জেলার সামারাবিক্রমার গ্রামের অধিকাংশ প্রান্তিক কৃষকও মাহিন্দার সুরে কথা বললেন। তাঁরা এ মৌসুমে আর ফসল ফলাতে চান না। মে থেকে আগস্ট দেশটির ফসল বোনার সময়। কিন্তু এখন আর মাঠে সেচ দিতে চাইছেন না কৃষকেরা। তাঁরা বলছেন, রাসায়নিক সার নিষিদ্ধ করায় ফসল ফলছে না। এর বাইরে জ্বালানি–সংকটের কারণে চাষ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

দেশটির ‘মুভমেন্ট ফর ল্যান্ড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার রিফর্ম নামের বেসরকারি সংগঠন বলছে, হাম্বানটোটা জেলার অধিকাংশ প্রান্তিক কৃষক এবং উত্তরাঞ্চলের অনুরাধাপুরা ও পোলোনারুয়ার মতো কৃষিপ্রধান অঞ্চলের কৃষকেরা এ মৌসুমে তাঁদের চাষাবাদ বন্ধ রাখছেন।

মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের ফলে দেশে শৈশবকালীন অপুষ্টি এবং অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের মধ্যে অপুষ্টি সমস্যা দেখা দেবে। আগামী চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে আমাদের আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে।
জিউইকা ওয়েরাহেওয়া, শ্রীলঙ্কার পেরাদেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিভাগের অধ্যাপক

এ অবস্থায় খাদ্যসংকটে ভুগতে থাকা শ্রীলঙ্কা আরও বেশি অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রপ্তানি পণ্যের পাশাপাশি দেশটি স্থানীয়ভাবে উৎপন্ন খাদ্যশস্য–সংকটেও পড়ে যেতে পারে।

শ্রীলঙ্কা কাউন্সিল ফর অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ পলিসির প্রেসিডেন্ট গামিনি সেনানায়েকে বলেন, ‘খাদ্যের দিক থেকে আগামী কয়েক মাস খুব কঠিন সময় আসবে। খাদ্যসংকট দেখা দেবে। আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।’

২ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার দ্বীপরাষ্ট্রটি একসময় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। কিন্তু গত মে মাসে দেশটির প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের ঘোষিত বিশ্বের প্রথম অর্গানিক বা জৈব কৃষিনীতির কারণে ভুগতে থাকে দেশটি। তাঁর নীতির কারণে দেশটিতে রাসায়নিক সার, কীটনাশক নিষিদ্ধ করা হয়। এতে দেশটির খাদ্যনিরাপত্তা মারাত্মক হুমকিতে পড়ে যায়। মাটি ভালো রাখার পাশাপাশি কৃষকদের কিডনি রোগ ঠেকাতে রাতারাতি রাসায়নিক সার ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে গোতাবায়ার প্রশাসন।

দেশটির ২০ লাখ কৃষক আকস্মিকভাবে মহাবিপদে পড়ে যান। তাঁদের অভিযোগ, সরকার প্রয়োজনীয় জৈব সারের উৎপাদন না বাড়িয়েই এ সিদ্ধান্ত নেয়। এতে গত মার্চের শেষে দেশটিতে কৃষিপণ্যের উৎপাদনে ব্যাপক ধস নামে। ওই সময়টিকে শ্রীলঙ্কার ‘মাহা’ মৌসুম বলা হয়। এ মৌসুমে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ঠিক কতটা কমেছে, তার সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, ফলন ২০ থেকে ৭০ ভাগ কম হয়েছে। শ্রীলঙ্কার প্রধান খাদ্যশস্য ধানের উৎপাদন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমেছে। এ বছরের প্রথম তিন মাসে তাই দেশটিকে তিন লাখ টন চাল আমদানি করতে হয়েছে। এর আগে ২০২০ সালে দেশটি মাত্র ১৪ হজার মেট্রিক টন চাল আমদানি করেছিল।

অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ার কারণে সরকার প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করতে পারছে না। এর মধ্য রয়েছে জ্বালানি ও ওষুধ। সংকট থেকে দেশটির মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে গেছে। মানুষ ডিজেল পেতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ থাকছে না ১৩ ঘণ্টার বেশি। ওষুধের অভাবে মানুষের ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকেরা। হাজারো মানুষ শাসনক্ষমতায় থাকা রাজাপক্ষে পরিবারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন। এর জের ধরেই মন্ত্রিসভায় থাকা প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার বড় ভাই প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষেসহ তাঁর পরিবারের সদস্যরা পদত্যাগ করেন। তবে প্রেসিডেন্ট পদত্যাগের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন।

শ্রীলঙ্কার পেরাদেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিভাগের অধ্যাপক জিউইকা ওয়েরাহেওয়া বলেন, মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের ফলে দেশে শৈশবকালীন অপুষ্টি এবং অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের মধ্যে অপুষ্টি সমস্যা দেখা দেবে। আগামী চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে আমাদের আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে।

এদিকে শ্রীলঙ্কার সরকারি দলের দুজন সংসদ সদস্যকে (এমপি) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত সপ্তাহে ঘটে যাওয়া সহিংসতায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগে গতকাল তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। দেশটিতে কয়েক দিন ধরে চলা বিক্ষোভ–সহিংসতায় ৯ জন নিহত হয়েছেন।