বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় ওসামা বিন লাদেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আমিন উল–হককে চলতি সপ্তাহেই আফগানিস্তানের নানগরহার প্রদেশে দেখা গেছে বলে খবর বেরিয়েছে। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে আল–কায়েদা সন্ত্রাসীদের হামলার পর এই আমিন উল–হককে বৈশ্বিক

সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে তালেবান ও আল–কায়েদার মধ্যে জোরালো যোগাযোগ থাকার কথা বলা হয়েছে। এদিকে আফগানিস্তানে নতুন করে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আরেক সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) আফগান শাখা ইসলামিক স্টেটের খোরাসান প্রভিন্স–আইএসকেপি। গেল সপ্তাহেই কাবুলে বিমানবন্দরে তাদের হামলায় ১৩ মার্কিন সেনাসহ ২০০–র মতো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

নিজেদের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধের সমাপ্তি টেনে স্থানীয় সময় সোমবার ঠিক মধ্যরাতের আগে কাবুলে বিমানবন্দর ছাড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ উড়োজাহাজ। এরপর বিমানবন্দরে ঢুকে নিজেদের বিজয় ঘোষণা করে তালেবান। রাতের আকাশে আতশবাজি ও গুলি ছুড়ে এই ‘বিজয়’ উদ্‌যাপন করেন তালেবান যোদ্ধারা। বিমানবন্দরে তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের আর কোনো সন্দেহ নেই যে ইসলামিক আমিরাত অব আফগানিস্তান একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। আমেরিকা পরাজিত হয়েছে।’

আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ এখন তালেবানের হাতে। কাবুল থেকে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ সেনারা যখন কাবুল ছাড়েন, তার কাছাকাছি সময়ে আফগান অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন দেশটির সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান মেরিন জেনারেল ফ্রাঙ্ক ম্যাকেঞ্জি। তিনি বলেন, ‘আমরা চাইলেও সবাইকে সরিয়ে (আফগানিস্তান থেকে) আনতে পারিনি। তবে আমি মনে করি, যদি আরও ১০ দিন থাকতাম, তাহলেও আমরা সবাইকে আনতে পারতাম না।’

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বলেন, আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান সমাপ্ত এবং নতুন কূটনৈতিক মিশন চালুর মধ্য দিয়ে ‘একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো’। আফগানিস্তানে শতাধিক আমেরিকান রয়ে গেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁরা আসতে চাইলেও শেষ ফ্লাইটটি ধরতে পারেননি। তাঁদের বের করে আনার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাবে পররাষ্ট্র দপ্তর। লোকজনকে আফগানিস্তান ছাড়ার সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পালনে তালেবানকে বাধ্য করার অঙ্গীকার করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বছরের উপস্থিতি থেকে ‘শিক্ষা নেওয়ার এখনই সময়’।

তালেবান যাতে লোকজনকে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মেনে চলে, সে বিষয়ে এখন অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোমিনিক রাবও। গতকাল তিনি বিবিসিকে বলেন, যুক্তরাজ্যেরও কয়েক শ নাগরিক এখনো আফগানিস্তানে রয়েছেন। তৃতীয় কোনো দেশ হয়ে তাঁদের যুক্তরাজ্যে আনার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

আমেরিকার শতাধিক ও যুক্তরাজ্যের কয়েক শ নাগরিক রয়ে গেছেন। আফগানিস্তানকে সহায়তা দিতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান পাকিস্তানের।

তালেবান নিয়ে একই ধরনের কথা বলেছেন জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেইকো মাসও। পাকিস্তান সফররত মাস গতকাল বলেন, বেসামরিক লোকজনকে কাবুলে বিমানবন্দর দিয়ে দেশত্যাগের সুযোগ তালেবান দেবে কি না, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করবে জার্মানি। তিনি বলেন, ‘তালেবান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে আমরা বুঝতে পারব, তাদের ওপর ভরসা করা যায় কি না। তালেবান নতুন সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। এতেই বোঝা যাবে, তারা আমাদের অংশগ্রহণমূলক সরকার গঠনের অনুরোধ রাখছে কি না।’

আফগানিস্তান থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরেশি। গতকাল ইসলামাবাদে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই সম্পৃক্ত থাকতে হবে। দেশটির অর্থনীতি ভেঙে পড়া ঠেকাতে মানবিক সহায়তা চালিয়ে যেতে হবে। শূন্যতা, অস্থিরতা হলে তা কারও জন্য ভালো হবে না। এই অঞ্চলে শরণার্থীর ঢলও থামবে না।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক কার্যক্রম কাবুল থেকে কাতারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন। তাঁদের পথ অনুসরণ করছে জাপানও। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগি সাংবাদিকদের বলেছেন, তাঁদের দূতাবাস সাময়িকভাবে আফগানিস্তান থেকে তুরস্কে নেওয়া হয়েছে। এখন কাতারে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিদায়কে যেভাবে দেখছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম

নিউইয়র্ক টাইমস যুক্তরাষ্ট্রের এই বিদায়কে বর্ণনা করেছে ‘বিবর্ণ সমাপ্তি’ হিসেবে। ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, ‘আমেরিকার সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধ’ এখন শেষ। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সতর্ক করেছে যে পড়ে থাকা শতাধিক আমেরিকান এবং লাখো আফগান মিত্ররা এখন অনিশ্চয়তা ও বিপদের মুখে। ইউএসএ টুডে পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছে এভাবে, চলতি মাসে তালেবান দ্রুত আফগান সরকারকে হটানোর পর শুরু হওয়া ঝঞ্ঝামুখর মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের যে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তাতে লাগাম টানল এই বিদায়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ের পর প্রথম সকাল

আবার পূর্ণ তালেবানের নিয়ন্ত্রণে আফগানদের প্রথম সকাল হয় মঙ্গলবার। কাবুল থেকে আল–জাজিরার এক সাংবাদিক জানান, তালেবানের উদ্‌যাপনের রাতের পরের এই সকাল ছিল শান্ত। বিবিসির একজন সাংবাদিক জানান, ২০ বছর পর আফগানিস্তানে বিদেশি সেনাদের উপস্থিতির অবসান ঘটলেও এদিন আফগানদের জীবনে গত কয়েক দিনের চেয়ে তেমন কোনো তফাত দেখা যায়নি। এদিকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাবুলে বিদেশি দূতাবাসগুলোর কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের সামনে টাকা তোলার জন্য গ্রাহকদের ভিড় বাড়তে থাকে। বিদেশি সেনা চলে যাওয়া নিয়েও কাবুলের বাসিন্দাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একজন বাসিন্দা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি অবশ্যই বলব, আমরা মাতৃভূমিতে অন্য দেশের সেনা দেখতে চাই না। আমরা খুশি যে এখনো নিরাপত্তা আছে। কিন্তু আমাদের রুটি ও পানি দরকার।’ আরেকজনের কণ্ঠে ছিল ব্যাংক ও কর্মক্ষেত্র নিয়ে উদ্বেগ। দুই সপ্তাহ আগে তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই এই সংকট চলছে। তিনি বলেন, ‘ইসলামিক আমিরাত সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা যে ব্যাংক খোলা থাকবে। চাকরিজীবীরা (সরকারি) কাজে যোগ দেবেন। কারণ, অর্থই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’ ১৭ থেকে ১৮ দিন ধরে কাজ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, এভাবে চলাটা তাঁদের জন্য সহজ নয়।

ঐক্যের ডাক তালেবানের

আফগানদের প্রতি ঐক্যের ডাক দিয়েছেন তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ। জনগণ ঐক্যবদ্ধ না থাকলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সমর্থন করবে না মন্তব্য করে আফগানদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যকার বিভেদ ভুলে যান এবং ঐক্যবদ্ধ হোন।’ তালেবান মুখপাত্র বলেন, আসন্ন সরকার আফগানিস্তানের সব নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব করবে। দেশের অর্থনীতির নানা দিক তুলে ধরে আফগানিস্তানে বিনিয়োগের জন্য অন্যান্য দেশের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, তালেবান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে ‘ভালো সম্পর্ক’ চায় এবং বন্ধুত্বপূর্ণভাবে যেকোনো বিষয়ের মীমাংসা করতে আগ্রহী।

জাবিউল্লাহ মুজাহিদ এসব কথা বললেও নারী অধিকারসহ বেশ কিছু বিষয়ে তালেবানের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে তারা ঘোষণা দিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়াশোনা করতে পারবে না। দেশে সংগীতচর্চা নিষিদ্ধ করারও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আফগানিস্তানের সব জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি নিয়ে সরকার গঠন করা হবে বললেও সে বিষয়ক আলোচনার উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। উল্টো দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এবং শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া আবদুল্লাহ আবদুল্লাহর নিরাপত্তারক্ষী প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। পানশিরের প্রতিরোধযোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তালেবান বাহিনী।

যুদ্ধে প্রাণহানি

২০ বছরের এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সাড়ে তিন হাজারের বেশি সেনা নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ২ হাজার ৩০০–এর বেশি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ২০ হাজারের বেশি সেনা আহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পর বেশি ৪৫০ জন সেনা নিহত হয়েছেন যুক্তরাজ্যের। অন্যদিকে এই যুদ্ধে ৫০ হাজারের মতো বেসামরিক আফগান প্রাণ হারিয়েছেন। দেশটির পুলিশ ও সেনাসদস্য মিলিয়ে নিহত হয়েছেন ৭০ হাজারের বেশি।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন