বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পানশিরে তালেবানের হাতে যারা নিহত হয়েছে, তার মধ্যে ২০টি ঘটনার তথ্যের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে বিবিসি। গণমাধ্যমটি বলছে, এই ২০ জনের মধ্যে একজন দোকানি রয়েছেন। তাঁর নাম আবদুল সামি। তাঁর দুই ছেলেমেয়ে। স্থানীয় একটি সূত্র বলছে, তালেবান যখন পানশির দখলে নিতে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন সামি এলাকা ছেড়ে যাননি। সামির বক্তব্য ছিল, ‘আমি একজন দরিদ্র মানুষ। এই যুদ্ধের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’

সামি যেমনটা ভেবেছিলেন, তেমনটা ঘটেনি। পানশির তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় তাঁকে গ্রেপ্তার করে তালেবান। তাদের অভিযোগ, বিদ্রোহীদের কাছে মুঠোফোনের সিম বিক্রি করেন তিনি। গ্রেপ্তারের কয়েক দিন পর বাড়ির কাছের একটি এলাকায় তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, মরদেহ দেখে মনে হয়েছে, তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছে।

তালেবান পানশিরে প্রবেশের পর নতুন একটি কৌশল হাতে নিয়েছে। তারা সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে। তালেবানের এক মুখপাত্র আবদুল্লাহ রাহমানি বলেন, পানশিরবাসীর উচিত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা ও দৈনন্দিন কাজকর্ম করা। তিনি বলেন, ‘একজন দোকানি যদি দোকানে যান, একজন কৃষক যদি মাঠে যান, তবে আমরা তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করাসহ তাঁদের পরিবারের সদস্যদের রক্ষায় কাজ করব।’

default-image

তালেবানের এমন বক্তব্যের ওপর ভরসা পাচ্ছে না পানশিরবাসী। কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, পানশিরের অন্যতম ব্যস্ত একটি বাজার ফাঁকা পড়ে আছে। মানুষ এখনো পানশির থেকে পালানোর চেষ্টা করছে। তালেবান নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় সেখানে খাবার ও ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে এ নিয়ে সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।

তালেবান বরাবরই দাবি করছে, জনসাধারণ তাদের লক্ষ্যবস্তু নয়। কিন্তু তাদের কথা আর কাজে কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ, হাজারা ক্ষুদ্রগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এক নিধন অভিযান চালিয়েছে তালেবান। এ ছাড়া সেখানে এক পুলিশকেও হত্যা করেছে তারা। যদিও তালেবানের প্রতিশ্রুতি ছিল, তারা কোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেবে না।

এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্যাট্রিসিয়া গ্রসম্যান বলেন, ‘আফগানিস্তানজুড়ে এমন ঘটনা ঘটেছে, আমরা এসব নথি সংগ্রহ করছি। এ ঘটনাগুলো একটি ধাঁচে ঘটেছে।’ তিনি বলেন, ‘জুলাই ও আগস্টে কাবুল নিয়ন্ত্রণের পথে তালেবান যখন এগোচ্ছিল, তখনো এমন ঘটনা ঘটেছে। সামরিক বাহিনীর সদস্য, আফগানিস্তানের সরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে তালেবান। এ হত্যাকাণ্ডগুলো প্রতিশোধমূলক, আমরা এমন অনেক তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট ধাঁচে ঘটনাগুলো ঘটছে।’

default-image

গত ১৫ আগস্ট কাবুল দখলের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের ৩৩টি প্রদেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তালেবান। তবে একমাত্র পানশির প্রদেশ তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। আর এই পানশির ছিল বিদ্রোহী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্টের (এনআরএফ) নিয়ন্ত্রণে। দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর এনআরএফের সঙ্গে তালেবানের সমঝোতা আলোচনা চলছিল। তবে তাতে সমাধান না এলে তালেবান পানশিরে আক্রমণ চালানোর পথ বেছে নেয়।

এদিকে এই এনআরএফের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কমান্ডার আহমেদ মাসুদ। সোভিয়েত ও তালেবান বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে ‘পানশিরের সিংহ’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন তাঁর বাবা আহমেদ শাহ মাসুদ। কাবুলের নিয়ন্ত্রণ তালেবানের হাতে চলে যাওয়ার পর এ উপত্যকায় তালেবানবিরোধী প্রতিরোধযুদ্ধ গড়ে তোলা হয়। সেখানে মাসুদের নেতৃত্বাধীন মিলিশিয়াদের সঙ্গে আফগান সামরিক বাহিনীর কমান্ডারদের একাংশ মিলে গঠন করে এনআরএফ।

default-image

এর আগেও তালেবান যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনো এ পানশির তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। এ ছাড়া সোভিয়েত বাহিনীও পানশিরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। কিন্তু এবার আর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা সম্ভব হয়নি এনআরএফের পক্ষে। গত সপ্তাহে উপত্যকায় প্রবেশ করেছে তালেবান। এরপর সেখানকার গভর্নরের কার্যালয়ে পতাকা উড়িয়েছে তারা। ফলে এখন অনেকে দৃষ্টি রাখছেন পানশিরের ওপর। কী ঘটে পানশিরে, সেটা দেখার অপেক্ষায় সবাই।

বিবিসি অবলম্বনে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন মোজাহিদুল ইসলাম মণ্ডল

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন