থাইল্যান্ডে কেন গণভোট হচ্ছে

থাইল্যান্ডের বুরিরাম প্রদেশের একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিচ্ছেন একজন বয়স্ক নারী। তিনি ব্যালট বাক্সে হলুদ রঙের ব্যালট পেপার ফেলছেন। হলুদ রঙের ব্যালট সংবিধান প্রশ্নে গণভোটের জন্য। ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ছবি: রয়টার্স

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ড জান্তা সরকার প্রণীত বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী চলবে, নাকি নতুন সংবিধান রচিত হবে, সে প্রশ্নে আজ রোববার গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভোটাররা গণভোটে নিজেদের মতামত জানানোর পাশাপাশি এদিন সাধারণ নির্বাচনেও ভোট দিচ্ছেন।

বাংলাদেশেও চার দিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি অনেকটা একইভাবে জাতীয় নির্বাচনে ভোট গ্রহণ এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

২০১৪ সালে শেষবার সেনা অভ্যুত্থানের পর থাইল্যান্ডে পাঁচ বছর জান্তা শাসন চলে। বর্তমান সংবিধান সে সময়ে রচিত। এই সংবিধানে এমন সব প্রতিষ্ঠানকে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা দেওয়া হয়, যেগুলো পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেট দ্বারা মনোনীত।

২০১৯ সালে জান্তা সরকার বিদায় নেওয়ার দেশটিতে আর কোনো সরকার নিজেদের মেয়াদ পূরণ করতে পারেনি। ২০২৩ সালে সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।তারপর গত দুই বছরে দেশটি তিনজন প্রধানমন্ত্রী দেখেছে।

বহুদিন ধরেই থাইল্যান্ডের বর্তমান সংবিধান নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। দেশটিতে সর্বশেষ সেনা অভ্যুত্থানের পর ২০১৭ সালে এই সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। জান্তা সরকার রচিত সংবিধানটি গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়েছে বলে দাবি সমালোচকদের।

সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল গত ডিসেম্বরে বর্তমান পার্লামেন্ট ভেঙে দেন এবং আগাম নির্বাচন ঘোষণা করেন। ৮ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের ভোটের তারিখ ঘোষণা করা হয়। একই দিন সংবিধান প্রশ্নে গণভোটের আয়োজনও করা হয়। বলা হয়, একই দিনে গণভোট আয়োজনের উদ্দেশ্য হলো খরচ কমানো এবং ভোটারদের জন্য ভোটদান আরও সহজ করা।

আজ ৮ ফেব্রুয়ারি ভোটাররা তিনটি করে ব্যালট পেপারে ভোট দিচ্ছেন। এর মধ্যে সবুজ রঙের ব্যালটে ভোটাররা নিজ আসনের পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচনের জন্য ভোট দিচ্ছেন, গোলাপি রঙের ব্যালটে ‘পার্টি লিস্ট’ প্রতিনিধি বাছাইয়ে ভোট দিচ্ছেন এবং হলুদ রঙের ব্যালট পেপারে সংবিধান প্রশ্নে গণভোট দিচ্ছেন।

আরও পড়ুন

নতুন সংবিধান কেন

বহুদিন ধরেই থাইল্যান্ডের বর্তমান সংবিধান নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। দেশটিতে সর্বশেষ সেনা অভ্যুত্থানের পর ২০১৭ সালে এই সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। জান্তা সরকার রচিত সংবিধানটি গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়েছে বলে দাবি সমালোচকদের।

যদি ‘না’ বিজয়ী হয়, তাহলে পার্লামেন্ট নতুন সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়া ততক্ষণ পর্যন্ত শুরু করতে পারবে না, যতক্ষণ না পরবর্তী গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং ভোটে অনুমোদন পাওয়া যায়।

সমালোচকেরা বলেন, এই সংবিধানে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে দুর্বল করা হয়েছে এবং সরকারের বিভিন্ন শাখার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে। তা ছাড়া এটি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত পার্লামেন্ট দ্বারা রচিত নয়। সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণও সীমিত ছিল।

সংবিধানে থাইল্যান্ডের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটকে অত্যধিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে বলেও অভিযোগ সমালোচকদের। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হতে সিনেটের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে ভোটারদের লাইন। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

বর্তমান সংবিধান নিয়ে সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু এই সিনেট। সংবিধান অনুযায়ী, সিনেটের সদস্যরা এমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত হন, যেখানে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত।

সিনেটের হাতে সাংবিধানিক আদালতের বিচারক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে, এমন অন্যান্য স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্য মনোনীত করার ক্ষমতা দেওয়া আছে। এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রায়ই রাজনৈতিক বিরোধিতা দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হতে দেখা যায়, বিশেষ করে রাজনৈতিক দল ভেঙে দেওয়া বা ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অযোগ্য ঘোষণার মাধ্যমে।

গণভোট কেন, প্রক্রিয়া কী

বর্তমান সংবিধানের অধীন পার্লামেন্টের নতুন সংবিধান প্রণয়ের ক্ষমতা রয়েছে, তবে এর আগে নাগরিকদের অনুমোদন প্রয়োজন। গণভোটের মাধ্যমে নাগরিকেরা নির্ধারণ করবেন, নতুন সংবিধান গ্রহণ করা উচিত হবে কি না।

গণভোটে একটি প্রশ্নই করা হচ্ছে, সেটি হলো, ‘আপনি কি নতুন সংবিধান প্রণয়নের অনুমোদন দেন?’ ভোটাররা তিনটি বিকল্প উত্তরের মধ্যে একটি বেছে নিতে পারবেন। উত্তরগুলো হলো ‘হ্যাঁ’, ‘না’ বা ‘মতামত নেই’।

যদি ভোটে বেশির ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন, তবে পার্লামেন্টকে নতুন সংবিধান প্রণয়েনের প্রক্রিয়া শুরু করার অনুমতি দেওয়া হবে। যদি ‘না’ বিজয়ী হয়, তাহলে পার্লামেন্ট নতুন সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়া ততক্ষণ পর্যন্ত শুরু করতে পারবে না, যতক্ষণ না পরবর্তী গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং ভোটে অনুমোদন পাওয়া যায়।

থাইল্যান্ডের পার্লামেন্ট এখনো সংবিধানের কিছু কিছু ধারা সংশোধন করার ক্ষমতা রাখে, তবে কিছু বিশেষভাবে সংবিধান দ্বারা সংরক্ষিত ধারা রয়েছে, সেগুলো ওই ক্ষমতা বলে সংশোধন বা পরিবর্তন সম্ভব না। যেমন সংবিধানের ধারা ১ ও ২। এ দুটি ধারা রাষ্ট্র ও রাজতন্ত্র–সম্পর্কিত।

সমালোচকেরা মনে করেন, বর্তমান ব্যবস্থায় কার্যকরভাবে সংবিধান সংশোধন করা কঠিন।

ডাকযোগে গণভোট নয়

ব্যাংকক পোস্টের খবর অনুযায়ী, থাইল্যান্ডের নির্বাচন কমিশন ডাকযোগে গণভোট প্রদানের অনুমোদন দেয়নি। এর কারণ হিসেবে তারা কয়েকটি সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছে।

কমিশনের মতে, ডাকযোগে ভোট সরাসরি ও গোপন ভোটের শর্ত পূরণ না–ও করতে পারে। কারণ, ভোটারদের ওপর অন্য কেউ প্রভাব বা চাপ প্রয়োগ করতে পারে বা কেউ অন্যের হয়ে ভোট দিতে পারে।

ভোটারদের কাছে সঠিক সময়ে ব্যালট পেপার পৌঁছানো এবং ভোটের পর তা সময়মতো যথাযথ ঠিকানায় পৌঁছানো নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া ভোটারের পরিচয় যাচাই করা জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হবে, কারণ, ভোটারদের ব্যালটের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি জমা দিতে হবে।

সংবিধান সংশোধনের পক্ষে কারা

থাইল্যান্ডের একটি জরিপ সংস্থা কেপিআইয়ের একটি জরিপ অনুযায়ী, দেশটির ৫৩ শতাংশ মানুষ নতুন সংবিধান প্রণয়নের পক্ষে। সবচেয়ে বেশি সমর্থন এসেছে জেন-জি নামে পরিচিত তরুণ জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে, যা প্রায় ৫৯ শতাংশ।

পিপলস পার্টি (মুভ ফরওয়ার্ড পার্টি) এবং ফিউ থাই পার্টির মতো থাইল্যান্ডের বেশির ভাগ প্রধান রাজনৈতিক দল সংবিধান সংশোধনের পক্ষে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দল ভুমজাইথাই পার্টিও এই উদ্যোগকে সমর্থন করছে, তবে তারা জোর দিয়ে এও বলেছে, এমন কোনো সংশোধন করা যাবে না, যা রাজতন্ত্র–সম্পর্কিত কোনো ধারাকে প্রভাবিত করতে পারে। ডেমোক্র্যাট পার্টিও একই অবস্থান নিয়েছে।

ইউনাইটেড থাই নেশন পার্টির মতো অতি রক্ষণশীল দলগুলো সংবিধান সংশোধনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিচ্ছেন ভোটাররা। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলেই নতুন সংবিধান রচনা করা যাবে, বিষয়টি এমন নয়। বরং এই গণভোট কেবল দীর্ঘ সংবিধান সংশোধন বা প্রণয়ন প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ।

২০২৫ সালের সংবিধানিক আদালতের এক রায় অনুযায়ী, সম্পূর্ণ নতুন করে সংবিধান রচনা করতে হলে তিনটি গণভোট প্রয়োজন হবে। প্রথম গণভোটে ভোটারদের জিজ্ঞাসা করা হবে, নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা উচিত কি না। দ্বিতীয় গণভোটে ভোটাররা নতুন খসড়া সংবিধানের প্রণয়ন পদ্ধতি ও মূল বিষয়বস্তু অনুমোদন করবেন কি না, তা নির্ধারণ করবেন। তৃতীয় গণভোটে ভোটাররা নতুন সংবিধানকে অনুমোদন করবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত নেবেন।

বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন, এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। এর আগে থাইল্যান্ডে সংবিধান নিয়ে দুবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথমবার ২০০৭ সালের ১৯ আগস্ট। সেবার প্রায় ৫৮ শতাংশ ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছিল।

২০১৬ সালের ৭ আগস্ট দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সেবার ৬১ শতাংশের বেশি ভোটার নতুন সংবিধান প্রণয়নের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। তারপরই বর্তমান সংবিধান রচিত হয়। এ সংবিধানে জনগণের মতামত ও গণতন্ত্রের সুরক্ষা নিয়ে তখন থেকেই বিতর্ক হচ্ছিল।

তথ্যসূত্র: ব্যাংকক পোস্ট, থাইল্যান্ডের পাবলিক রিলেশন ডিপার্টমেন্ট (পিআরডি)