দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাক জিন ইতিমধ্যে দুই দিনের জাপান সফর শেষ করে দেশে ফিরে গেছেন। ১৯ জুলাই তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের মৃত্যুতে তাঁর দেশের সরকারের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করেন।

এক দিন আগে পাক জিন জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োশিমাসা হায়াশির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁরা আলোচনা করেন।

কিশিদার সঙ্গে পাক জিনের সাক্ষাৎকার ছিল অনেকটাই আনুষ্ঠানিক। তবে হায়াশির সঙ্গে পাক জিনের বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কের বাধা দূর করে তার উন্নতির উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। এর ফলে এই দিকেই জাপানের সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত ছিল।

দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আনুষ্ঠানিক আলোচনা ২০১৮ সালের জুলাই থেকে কার্যত বন্ধ ছিল। তাই পাক জিনের এই জাপান সফরকে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সূচনা হিসেবে গণ্য করা হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্টের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে জাপান সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন হায়াশি। কিন্তু তখন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার কোনো উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে হায়াশির আনুষ্ঠানিক বৈঠকের সুযোগ হয়নি। পাক জিনের জাপান সফরে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়।

যে বিষয়গুলো নিয়ে জাপানের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক গত কয়েক বছরে তিক্ত হয়ে ওঠে, তার মধ্যে অন্যতম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ‘কমফোর্ট ওমেন’ ইস্যু। এ ছাড়া জাপানের কয়েকটি কোম্পানির ক্ষতিপূরণ পরিশোধ, অনাদায়ে তাদের সম্পদ জব্দের বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার আদালতের রায়ের দিকটিও আছে। তাকেশিমা ও দকদো দ্বীপের মালিকানা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। এই বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি।
কমফোর্ট ওমেন ইস্যুতে দুই দেশ ২০১৫ সালে চুক্তি সই করেছিল। পরে দক্ষিণ কোরিয়ার মুন জে-ইনের প্রশাসনের কাছে এই চুক্তি দেশের ‘স্বার্থবিরোধী’ বলে মনে হয়। তাই তারা চুক্তি থেকে সরে যায়।

দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের এই সিদ্ধান্ত জাপানকে ক্ষুব্ধ করে। এর ফলে জাপান এখন চাইছে, দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন প্রশাসন যেন দ্রুত সেই চুক্তিতে ফিরে আসার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।

দক্ষিণ কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিষয়টি খুবই সংবেদনশীল। এর ফলে দেশটির নতুন সরকারের পক্ষে এ বিষয়ে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব নয়।
কিশিদার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে পাক জিন ২০১৫ সালের চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকায় বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন। এর বাইরে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচন তেমন হয়নি।

তবে একটি বিষয় নিয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনেকটা সময় ধরে আলোচনা করছেন। সেটা হলো জাপানের কয়েকটি কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতে দক্ষিণ কোরিয়ার আদালতের দেওয়া নির্দেশ।

২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায় দেন। এ রায়ে কোরীয় উপদ্বীপ জাপানের উপনিবেশ থাকাকালে কোরীয়দের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁদের বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োগ করার জন্য ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ প্রদানে কয়েকটি জাপানি কোম্পানিকে নির্দেশ দেন আদালত। আদেশ অমান্য করা হলে দক্ষিণ কোরিয়ায় এ কোম্পানিগুলোর সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়া শুরু করতে আদালত নির্দেশ দেন।

জাপান সরকার এ রায়কে জাপানের প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার বৈরী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখে। কেননা জাপান মনে করে, ১৯৬৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়াকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদানের সময় ক্ষতিপূরণের সব রকম বিষয়ের নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। এর ফলে আদালতের রায়কে জাপান অবৈধ বলে আসছে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে জাপান।

কমফোর্ট ওমেন সমস্যার মতোই এটি দক্ষিণ কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আলোচিত একটি বিষয়। এর ফলে টোকিওর দাবি অনুযায়ী এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ সিউলের পক্ষে যে সম্ভব নয়, তার ইঙ্গিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে জাপানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিয়েছেন পাক জিন।

এ বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ কিছু সূত্রের বরাত দিয়ে জাপানের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সমস্যার সমাধান খুঁজে পেতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে বিশেষ একটি কমিশন গঠনে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারের পদক্ষেপের ব্যাখ্যা হায়াশিকে দিয়েছেন পাক জিন।

তবে সূত্রগুলো একই সঙ্গে বলেছে, অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বিবেচনায় সমস্যার চটজলদি সমাধান খুঁজে পাওয়া দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য কঠিন হবে। দক্ষিণ কোরিয়ায় নতুন সরকার আসার পর থেকে জ্বালানির মূল্য বাড়ছে। খাদ্যশস্যের আমদানিতে জটিলতা দেখা দিয়েছে। এর ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। এতে নতুন সরকারের প্রতি জনসমর্থন কমছে। এ অবস্থায় জনপ্রিয় নয়, এমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চাইছে না দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন সরকার। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

এর ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম জাপান সফর সম্পর্কে এই মূল্যায়ন করা যায় যে তা টোকিওর জন্য কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নিয়ে আসতে পারেনি।

তবে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জাপান সফরের একটা ইতিবাচক দিক রয়েছে। তা হলো এই সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অস্বাভাবিক অবস্থা কাটার একটা আভাস দিয়েছে। এই সফরের ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে দুই দেশ হয়তো তাদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে। তবে তা অনেকটাই নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপর।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন