default-image

২০২২ সালে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর বসবে কাতারে। বিশ্বকাপ ফুটবলের এ মহাযজ্ঞের আয়োজন কাতারে হলেও উপকৃত হবেন লাখো অভিবাসী শ্রমিক। কারণ, বিশ্বকাপের আগেই শ্রম আইনে বদল করেছে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার। দীর্ঘ সমালোচিত কর্মসংস্থানব্যবস্থা ‘কাফালা’ কার্যকরভাবে বাতিলের ফলে শ্রমিকদের আয় অনেকটাই বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

দেশটিতে শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি এক হাজার কাতারি রিয়াল (১ রিয়াল সমান ২৩ টাকার বেশি) নির্ধারণের সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়েছে। কাফালা বাতিলের সিদ্ধান্তটি সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশিত হলেও আইনটি কার্যকর হতে কমপক্ষে আরও ছয় মাস সময় লাগবে।

কাফালা বাতিলের খবর জানিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) জানিয়েছে, এখন অভিবাসী শ্রমিকেরা তাঁদের বর্তমান নিয়োগকর্তাদের অনুমতি না নিয়েই চুক্তি শেষ হওয়ার আগে চাকরি পরিবর্তন করতে পারবেন। এ ছাড়া ন্যূনতম মজুরি বিধিমালার ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাদের শ্রমিকদের জন্য আবাসন ও খাবারের জন্য ভাতা প্রদান করতে হবে। তবে নিয়োগকর্তারা চাইলে এখনো ‘পলাতক’ কর্মীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ করতে পারবেন।

বিজ্ঞাপন

এদিকে এ পদক্ষেপের প্রশংসা করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, এটি উৎসাহজনক লক্ষণ যে শেষ পর্যন্ত কাতার সঠিক পথে চলছে।

বিশ্বের সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের সুবিধা উপভোগ করা কাতার ২০১৮ সালে আংশিকভাবে কাফালাব্যবস্থা বাতিল করেছিল। আইএলও বলছে, এ পদ্ধতি বাতিল হলে প্রবাসী কর্মীরা নিজের ইচ্ছানুযায়ী কফিল (নিয়োগকর্তা) পরিবর্তন ও দেশে আসা-যাওয়া করতে পারবেন এবং কর্মসংস্থান চুক্তিতে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী চলাচলের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পাবেন।

কাফালা পদ্ধতি কী
কোনো এক ব্যক্তির অধীন বিদেশি শ্রমিকদের নিয়োগ দেওয়াই হলো কাফালা পদ্ধতি।

যেখানে একজন কফিল কোনো বিদেশি কর্মীকে স্পনসর করলে সেই কর্মী কাতার যেতে পারেন এবং সেখানে যাওয়ার পর ওই নিয়োগকর্তার অধীন কাজ করতে হয় তাঁকে। এ ক্ষেত্রে ওই কর্মীর কাজ পরিবর্তনসহ সার্বিক সব বিষয় নির্ভর করে নিয়োগকর্তার ওপর।

default-image

এত দিন ধরে চলা কাফালার নিয়মমতে, কোনো শ্রমিক বা কর্মী অন্য কাজে যোগ দিতে চাইলে তাঁকে তাঁর উচ্চপদস্থ কর্মী বা সংস্থার অনুমতি নিতে হতো। দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা সেই নিয়মের এবার অবলুপ্তি ঘটল। ফলে চাকরি ছেড়ে ক্ষেত্রে আলাদা করে অনুমতির প্রয়োজন হবে না।

কাতারে থাকা ও খাওয়ার জন্য আগে কর্মীদের যে বেতন দেওয়া হতো, তা ২৫ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নতুন নিয়মে। ন্যূনতম বেতন হবে এক হাজার কাতারি রিয়াল। ১ কাতারি রিয়াল সমান বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৩ টাকার কিছু বেশি। শ্রম আইনে পরিবর্তনের কথা গত বছরই জানিয়েছিল কাতার।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ভিনদেশের কর্মী ও শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল। লাখো শ্রমিক বা কর্মী বেশি অর্থ আয়ের জন্য কাতারে যান। সেখানে বাংলাদেশের চার লাখের বেশি কর্মী কাজ করেন। তাই বেতন ও সুযোগ–সুবিধা বৃদ্ধি পেলে প্রত্যেকেই উপকৃত হবেন, তা তো বলাই যায়। একই সঙ্গে এক চাকরি ছেড়ে অন্য চাকরি করতে চাইলে আগের মতো আর কঠোর নিয়ম পালনের প্রয়োজন হবে না।

কাতার হচ্ছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় শীর্ষ শ্রমবাজার (প্রথম ভারত)। সেখানে দিন দিন বাংলাদেশি কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। ২০২২ বিশ্বকাপের জন্য স্টেডিয়াম তৈরির কাজে যুক্ত শ্রমিক ও কর্মীদের চাহিদা বাড়ার সুযোগসহ নানা সুযোগ বাংলাদেশিরা নিতে পারবেন। ২০ লাখের বেশি অভিবাসী কর্মী সেখানে কাজ করছেন। এখন সুযোগটা কাজে লাগানো যাবে কি না, প্রশ্ন সেটাই।

সম্প্রতি শ্রমিক ও কর্মীদের ওপর অত্যাচার ও জোর করে কাজ করানো নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল কাতার। ২০২২ বিশ্বকাপের জন্য স্টেডিয়াম তৈরির কাজে যুক্ত শ্রমিকদের নানা হুমকি দিয়ে কাজ করানোর অভিযোগ তুলেছিল আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো। এরপরই শ্রম আইনে বদলের সিদ্ধান্ত নিল কাতার।

বিজ্ঞাপন

কাফালার পরিবর্তনের প্রসঙ্গে আইএলওর মহাপরিচালক গাই রাইডার বলেন, এই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কাতার কিছু প্রতিশ্রুতি দিল। শ্রমিকদের আরও বেশি স্বাধীনতা, সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি নিয়োগকর্তাদের বদলে ফেলার স্বাধীনতাও পেলেন কর্মীরা।

শ্রম ও সামাজিকবিষয়ক মন্ত্রী ইউসুফ মোহাম্মদ আল ওথমান ফাখরুও বলেন, এই নতুন আইন একটি বড় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এতে শ্রমিক, নিয়োগকারী ও দেশ একইভাবে উপকৃত হবে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, কাতার অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। কারণ, ন্যূনতম মজুরি একজন কর্মীর জন্য খুব কম ছিল।

অ্যামনেস্টির অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার বিভাগের প্রধান স্টিভ ককবার্ন বলেন, সত্যিকার অর্থে শ্রমিকদের ন্যায়বিচারের জন্য দরকার ছিল। নিয়মিত পর্যালোচনা করে কর্মীদের মজুরি ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

কাতারে কাজ করেন নেপালের মনি সাপকোটা। তিনি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, এখন কাতারে খাবারের দাম আকাশছোঁয়া। একজন মানুষের খাবারের পেছনে এখন মাসে ৪০০ রিয়াল খরচ হয়। তাই স্বল্প বেতনের কর্মীদের জন্য এখানে কাজ করাটা অনেক কঠিন।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন