একটি সত্যি প্রেমের গল্প

নূরা আরকাভাজি ও তাঁর স্বামী ববি দোদেভস্কি
নূরা আরকাভাজি ও তাঁর স্বামী ববি দোদেভস্কি

দৃশ্যটা মোটেও প্রেমময় নয়: একজন ইরাকি তরুণী, অসুস্থ। একদল শরণার্থীর সঙ্গে সার্বিয়ায় প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন। আরেকজন মেসিডোনিয়ার পুলিশ। সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে।
ধর্মও আলাদা। নূরা আরকাভাজি নামের নারীটি কুর্দি মুসলিম। আর ববি দোদেভস্কি নামের পুরুষটি অর্থোডক্স খ্রিষ্টান। এত ব্যবধান, তবু তাঁরা প্রেমে পড়লেন। ঘটনাটা গত মার্চের শুরুর দিকে। চার মাস পরেই তাঁরা বিয়ে করেন।
ববির মনে পড়ে নূরাকে যখন প্রথম দেখেছিলেন, সেই বৃষ্টিদিনের কথা। দুই বলকান দেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন নূরা। ঘটনাচক্রে ববি তখন সহকর্মীর সঙ্গে পালা বদল করে সীমান্ত প্রহরার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ৩৫ বছর বয়সী অমায়িক লোকটির ভাষ্য, এটা ছিল নিয়তি।
মেসিডোনিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় শহর কুমানোভোর ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে বসে চা খেতে খেতে গল্প করছিলেন ববি। ২০ বছর বয়সী নূরাকে নিয়ে সুখেই সংসার করছেন। এই তরুণী ইরাকের দিয়ালা প্রদেশে থাকতেন। সেখানে সহিংস যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে পালাতে বাধ্য হন। ববি বলছিলেন, নূরার বাবাকে আইএস জঙ্গিরা অপহরণ করে বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ চেয়েছিল।
২০১৬ সালের শুরুর দিকে নূরা, তাঁর ভাইবোন ও মা-বাবা বাড়িঘর ছেড়ে পশ্চিমের দিকে দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেন। সীমান্ত পেরিয়ে তুরস্ক হয়ে একটা নৌকা নিয়ে গ্রিসের লেসবস দ্বীপে পৌঁছানোর পর মেসিডোনিয়ায় প্রবেশ করলেন। উদ্দেশ্য ছিল, জার্মানিতে পৌঁছাবেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা এগিয়ে গেলেও নূরা নিজের জীবনসঙ্গীকে খুঁজে পেয়ে রয়ে গেলেন মেসিডোনিয়ায়।
সীমান্তে নূরাকে অসুস্থ অবস্থায় পেয়েছিলেন ববি। সারিয়ে তুলতে সেবাযত্নের ত্রুটি করেননি। তিনি ইংরেজি ভালো জানেন বলেই পুলিশের অন্য সদস্যরা তাঁর কাছে নূরাকে পৌঁছে দিয়েছিল। নূরার মনে পড়ে ববি তখন বলেছিলেন, ‘চিন্তা কোরো না। তোমার জীবনে সবকিছু খুব সুন্দর হবে।’

কুমানোভো শহরে নিজেদের ঘরে ক্রিসমাস ট্রি সাজাচ্ছেন তাঁরা l এএফপি
কুমানোভো শহরে নিজেদের ঘরে ক্রিসমাস ট্রি সাজাচ্ছেন তাঁরা l এএফপি


ববি আগেও দুটো সংসার করেছেন। বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। নূরাকে দেখে তাঁর মনে হলো, জীবনে বিশেষ কাউকে পেয়েছেন। তারপর কয়েকটা দিন স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকলেন নূরা। তখন এই যুগল একসঙ্গে অনেক সময় কাটালেন। নূরার মাকে স্থানীয় বাজারে নিয়ে গিয়ে ববি কিছু খাবার ও কাপড়চোপড় কিনে দিলেন। নূরা এখন ছয়টি ভাষায় কথা বলেন। স্থানীয় রেডক্রসের কাজে সাহায্য করছেন।
এপ্রিলের এক সন্ধ্যায় নূরাকে রেস্তোরাঁয় আমন্ত্রণ জানিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দেন ববি। নূরার প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না। একপর্যায়ে সম্মতি দিলেন। কিন্তু তাঁর মনে সংশয়, অমুসলিম কাউকে বিয়ে করলে পরিবারে না জানি কী প্রতিক্রিয়া হয়! কিন্তু নূরা দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিলেন, ‘আমি একজন ভালো মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছি।’
নূরা এখন নিজের মা-বাবা-ভাই-বোনকে নিয়ে কথা বলতে অনিচ্ছুক। তবে তাঁরা জার্মানিতে ভালো আছেন জেনে নিশ্চিন্ত। নূরা-ববির বিয়েটা কুমানোভোয় গত ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেটা নূরার জন্মদিনও। নানা ধর্মের ১২০ জন অতিথি সেই বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন।
ববির বর্তমান সংসারে আগের পক্ষের তিন শিশুসন্তানও থাকে। নূরা এখন প্রথমবার অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন। বললেন, মেসিডোনিয়াকে এখন নিজের দেশই মনে করেন তিনি। আর প্রতিবেশীরাও তাঁকে বিদেশি বা শরণার্থী মনে করে না।
ববি আশা করেন, তাঁদের প্রেমকাহিনি অন্য তরুণ-তরুণীদের উদ্দীপনা জোগাবে। ফলে তাঁরা প্রিয়জনের সঙ্গে থাকার জন্য সব বাধা পেরোতে পারবেন। সে জন্য নিজের ওপর বিশ্বাস, ভালোবাসার প্রতি আস্থা আর নিয়তির ওপর ভরসা রাখতেই হবে।