদের নামে সহিংসতা চালাতে পারবেন।