আবে হত্যাকাণ্ডের পর কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, জাপানে গুলি করে ঘটনা শুধু বিরলই নয়, এটি সত্যিকার অর্থে সাংস্কৃতিকভাবে সাদৃশ্যপূর্ণও নয়।

অবশ্য এর আগে দুটি হামলার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনায় ছিল। প্রথমটি ঘটে ১৯৬০ সালের অক্টোবর মাসে টোকিওর কেন্দ্রস্থলের হিবিয়া এলাকার একটি নাগরিক মিলনায়তনে। ছুরি হাতে নিয়ে চরম দক্ষিণপন্থী এক তরুণ সেই সময়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল সমাজতন্ত্রী পার্টির নেতা ইনেজিরো আসানুমার ওপর মঞ্চে উঠে হামলা চালিয়ে তাঁকে খুন করেছিল। আসানুমাকে ছুরিকাঘাত করার সেই ছবি সারা বিশ্বে প্রচারিত হয়। হামলাকারীর চোখে আসানুমার অপরাধ ছিল, জাপান-মার্কিন সামরিক চুক্তির বিরোধিতা করা।

দ্বিতীয় ঘটনাটি এর ঠিক ৩০ বছর পর, ১৯৯০ সালে। সে সময় হামলাকারী ছিল একজন চরম দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী। হামলায় নাগাসাকির সেই সময়ের মেয়র গুলিবিদ্ধ হন। হামলাকারীর দৃষ্টিতে মেয়রের অপরাধ ছিল, জাপানের সম্রাটের যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকা নিয়ে করা তাঁর মন্তব্য।

এর বাইরে জাপানে রাজনৈতিক সহিংসতা সেভাবে ঘটতে দেখা যায়নি। ফলে রাজনীতিবিদেরাও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে খুব বেশি উদ্বেগে থাকতেন না। রাজনৈতিক সভা কিংবা নির্বাচনী প্রচারে তাঁদের সব সময় অংশ নিতে দেখা গেছে অনেকটা ঢিলেঢালাভাবে। এটা কেবল দলীয় নেতা কিংবা মাঠপর্যায়ে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের বেলাতেই প্রযোজ্য নয়, একই সঙ্গে সরকারপ্রধান এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের মতো সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যেও একই আচরণ আমার চোখে পড়েছে। টোকিওর বেশ কিছু নির্বাচনী প্রচারে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাধারণত রেলস্টেশনের সামনে জনতার সমাবেশে বক্তব্য দিতে দেখেছি। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বড় ধরনের উপস্থিতি চোখে পড়েনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুনিচিরো কোইজুমি এক নির্বাচনী প্রচারে বক্তব্য শেষ করার পর তাঁকে জনতার সঙ্গে হাত মেলাতেও দেখেছি। নেতারা সাধারণত পার্ক করা খোলা ভ্যানের পেছনে দাঁড়িয়ে কিংবা স্টেশনের সামনে উপস্থিত হয়ে ভাষণ দেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে যে শহরে আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন, সেই নারা শহর হচ্ছে সত্যিকার অর্থে এক শান্তিপূর্ণ শহর। জাপানের এই প্রাচীন রাজধানীতে আছে শিন্তো ও বৌদ্ধধর্মের বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক মন্দির, যার মধ্যে কয়েকটি বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া শহরের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এর পার্কগুলো জুড়ে হরিণের অবাধ বিচরণ, যেসব হরিণ মাঝেমধ্যে খাদ্যের দাবিতে পর্যটকদের ওপর চড়াও হয়। তবে সেই দৃশ্যও হচ্ছে নিরপরাধ এবং উপভোগ্য। শান্তির সেই শহরে এত বড় অশান্তির ঘটনা ঘটে যাওয়ায় জাপানের অনেকেই এখন বিস্মিত।

ধারণা করা যায়, নিরাপত্তা নিয়ে রাজনীতিকদের খুব বেশি ভাবনাচিন্তা না করার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে আবের হত্যার ঘটনা। উচ্চপর্যায়ের রাজনীতিবিদেরা এখন নিরাপত্তা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত না হওয়ার মনোভাব থেকে সম্ভবত সরে আসবেন। ফলে সাধারণ জনগণের সঙ্গে কিছুটা হলেও এদের দূরত্ব বাড়তে পারে।

শিনজো আবের আমন্ত্রণে বসন্তের শুরুতে চেরি ফুলের শোভা উপভোগের পার্টিতে একাধিকবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার। হাজার চারেক মানুষের সেসব সমাবেশে নিরাপত্তার কঠোরতা একেবারেই চোখে পড়েনি। প্রধানমন্ত্রী সেখানে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এসে সস্ত্রীক জনতার মধ্য দিয়ে হেঁটে যান এবং মানুষের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন। এখন মনে হচ্ছে, সেই সংস্কৃতিও জাপানকে এখন হয়তো বিদায় জানাতে হতে পারে।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন