নাভি পিল্লাইয়ের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতি
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সাবেক প্রধান ও আন্তর্জাতিক আদালতের (আইসিজে) বিচারক নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। গাজায় গণহত্যার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করা জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার এই আইনজীবী।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস বলেন, শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রসারে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পিল্লাইকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি বলেছে, পিল্লাই দেখিয়েছেন, যুদ্ধ ও সহিংসতা প্রতিরোধে আইনি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে সর্বজনীন আইনি নীতির প্রতি অঙ্গীকার ও দৃঢ় নৈতিক অবস্থান সব সময়ই অটুট ছিল।
শুক্রবার পুরস্কার ঘোষণার বিবৃতিতে কমিটি জানায়, বর্ণবাদী শাসনামলে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলার পক্ষে আইনি লড়াই থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন—বিভিন্ন পর্যায়ে পিল্লাই আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘বর্তমানে যখন যুদ্ধ ও সংঘাত বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিচারক ও প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক হামলার শিকার হচ্ছে; এমন সময়ে নোবেল কমিটি সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চায়, শক্তি বা সহিংসতা ছাড়া সংঘাত সমাধানের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের ওপর নির্ভর করে।’
একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বের পূর্বশর্ত হলো এমন একটি আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা, যেখানে যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয় এবং নির্যাতিতরা ন্যায়বিচার পান বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেন পিল্লাই। গত বছর ওই কমিশন জানিয়েছিল, গাজায় ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করার সুনির্দিষ্ট অভিপ্রায়ে ইসরায়েল গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে।
সে সময় বার্তা সংস্থা এএফপিকে পিল্লাই বলেছিলেন, তাঁর দল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কৌসুলিদের সঙ্গে ‘হাজার হাজার তথ্যপ্রমাণ’ শেয়ার করেছে।
জাতিসংঘ বলেছে, পিল্লাইকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের গুরুত্বকে তুলে ধরেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার মুখপাত্র শাবিয়া মান্টু বলেন, ‘সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নাভি পিল্লাইকে এই পুরস্কার পেতে দেখাটা চমৎকার একটি ব্যাপার। বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকারের প্রয়োজনীয়তা ও মূল্য যে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি, এটি তারই প্রমাণ।’
নরওয়ের রাজধানী অসলোভিত্তিক এই কমিটি এ বছর ২৮৭ জন প্রার্থীর মনোনয়ন পেয়েছিল। এর মধ্যে এক-চতুর্থাংশের সামান্য বেশি ছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই কমিটি সাধারণত শান্তির স্থায়িত্ব, আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধের প্রসার এবং এসব লক্ষ্য অর্জনে নীরবে কাজ করে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জোর দেয়।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় গণতান্ত্রিক রূপান্তরের লড়াইয়ের জন্য গত বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জিতেছিলেন দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ‘ক্রমবর্ধমান অন্ধকারের মধ্যেও গণতন্ত্রের শিখা জ্বালিয়ে রাখা’ একজন নারী হিসেবে তিনি এই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরপরই মাচাদো তাঁর নোবেল পদকটি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দিয়েছিলেন। তবে এটি ছিল মূলত একটি প্রতীকী পদক্ষেপ। কারণ, নোবেল কমিটি বলেছে, এই সম্মাননা কখনো অন্য কাউকে হস্তান্তর করা যায় না।
নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছেন রাষ্ট্রপ্রধান বা জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক ইনস্টিটিউটের পরিচালক, সাবেক নোবেলজয়ী এবং স্বয়ং নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সদস্যরা।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে এ বছরের চারটি নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। চিকিৎসায় নোবেল পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী। তাঁদের গবেষণার ফলে এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে, যা আলোর সাহায্যে মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি বুঝতে সাহায্য করে। পদার্থবিজ্ঞানে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে বিরল একধরনের নিউট্রিনোর রহস্য উন্মোচনের প্রচেষ্টাকে। আর রসায়নে পুরস্কার পেয়েছেন দুই বিজ্ঞানী। অণু বা মলিকিউলের আয়নার মতো রহস্যময় প্রতিবিম্বের জট খোলার জন্য তাঁরা এই স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁদের এই আবিষ্কার অসংখ্য ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে।