আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রচলিত একটি নিয়ম হলো কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশ একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে, সেই দেশও পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ না করে বসে থাকে না। তাই এ ক্ষেত্রে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কই কেবল নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকে এরা একে অন্যের ওপর কতটা নির্ভরশীল, সেই হিসাবও আগে থেকে করে নেওয়া দরকার। জাপানের বেলায় সে রকম হিসাব করা হয়েছে বলে মনে হয় না। ফলে পাল্টা আঘাত আসতে থাকা অবস্থায় বেশ কিছু সমস্যার মুখে এখন জাপান।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে জাপানের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার আওতায় শুরুতে প্রায় সব রকম পণ্য এবং বাণিজ্যিক লেনদেন অন্তর্ভুক্ত থাকলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যে জাপানকে বেশ কয়েকটি খাতে কিছুটা হলেও ছাড় দিতে হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঠিক পরপর জাপানের নীতিনির্ধারকেরা অনুধাবন করতে সক্ষম হন যে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানি নিষিদ্ধ হলে জাপানকেই সম্ভবত ভুগতে হবে বেশি। ফলে তেল, গ্যাস ও কয়লার আমদানি অন্তত কিছু সময়ের জন্য নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখার ঘোষণা প্রদানে জাপান বিলম্ব করেনি। একইভাবে রাশিয়ার সঙ্গে মাছ ধরার একটি চুক্তি নিয়েও অনুরূপ অবস্থান জাপান গ্রহণ করে। রাশিয়ায় জাপানের বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত দ্বিতীয় সাখালিন-২ প্রাকৃতিক গ্যাস প্রকল্প হচ্ছে এই ক্ষেত্রে সর্বশেষ সংযোজন।

সাখালিন হচ্ছে তেল ও গ্যাসের মতো প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ রাশিয়ার একটি দ্বীপ। জাপান থেকে সাখালিনের অবস্থানগত দূরত্বও খুব বেশি দূরে নয়। ফলে সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা করার মধ্যে দিয়ে নিজেদের জ্বালানির ঘাটতি যে অনেকটা লাঘব করা সম্ভব, সেই হিসাব জাপানের নীতি–নির্ধারকেরা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় থেকেই করেছিলেন এবং সেই অনুধাবন থেকে সাখালিনের প্রাকৃতিক গ্যাস উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে জাপানের এগিয়ে যাওয়া।

তবে সাখালিনের প্রাকৃতিক সম্পদের দিকে নজর যে জাপানের কেবল একারই ছিল তা নয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার ঠিক পরপর যে দুর্বৃত্ত প্রশাসন রাশিয়ায় ক্ষমতাসীন হয়েছিল, এদেরকে সহজেই বাগে নিয়ে এসে পশ্চিমের বৃহৎ পুঁজি উদার শর্তে সাইবেরিয়ার পাশাপাশি সাখালিনেও বিনিয়োগে জড়িত হয়। ব্রিটিশ মালিকানাধীন শেল অয়েল কোম্পানি হচ্ছে সে রকম একটি প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৪ সালে শতভাগ মালিকানায় প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়ার তৎকালীন সরকারের সঙ্গে উৎপাদনভিত্তিক অংশীদারত্বের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। সেই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সাখালিনে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সবটাই শেলের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। ভ্লাদিমির পুতিন ২০০০ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে লাগামহীন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের রাশ টেনে ধরতে শুরু করেন। এর অংশ হিসেবে ২০০৬ সালে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ ও পাইপলাইন পরিচালনা করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নতুন একটি আইনের আওতায় পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলার যুক্তি দেখিয়ে সাখালিন গ্যাস প্রকল্প বন্ধ করার হুমকি দিতে শুরু করলে নতুন এক ব্যবস্থাপনা শেলকে শেষ পর্যন্ত মেনে নিতে হয়েছিল। তখন থেকে সাখালিন-২ নামে নতুন প্রকল্পের পুরো অংশের ২৭ দশমিক ৫ শতাংশের মালিকানা শেলের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং জাপানও তখন থেকে সেই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়। জাপানের দুটি কোম্পানি মিৎসুবিশি ও মিৎসুই যৌথভাবে ২২ দশমিক ৫ শতাংশের মালিকানা গ্রহণ করে এবং অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ থেকে যায় রাশিয়ার হাতে। জাপানের আমদানি করা মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৯ শতাংশ আসে জাপান থেকে। যার সিংহভাগ আসছে সাখালিন-২ প্রকল্প থেকে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার ঠিক পরপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য মস্কোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে শুরু করলে শেল অয়েল কোম্পানি সাখালিন-২ প্রকল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। ফলে শেলের মালিকানা রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান গাজপ্রমের হাতে চলে যায়। সে সময় সাখালিন-২ প্রকল্পের জন্য নতুন একটি ব্যবস্থাপনা তৈরির প্রয়োজনীয়তা বোধ করে রাশিয়া। শেল অয়েল সরে যাওয়ার পরপর জাপানও এই প্রকল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে জাপান সরকার পরে নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কথা বললেও রাশিয়া এখন নতুন ব্যবস্থাপনায় মালিকানার দিকগুলোও পুনর্বিবেচনার কথা ভাবছে।

গত জুন মাসের শেষ দিকে পুতিন প্রশাসন সাখালিন-২ গ্যাস প্রকল্পের সম্পদের মালিকানা নতুন একটি কোম্পানির গ্রহণ করা নিয়ে একটি নির্দেশনা জারি করলে জাপান সরকার এর কড়া প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করে। নতুন এই ব্যবস্থাপনার আওতায় সাখালিন থেকে জাপানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে দেশটি। রাশিয়ার বিকল্প উৎস খুঁজে পাওয়ায় দেখা দেওয়া জটিলতা জাপানকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাপানে অসময়ের তাপপ্রবাহ চলতে থাকায় দেশটিতে বিদ্যুতের চাহিদা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। তাপবিদ্যুতের ওপর জাপান এখনো মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ায় গ্যাসের সরবরাহে দেখা দেওয়া ঘটতি থেকে বিদ্যুৎ–সংকট তৈরি হতে পারে বলে জাপান সরকার ইতিমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে। অন্যদিকে সরকার বলছে সাখালিন-২ প্রকল্প নিয়ে রাশিয়ার একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প উৎস খুঁজে পাওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ আপাতত জাপানের সামনে দৃশ্যত খোলা নেই। বিকল্প একটি পথ হিসেবে ২০১১ সালের ফুকুশিমা পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর থেকে বন্ধ হয়ে যাওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আবারও সক্রিয় করে তোলার কথা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়া বলছে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সাখালিন-২ প্রকল্প নিয়ে নতুন ব্যবস্থাপনা সরকারকে ঠিক করে নিতে হলেও জাপানে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ রাশিয়া বন্ধ করে দিচ্ছে না। তবে পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে আরও কঠোর পদক্ষেপ যে রাশিয়া গ্রহণ করবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন