ফ্যাক্ট চেক
যুদ্ধের মধ্যে অপতথ্য, মাছবাজারে অগ্নিকাণ্ডও চালানো হয় ড্রোন কারখানার আগুনের দৃশ্য বলে
দুটি শিশু আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছে, মাথার এক পাশ থেকে রক্ত ঝরা একজন অন্যজনকে দেখাচ্ছে, ‘দেখো, আমার পায়ে ব্যথা পেয়েছি।’ পাশের শিশুটি বলছে, ‘আমার বাবা–মা কোথায়?’ ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা রয়েছে, ‘হে আরশের মালিক আপনি ইরানি শিশুদের হেফাজত করুন।’ ভিডিওর ওপরে লেখা রয়েছে, ‘আঘাত বড় ভাইকে দেখাচ্ছে, ভাই বলে আমাদের মা–বাবা নেই।’
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে আহত এই দুই শিশুকে নিয়ে ১৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও। ‘টুঙ্গিপাড়ার মেয়ে সনিয়া’ ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করা ভিডিওটি তিন লাখের বেশিবার দেখা হয়ে গেছে। ১৫ হাজারেরও বেশি অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্টটিতে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। ভিডিওটি শেয়ার হয়েছে ২ হাজার ৬০০ বার।
তবে যাচাই করে জানা যায়, এটি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যুদ্ধের দৃশ্য নয়, শিশু দুটিও ইরানি নয়। ফিলিস্তিনের গাজায় গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ইসরায়েলি হামলায় আহত হয় শিশু দুটি। তখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয় ভিডিওটি।
আরেকটি ভিডিওতে দাবি করা হয়, ভারতে একটি ড্রোন কারখানায় আগুন লেগেছে, যেখান থেকে ইসরায়েলের জন্য হাজার হাজার ড্রোন তৈরি করা হয়। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, এই দাবিরও কোনো ভিত্তি নেই। ভিডিওটি আসলে গত ১২ মার্চ দিল্লির একটি মাছের বাজারে আগুন লাগার দৃশ্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচার শুধু কয়েকটি ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানে ইসরায়েলি বাহিনীর অগ্নিসংযোগের দাবিতে চার বছর পুরোনো ভিডিও, মার্কিন পাইলট আটক হওয়ার দৃশ্য হিসেবে লিবিয়ার প্যারাট্রুপারের ভিডিও, যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবিতে চীনের পুরোনো ভিডিও—এমন উদাহরণ ভূরি ভূরি।
ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল, ৪০ দিনের মাথায় গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় উভয় পক্ষ। তাতে মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের মানুষের হাঁপ ছাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই ৪০ দিনে হামলা–পাল্টাহামলার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্যের বন্যা দেখার কথা জানিয়েছে বিবিসি। বাংলাদেশভিত্তিক তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের মধ্যে ছড়ানো ভুয়া তথ্যের দিকে নজর রাখে। রিউমর স্ক্যানার, ডিসমিসল্যাব, ফ্যাক্ট ওয়াচ ও দ্য ডিসেন্ট তাদের ওয়েবসাইটে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো ভুয়া তথ্য শনাক্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে মোট ২২২টি।
রিউমর স্ক্যানার তাদের ওয়েবসাইটে মোট ১৬০টি মিথ্যা তথ্য শনাক্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, ডিসমিসল্যাব তাদের ওয়েবসাইটে ৩১টি মিথ্যা তথ্য শনাক্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ফ্যাক্ট ওয়াচ শনাক্ত করে ১৮টি এবং দ্য ডিসেন্ট ১৩টি মিথ্যা তথ্য শনাক্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
ভিডিওতে বিভ্রান্তির বিস্তার
যুদ্ধ ঘিরে ছড়ানো অপতথ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে পুরোনো বা ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ভিডিও। শনাক্ত হওয়া মোট ২২২টি ভুয়া তথ্যের মধ্যে ১১৮টি ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তি সৃষ্টির হাতিয়ার ছিল ভিডিও, যা মোট অপতথ্যের প্রায় ৫৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।
এই ভিডিওগুলোর মধ্যে ভাইরাল হওয়া একটি ছিল আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি স্থানের দৃশ্য নিয়ে। দাবি করা হয়, এটি ইরানের সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড। কিন্তু যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনার নয়; বরং গত ফেব্রুয়ারিতে নাইজেরিয়ার একটি বাজারে আগুন লাগার দৃশ্য।
একইভাবে ‘ইরানে ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও অক্ষত মসজিদ’—এমন দাবিতে টিকটকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও বিভ্রান্তিকর হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এটি ২০২৫ সালের নভেম্বরে রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা, যেখানে একটি মসজিদ অক্ষত ছিল।
এ ছাড়া ইসরায়েল ছাড়ার টিকিট না পেয়ে ইহুদিদের ভাঙচুরের দাবিতে ভিন্ন ঘটনার ভিডিও, ইরানের শিশুদের খাদ্যসংকট দেখাতে গাজার পুরোনো দৃশ্য, কিংবা ইরানের সামরিক কুচকাওয়াজ হিসেবে সিরিয়ার ভিডিও নতুন করে প্রচার করে বিভ্রান্ত করে দর্শকদের।
এমনকি ইসরায়েলের পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর হামলার দাবি করে বুলগেরিয়ার একটি পুরোনো ভিডিও ছড়ানো হয়েছিল এই সময়ে।
বিশ্লেষকেরা বলেন, সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এ ধরনের ভুল তথ্য ছড়ানোর পেছনে কাজ করে ‘প্রেক্ষাপট বিচ্যুতি’ বা context collapse। একটি বাস্তব ভিডিওকে তার মূল প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে নতুন একটি আবেগঘন বা রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে যুক্ত করা হলে সেটি সহজেই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে যুদ্ধকালীন তথ্যের চাহিদা ও উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় ব্যবহারকারীরা অনেক সময় যাচাই না করেই এসব কনটেন্ট শেয়ার করেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের সময় পুরোনো বা ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ভিডিও শুধু বিভ্রান্তিই ছড়ায়নি, বরং বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
এআই–নির্ভর ছবি ও ভিডিও
যুদ্ধ নিয়ে অপতথ্য ছড়ানোর দ্বিতীয় বড় উৎস ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই–নির্ভর ছবি ও ভিডিও। শনাক্ত হওয়া মোট ২২২টি ভুয়া তথ্যের মধ্যে ৫১টি ক্ষেত্রে এ ধরনের কনটেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে, যা মোট সংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশ।
যুদ্ধ চলাকালে একটি বহুল আলোচিত দাবিতে বলা হয়, ইরানে ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের এক পাইলটকে আটক করে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে তেহরান। এই দাবির সঙ্গে একটি ছবিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, দাবিটি সঠিক নয় এবং ছবিটিও বাস্তব কোনো ঘটনার নয়; বরং এআই দিয়ে তৈরি।
পরবর্তীকালে সংবাদমাধ্যমে খবর আসে, বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানের দুজন বৈমানিককেই যুক্তরাষ্ট্র উদ্ধার করে।
একই সময়ে ‘আমেরিকান ও ইরানি সেনাবাহিনী এক হয়ে যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে’—এমন দাবিতে ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবিও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বাস্তবে এমন কোনো ঘটনার প্রমাণ মেলেনি; বরং যাচাইয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, ছবিগুলো এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশকেও জড়িয়ে একটি বিভ্রান্তিকর দাবি ছড়ানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবিতে দেখা যায়, ‘বাংলাদেশের ত্রাণ সহায়তা ইরানের জন্য’ লেখা ব্যানারসহ একটি জাহাজ ইরানে পৌঁছেছে। যাচাইয়ে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইরানে ত্রাণ পাঠানোর কোনো তথ্য নেই। ছবিটিও বাস্তব নয়; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এটি তৈরি করে প্রচার করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন দাবিতে এআই দিয়ে তৈরি ছবি ছড়িয়ে পড়ার আরও উদাহরণ রয়েছে। যেমন—ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নিহত হওয়া কিংবা ইরানের বিমানঘাঁটিতে নকল যুদ্ধবিমান আঁকা, এমন সব দৃশ্যই পরে ভুয়া হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।
শুধু ছবি নয়, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ভিডিওও এই সময় ব্যাপকভাবে ছড়ানো হয়েছে। যেমন ইরান–ইসরায়েল সংঘাতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা ধ্বংস হয়েছে—এমন দাবিতে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। একইভাবে ‘কাতারে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করেছে ইরান’ কিংবা ‘বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার পর বেঁচে যাওয়া সেনাদের কান্না’—এমন দাবিতে প্রচারিত ভিডিওগুলোর ক্ষেত্রেও কোনো বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়নি; এগুলোও এআই প্রযুক্তিতে তৈরি।
বিশ্লেষকেরা বলেন, এআই–নির্ভর কনটেন্টের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এর বিশ্বাসযোগ্যতা। বাস্তব দৃশ্যের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি হওয়ায় সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এগুলো আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে যুদ্ধের মতো সংবেদনশীল সময়ে এসব কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভ্রান্তি আরও গভীর করে তোলে।
ভুয়া দাবি
যুদ্ধ ঘিরে ছড়ানো মিথ্যা তথ্যগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধরন ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি। যাচাই করে দেখা গেছে, মোট শনাক্ত হওয়া ভুয়া তথ্যের মধ্যে ২১টি ক্ষেত্রে এমন দাবি প্রচার করা হয়েছে, যেগুলোর পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এসব দাবির বেশির ভাগই তৈরি হয়েছে গুজব, ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট থেকে।
এর একটি আলোচিত উদাহরণ হলো—যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্পের নিহত হওয়ার দাবি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ফটোকার্ডে তাঁর ছবি ব্যবহার করে প্রচার করা হয়, ‘ইরানের হামলায় প্রাণ হারালেন ট্রাম্পের স্ত্রী।’ যাচাইয়ে দেখা যায়, এ দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। প্রকৃতপক্ষে, ‘Januma TV’ (যমুনা নয়) নামের যমুনা টিভির আদলে তৈরি একটি স্যাটায়ার পেজের ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট থেকেই এই বিভ্রান্তির সূত্রপাত, যা পরে বাস্তব সংবাদ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।
শুধু ব্যক্তিকে ঘিরে গুজব নয়, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের গুরুতর দাবিও ছড়ানো হয়েছে। যেমন ‘বাংলাদেশ থেকে ১০ হাজার সেনা ইরানে পাঠিয়েছে সরকার’—এমন একটি দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। কিন্তু এ দাবির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাকে উদ্ধৃত করে প্রচার করা হয়, আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর খবর ভুয়া এবং তিনি সাবমেরিনে আত্মগোপনে আছেন। কিন্তু যাচাইয়ে জানা যায়, রাশিয়ার কোনো গোয়েন্দা সংস্থা এ ধরনের বক্তব্য দেয়নি। বরং রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষ থেকে দেওয়া শোকবার্তায় খামেনির মৃত্যুকে ঘিরে ভিন্ন প্রেক্ষাপট উঠে আসে।
এ ছাড়া সংঘাত চলাকালে আরও নানা ধরনের ভুয়া দাবি সামনে আসে। ইরানের হামলায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিহত হওয়ার খবর, কিংবা ইসরায়েলের উপপ্রধানমন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিনকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করার দাবি—এসবও যাচাইয়ে মিথ্যা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলেন, এ ধরনের ভুয়া দাবির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো দ্রুত আবেগকে নাড়া দেয় এবং রাজনৈতিক বা সামরিক বাস্তবতাকে নাটকীয়ভাবে বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ফলে অনেক ব্যবহারকারী যাচাই না করেই এসব তথ্য বিশ্বাস ও শেয়ার করেন। কিন্তু বাস্তবে এগুলোর কোনো ভিত্তি না থাকায় এসব দাবি শুধু বিভ্রান্তিই বাড়ায় না, বরং সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
ভুয়া মন্তব্য
যুদ্ধের সময়ে অপতথ্যের আরেকটি লক্ষণীয় ধরন ছিল বিভিন্ন ব্যক্তি ও নেতার নামে মনগড়া বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া। শনাক্ত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনের মোট ১২টি ক্ষেত্রে এমন ভুয়া মন্তব্য প্রচার করা হয়েছে, যেগুলোর কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র বা প্রমাণ নেই।
এ ধরনের অপপ্রচারের বড় অংশজুড়ে ছিল বিশ্বনেতাদের নামে প্রচারিত বিভ্রান্তিকর বক্তব্য। যেমন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্ধৃত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে—‘ইরান এভাবে পাল্টা হামলা শুরু করবে ভাবতে পারিনি’ কিংবা ‘ইরানের এত সক্ষমতা আছে জানলে কখনোই যুদ্ধে জড়াতাম না’—এমন দুটি মন্তব্য।
প্রকৃতপক্ষে এসব বক্তব্য ট্রাম্প কখনো দেননি; বরং দুটি স্যাটায়ার পেজের ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট থেকেই এই দাবির সূত্রপাত, যা পরে বাস্তব মন্তব্য হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।
একইভাবে, উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনকে উদ্ধৃত করে দাবি করা হয়, ইরান চাইলে তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করবে এবং একটি ক্ষেপণাস্ত্রই ইসরায়েলকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু যাচাইয়ে এ ধরনের কোনো বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশকেও ঘিরে এমন ভুয়া মন্তব্য ছড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে। যেমন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নামে প্রচার করা হয়, বাংলাদেশে কোনো দেশ হামলা করলে ‘আয়াতুল কুরসি পড়া ছাড়া বিকল্প প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নেই’। যাচাইয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি; কোনো সূত্র ছাড়াই এটি তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরেও একাধিক ভুয়া মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। যেমন ইসরায়েলের ধ্বংস চাওয়া, ইরানকে সমর্থন না করলে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না বলা, কিংবা চলমান সংঘাতে ইসরায়েলকে হুঁশিয়ারি দেওয়া—এমন কোনো বক্তব্যই তিনি দেননি বলে যাচাইয়ে উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকেরা বলেন, এসব ভুয়া মন্তব্য ছড়ানোর কৌশলটি তুলনামূলক সহজ হলেও এর প্রভাব অনেক বেশি। পরিচিত ব্যক্তি বা প্রভাবশালী নেতাদের নামে বক্তব্য জুড়ে দিলে তা দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা পায় এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে সংঘাতের সময় রাজনৈতিক অবস্থান বা সামরিক বার্তার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি থাকায় এ ধরনের ভুয়া মন্তব্য সহজেই বিভ্রান্তি তৈরি করে।
ছবিতে বিভ্রান্তি
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে ঘিরে অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে স্থিরচিত্র বা ইমেজও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশিত ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, মোট আটটি ক্ষেত্রে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর ছবি শনাক্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এসব ছবির ক্ষেত্রে মূল কৌশল ছিল—বাস্তব কোনো ছবিকে ভিন্ন দাবি বা প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা।
এর একটি উদাহরণ হলো—‘ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ৭০ বছর পুরোনো মিসাইল ব্যবহার করছে ইরান’ শিরোনামে প্রচারিত একটি ছবি। ছবিটিতে একটি দীর্ঘ কাঠামোকে মিসাইল হিসেবে দেখানো হলেও যাচাইয়ে জানা যায়, এটি আসলে কোনো অস্ত্র নয়। প্রকৃতপক্ষে, ছবিটি ১৯৫৬ সালে ইয়েমেনের বিভিন্ন শহরে পানি সরবরাহের জন্য স্থাপিত একটি পাইপলাইনের, যা ভুলভাবে মিসাইল হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
আরেকটি ঘটনায়, ‘ইরানের হামলা থেকে বাঁচতে মার্কিন পুলিশ ভয়ে আজান দিতে শুরু করেছে’—এমন দাবিতে একাধিক ছবির একটি কোলাজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিগুলোতে এক ব্যক্তিকে আজান দিতে দেখা যায়, যা যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ সদস্য বলে দাবি করা হয়।
কিন্তু যাচাইয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, ছবিটি চলমান সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এটি ২০২১ সালের রমজান মাসে কানাডার ক্যালগারিতে রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের কর্পোরাল নাদের খলিলের আজান দেওয়ার একটি ঘটনা, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের।
বিশ্লেষকেরা বলেন, স্থিরচিত্রের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি করা তুলনামূলক সহজ, কারণ একটি ছবির ভিজ্যুয়াল উপস্থাপন অনেক সময়ই প্রেক্ষাপটের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। ফলে একটি পুরোনো বা ভিন্ন ঘটনার ছবি নতুন দাবি যুক্ত করে ছড়িয়ে দিলে তা দ্রুত বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে এবং ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
গেমিং ভিডিও ও চলচ্চিত্র
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে ঘিরে ছড়ানো অপতথ্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ধরন ছিল গেমিং ভিডিও বা চলচ্চিত্রের খণ্ডিত অংশ ব্যবহার করা। ভুল তথ্য শনাক্ত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মোট সাতটি ক্ষেত্রে এ ধরনের কনটেন্ট বাস্তব যুদ্ধের দৃশ্য হিসেবে প্রচার করা হয়েছে, যা দর্শকদের সহজেই বিভ্রান্ত করেছে।
সংঘাতের একপর্যায়ে ‘তেহরানে বিশাল বিমান হামলা শুরু’—এমন শিরোনামে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটিতে আকাশ থেকে হামলার নাটকীয় দৃশ্য দেখানো হলেও যাচাইয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি বাস্তব কোনো ঘটনার নয়।
বরং একটি গেমিং ভিডিওকে নতুন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করে ইরানের রাজধানীতে হামলার দৃশ্য বলে প্রচার করা হয়েছে। যাচাইয়ে জানা যায়, একই ভিডিওর মিল পাওয়া যায় ‘Nihal Gametube’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি গেমিং কনটেন্টের সঙ্গে।
একইভাবে, ‘ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করল ইরান’—এমন দাবিতে প্রচারিত একটি ভিডিওও বাস্তব যুদ্ধের নয়; সেটিও একটি ভিডিও গেম থেকে নেওয়া ভিডিও। একই ধরনের আরেকটি ভিডিওতে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলার দৃশ্য দেখানো হয়। কিন্তু যাচাইয়ে জানা যায়, সেটিও গত বছরের একটি গেমিং ভিডিও, যা নতুন করে সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সংঘাতের প্রেক্ষাপটে একটি ভিডিওতে সাইরেনের শব্দের মধ্যে কয়েকজন মানুষকে আতঙ্কিত অবস্থায় মাটিতে বসে থাকতে দেখা যায়, যা ইসরায়েলে রকেট হামলার সময়কার দৃশ্য বলে দাবি করা হয়। কিন্তু যাচাইয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি কোনো বাস্তব ঘটনার ভিডিও নয়; বরং ইয়েমেনের এক কৌতুকাভিনেতার নির্মিত একটি কমেডি চলচ্চিত্রের অংশ।
বিশ্লেষকেরা বলেন, আধুনিক ভিডিও গেমের গ্রাফিকস এতটাই বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে যে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য তা বাস্তব দৃশ্য থেকে আলাদা করা কঠিন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংঘাতের সময় গেমিং ফুটেজ বা চলচ্চিত্রের দৃশ্যকে বাস্তব যুদ্ধের ভিডিও হিসেবে প্রচার করা হয়। এর ফলে শুধু বিভ্রান্তিই নয়, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে অতিরঞ্জিত ও ভীতিকর ধারণাও তৈরি হয়।
গণমাধ্যমের নকল ফটোকার্ড
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে ঘিরে অপতথ্যের আরেকটি কৌশল ছিল গণমাধ্যমের আদলে তৈরি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেওয়া। যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট পাঁচটি ক্ষেত্রে এ ধরনের নকল ফটোকার্ড শনাক্ত করা হয়েছে।
সংখ্যায় কম হলেও এসব কনটেন্টের প্রভাব তুলনামূলক বেশি, কারণ এগুলো মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ায়।
এ ধরনের একটি ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় টিভির ডিজাইন ব্যবহার করে একটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়, যেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নামে দাবি করা হয়—‘রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া ও বাংলাদেশ—আমরা ইরানকে হারতে দেব না।’
তবে যাচাইয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, সময় টিভি এমন কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি এবং তারেক রহমানও এ ধরনের কোনো মন্তব্য করেননি।
একইভাবে বাংলাভিশনের ডিজাইন ব্যবহার করে ‘জামায়াতে ইসলামীর অনুরোধে হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশের জাহাজে বাধা দেবে না ইরান’—এমন দাবিতে একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে।
যাচাইয়ে দেখা যায়, ইরান এ ধরনের কোনো ঘোষণা দেয়নি এবং বাংলাভিশনও এমন কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। প্রকৃতপক্ষে, ভিন্ন একটি ফটোকার্ড সম্পাদনা করে সেটিকে নতুন দাবি যুক্ত করে প্রচার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলেন, নকল ফটোকার্ড অপপ্রচারের একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে, কারণ এগুলো দেখতে হুবহু আসল সংবাদমাধ্যমের মতো হওয়ায় সাধারণ পাঠকের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে ভুয়া বলে শনাক্ত করা কঠিন। ফলে একটি ভুয়া বক্তব্যও দ্রুত ‘সংবাদ’ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে, যা শুধু জনমতকে বিভ্রান্তই করে না, বরং গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।