বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মিয়ানমারে জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের সামরিক সরকারকে এখন পর্যন্ত কেউ স্বীকৃতি দেয়নি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সদ্য সমাপ্ত অধিবেশনে মিয়ানমারের আসনটি ফাঁকা ছিল।

মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আগামী মাসে (নভেম্বর) জাতিসংঘে আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের বিকল্প সরকারকে বিদ্যমান সংকট নিরসনে যুক্ত করার আহ্বান আন্তর্জাতিক পরিসরে এনইউজির স্বীকৃতির বিষয়টিকে জোরালো করে তুলছে।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গতকাল মিয়ানমারের ধর্মীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পরিস্থিতিসহ দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবটির পক্ষে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৬৪৭ সদস্য ভোট দেন। বিপক্ষে ভোট দেন দুজন। আর ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকেন ৩১ সদস্য।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রস্তাবে মিয়ানমারে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের পাশাপাশি বিক্ষোভ-প্রতিবাদকারীদের দমন-পীড়নের ঘটনায় দেশটির সামরিক সরকারের নিন্দা জানানো হয়েছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘন ও হামলার এসব ঘটনাকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁরা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। পাশাপাশি তাঁরা দেশটির ধর্মীয় নেতাদের আটক-গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়েছেন।

মিয়ানমারের স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও আটকের বিষয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মিয়ানমারে করোনাভাইরাসের তৃতীয় ঢেউ শুরু হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশটিতে মানবিক সংকটের বিষয়ে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যে অজুহাতে অভ্যুত্থান করেছে, তার সত্যতা খুঁজে পাননি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা। অভ্যুত্থান-পরবর্তী যেসব অভিযোগ জান্তা করেছে, তারও সত্যতা পাননি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা। ফলে তাঁরা মিয়ানমারের ক্ষমতাচ্যুত সরকারের প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট ও স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছেন।

মিয়ানমারে চলমান সংকট নিরসনে বিকল্প সরকারকে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা তাঁদের প্রস্তাবে বলেছেন, দেশটির জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে এনইউজি গঠিত হয়েছে। দেশটির জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলনের একমাত্র আইনসম্মত প্রতিনিধিত্বকারী হচ্ছে এনইউজি। তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোটসহ (আসিয়ান) অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য একটি সত্যিকারের ও অংশগ্রহণমূলক আলোচনা ও প্রক্রিয়ার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এ উদ্যোগে এনইউজিকে যুক্ত রাখতে হবে।

মিয়ানমারের চলমান সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য আসিয়ানের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রস্তাবে জোটটিকে (আসিয়ান) আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে বলা হয়েছে। আসিয়ান তাদের উদ্যোগে যাতে এনইউজিসহ মিয়ানমারের নাগরিক সমাজকে যুক্ত রাখে, সেটিও বলা হয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রস্তাবে।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে চীন ও রাশিয়াকে মিয়ানমারের সংকট নিরসনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা।

default-image

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিরাপদ, স্বেচ্ছা ও মর্যাদাপূর্ণ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নৃশংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখার প্রসঙ্গটিও প্রস্তাবে এসেছে।

মিয়ানমারের সামরিক সরকারের অর্থনৈতিক উৎস প্রতিরোধ করার লক্ষ্যের কথা বলেছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা। এ জন্য তাঁরা ইউরোপীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশগুলোকে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আরও ব্যাপক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্সের ফেলো অধ্যাপক মো. শহীদুল হক আজ শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে সামরিক অভ্যুত্থানের আট মাসের মাথায় মিয়ানমারের বিকল্প সরকারের প্রতি দুই পার্লামেন্টের সমর্থন নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এতে করে বোঝা যায়, মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না দেওয়ার বিষয়টি জোরালো হচ্ছে। এটিকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশও রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে সব পক্ষের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের বিষয়টি ভেবে দেখতে পারে। বাংলাদেশ কীভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত হবে, তাতে দুই পার্লামেন্টের প্রস্তাব সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রস্তাব তাদের আগের অবস্থানেরই প্রতিফলন। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তো নিশ্চয় মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করছে না। ফলে এখন তারা এনইউজিকে স্বীকৃতির বিষয়টি সামনে এনে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে দর-কষাকষি করে সুফল নিতে চাইবে। আর মিয়ানমারের সামরিক সরকার যেহেতু বেকায়দায় আছে, তারাও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ছাড় দিয়ে হলেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখবে।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন