চীনের প্রেসিডেন্ট সির মিসর সফরের গুরুত্বটা কোথায়
এক দশকের মধ্যে প্রথম মিসর সফরে গেলে চীনের প্রেসিডেন্ট সি
মিসর গত মাসে চীনের সঙ্গে বার্ষিক সামরিক মহড়ার আয়োজন করেছিল
মিসরের বন্দর, কারখানা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চীনের কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যখন তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে চিন্তা করছে, ঠিক সে সময় চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং গতকাল মঙ্গলবার মিসরে গেছেন। আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটিতে এটি এক দশকের মধ্যে তাঁর প্রথম সফর।
ইরান যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বিশ্বাস করতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
মিসরের রাষ্ট্রীয় টিভির ভিডিওতে দেখা যায়, সি পৌঁছানোর পর কায়রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি তাঁকে স্বাগত জানান। সেখানে তাঁতে লালগালিচা অভ্যর্থনা জানানো হয়। তাঁর সম্মানে সেনারা কুচকাওয়াজে অংশ নেন, লোকনৃত্যশিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করেন।
এক সপ্তাহ ধরে মিসরের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বেইজিংয়ের সঙ্গে কায়রোর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের প্রশংসা করে আসছে। একই সঙ্গে ৭০ বছর আগে চীনকে প্রথম আরব ও আফ্রিকান দেশ হিসেবে মিসরের কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র আল-আহরামে লেখা এক মতামত কলামে সিসি লিখেছেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর ভূমিকা জোরদার করতে মিসর ও চীন যৌথভাবে অবদান রাখতে অংশীদার হয়ে উঠেছে।
চলতি বছর এটি সির দ্বিতীয় বিদেশ সফর এবং মিসর হচ্ছে দ্বিতীয় পর্ব। এর আগে তিনি কিরগিজস্তানে ‘সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’-এর সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ অন্যান্য নেতার সঙ্গে কথা বলেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ায় প্রকাশিত এক মন্তব্যে সি বলেন, সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা দুই দেশ ‘পরস্পরের পাশে থাকা ঘনিষ্ঠ ভাইয়ের মতো’। তিনি মিসরের সঙ্গে আরও গভীর সম্পর্ক গড়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্ক
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার সামরিক সাহায্য পাওয়া মিসর গত মাসে চীনের সঙ্গে তাদের দ্বিতীয় বার্ষিক সামরিক মহড়ার আয়োজন করেছে। এ অঞ্চলের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমাতে গত বছর বেইজিং এ যৌথ মহড়া শুরু করে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এ মহড়ায় চীন প্রথমবারের মতো আফ্রিকায় তাদের ‘জে-১৬’ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। পাশাপাশি চীনের তৈরি ফাইটার জেট এবং ফ্রান্সের তৈরি ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমানের অংশগ্রহণে একটি বিরল যুদ্ধবিমান মহড়াও অনুষ্ঠিত হয়।
চীনের একটি এয়ারফোর্স ট্যাংকারকে রাফাল বিমানে জ্বালানি সরবরাহ করতেও দেখা গেছে, যা বেইজিংকে পশ্চিমাদের তৈরি সামরিক সরঞ্জাম কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক এইচ এ হেলিয়ার বলেন, ২০১৪ সালে সদ্য নির্বাচিত সিসি যখন চীন সফরে গিয়ে একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তিতে সই করেন, তখন থেকেই মিসর বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে।
হেলিয়ার বলেন, ওয়াশিংটনের প্রতি কায়রোর অবস্থান এর পর থেকে কিছুটা নরম হলেও গাজা ও ইরান যুদ্ধের ফলে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কতটুকু নির্ভর করা যায় এবং তাদের সিদ্ধান্তের যে অস্থিরতা’ প্রকাশ্যে এসেছে, তা মিসরকে অন্যান্য দেশের সঙ্গেও সম্পর্ক বৃদ্ধি করার চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য করেছিল।
এই গবেষক বলেন, ‘মিসর নিজেকে আরও বেশি কৌশলগত স্বতন্ত্র অবস্থানের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছে। তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক চায়। তবে একই সঙ্গে বেইজিং, মস্কো ও ইউরোপের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখতে চায়।’
ইসরায়েল, সুদান ও লিবিয়া সীমান্তসংলগ্ন এবং সুয়েজ খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের মালিকানার দেশ মিসরকে বৈশ্বিক শক্তিগুলো প্রায়ই এই বিশৃঙ্খল অঞ্চলে একটি কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখে থাকে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিসরে চীনের বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। দেশটির উৎপাদন, বন্দর, সৌরশক্তি, গ্রিন হাইড্রোজেন ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মতো খাতগুলোতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
‘চীন গ্লোবাল সাউথ প্রজেক্ট’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা এরিক ওল্যান্ডার বলেন, সির সফরের জন্য মিসর একটি ‘যৌক্তিক পছন্দ’ ছিল। কারণ, দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে।
ওল্যান্ডার বলেন, ‘এর সঙ্গে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ইস্যু যুক্ত। এর সঙ্গে আফ্রিকা জড়িত। আবার পারস্য উপসাগরের বিষয়গুলোও এর সঙ্গে যুক্ত।’
গত সপ্তাহে সি বেইজিংয়ে জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁদের মধ্যে আলোচনায় ফিলিস্তিনিদের অধিকারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। এ মাসের শেষের দিকে সির ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে।