পশ্চিমা বিশ্বকেও যে জায়গায় পেছনে ফেলে দিয়েছে শ্রীলঙ্কা

বিশ্বের প্রথম নারী রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার শ্রীমাভো বন্দরনায়েক। ওই সময় পশ্চিমা বিশ্বের কোনো দেশেও নারী রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না। ১৯৬০ সালের এই দিন তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁকে নিয়ে আজকের আয়োজন।

বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকেছবি: শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে ফাউন্ডেশন থেকে স্ক্রিটশট

সেপ্টেম্বর ১৯৫৯। শ্রীলঙ্কার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সলোমন বন্দরনায়েকে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর গুলিতে নিহত হন। সেই শোকের সময় তাঁর স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির (এসএলএফপি) নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। প্রতিপক্ষ তাঁকে ব্যঙ্গ করে ডাকত ‘ক্রন্দসী বিধবা’। কিন্তু মাত্র এক বছরের মাথায় সেই ‘বিধবাই’ বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

শ্রীমাভো রাতওয়াত্তে দিয়াস বন্দরনায়েকে ১৯৬০ সালের ২১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। শুধু শ্রীলঙ্কাই নয়, বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসেও এটি ছিল এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। তখনো যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স কিংবা জার্মানির মতো পশ্চিমা গণতন্ত্রে কোনো নারী সরকারপ্রধান নির্বাচিত হননি। অথচ সদ্য স্বাধীন একটি ছোট এশীয় রাষ্ট্রই প্রথম দেখিয়ে দিল, একজন নারীও রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ দায়িত্ব নিতে পারেন।

গত শতকের ষাটের দশকের শুরুতে শ্রীলঙ্কার মতো একটি দেশে একজন নারীর প্রধানমন্ত্রী হওয়া ছিল এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে তাই শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি বিশ্বজুড়ে নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন।

যেভাবে রাজনীতিতে

শ্রীলঙ্কার রাতনাপুরায় এক সিংহলি কান্দ্যান পরিবারে ১৯১৬ সালের ১৭ এপ্রিল শ্রীমাভোর জন্ম। তাঁর বাবা বার্নেস রাতওয়াত্তে ছিলেন সিনেটর ও স্টেট কাউন্সিলের সদস্য। সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে পরিবারটি ছিল প্রভাবশালী।

কলম্বোর সেন্ট ব্রিজেট কনভেন্টে পড়াশোনা শেষে শ্রীমাভো সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। বিশেষ করে নারী ও শিশুকল্যাণমূলক বিভিন্ন উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সে সময় সরাসরি রাজনীতিতে না এলেও জনসেবামূলক কাজের মাধ্যমে পরিচিতি পান।

১৯৪০ সালে সলোমন ওয়েস্ট রিজওয়ে দিয়াস বন্দরনায়েকের সঙ্গে শ্রীমাভো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরে সলোমন বন্দরনায়েকে শ্রীলঙ্কার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনীতিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৫১ সালে তিনি শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি (এসএলএফপি) প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৫৬ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের পুরো সময় শ্রীমাভো নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশের বৃহত্তম নারী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন লঙ্কা মহিলা সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক সভা, দলীয় কর্মসূচি ও সামাজিক কার্যক্রমে নিয়মিত অংশ নিতেন। পরে তিনি বলেছিলেন, ‘গৃহিণী হিসেবে বিশ বছর ধরে আমি রাজনীতির শিক্ষা নিয়েছি।’

১৯৫৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর গুলিতে প্রধানমন্ত্রী সলোমন বন্দরনায়েকে নিহত হলে এসএলএফপি নেতৃত্বসংকটে পড়ে। দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা শ্রীমাভোকে নেতৃত্ব গ্রহণের আহ্বান জানান।

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

প্রথম মেয়াদ: ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানো

১৯৬০ সালের জুলাইয়ের সাধারণ নির্বাচনে শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টিকে জয়ী করে শ্রীমাভো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি বিশ্বের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।

দায়িত্ব নেওয়ার পর শ্রীমাভো স্বামীর সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করেন। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও সেবা খাত আনার উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা এবং সিংহলি ভাষাকে রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার নীতি এগিয়ে নেন।

তবে ভাষানীতি শ্রীমাভো সরকারের অন্যতম বিতর্কিত সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। তামিল সংখ্যালঘুদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শ্রীমাভোকে শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতাই নয়, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতারও মোকাবিলা করতে হয়। অনেক বিদেশি সংবাদমাধ্যম প্রথমে তাঁকে ‘গৃহিণী থেকে প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী নেতা হিসেবে পরিচিতি পান।

জোটনিরপেক্ষ নীতির মূল ভিত্তি হলো একটি বিশ্বাস। তা হলো বিভিন্ন স্বাধীন দেশ, তারা আকারে ছোট হোক বা সামরিক শক্তিতে দুর্বল হোক, আজকের বিশ্বে তারা চাইলে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। জোটনিরপেক্ষতা মানে আন্তর্জাতিক বিষয় থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা নয়।
শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে, শ্রীলঙ্কার সিনেটে জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে

অর্থনৈতিক নীতিতেও শ্রীমাভো সাহসী পদক্ষেপ নেন। ব্রিটিশ ও মার্কিন মালিকানাধীন তেল কোম্পানিগুলো জাতীয়করণ করেন। এর জেরে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার প্রতি অর্থনৈতিক সহায়তা সীমিত করে। আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও তিনি জাতীয়করণের নীতি থেকে সরে আসেননি।

বৈদেশিক নীতিতে শ্রীমাভো শীতল যুদ্ধের দুই পরাশক্তির কোনো শিবিরে না গিয়ে জোটনিরপেক্ষ অবস্থানকে সমর্থন করেন। শ্রীলঙ্কা জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিল। তাঁর নেতৃত্বে দেশটি আন্দোলনের সক্রিয় কণ্ঠে পরিণত হয়। ভারত মহাসাগরকে ‘শান্তি অঞ্চল’ ঘোষণার প্রস্তাবও তিনি জাতিসংঘে উত্থাপন করেন।

তবে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, খাদ্যঘাটতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের রেশনিংয়ের কারণে সরকারের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৫ সালের নির্বাচনে তাঁর দল পরাজিত হয়। এর মধ্য দিয়ে তাঁর প্রথম মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে।

কলম্বো সফরে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। ১৫ অক্টোবর ১৯৬২ সাল
ছবি: নেহরু আর্কাইভ থেকে

দ্বিতীয় মেয়াদ: প্রজাতন্ত্রের জন্ম ও ক্ষমতার শীর্ষে

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে আবারও ক্ষমতায় ফেরে শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি। বামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে গঠিত ইউনাইটেড ফ্রন্ট জোটের নেতৃত্বে শ্রীমাভো দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। এটিই ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী সময়।

ক্ষমতায় ফিরে শ্রীমাভো রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও বৃদ্ধি করেন। ব্রিটিশ মালিকানাধীন চা-বাগান, রাবারবাগান ও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হয়। ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে ব্যক্তিমালিকানায় জমির সীমা নির্ধারণ করে অতিরিক্ত জমি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ওষুধ আমদানি ও বিতরণেও জাতীয় নীতি গ্রহণ করা হয়।

তবে দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই তাঁর সরকার বড় সংকটে পড়ে। ১৯৭১ সালে বামপন্থী যুব সংগঠন জনতা বিমুক্তি পরিষদ (জেভিপি) সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি স্থাপনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভারতসহ কয়েকটি দেশের সহায়তা নেয় শ্রীলঙ্কা সরকার। কয়েক সপ্তাহের অভিযানে বিদ্রোহ দমন করা হয়। এটি স্বাধীন শ্রীলঙ্কার প্রথম বড় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা–সংকট হিসেবে বিবেচিত।

শ্রীমাভোর দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে ১৯৭২ সালে। নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সঙ্গে অবশিষ্ট সাংবিধানিক সম্পর্ক ছিন্ন করে দেশটিকে পূর্ণাঙ্গ প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর করা হয়। একই সঙ্গে ‘সিলন’ নাম পরিবর্তন করে আনুষ্ঠানিকভাবে রাখা হয় ‘শ্রীলঙ্কা’।

যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশে এখন পর্যন্ত নারী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী হননি। তাই গত শতকের ষাটের দশকের শুরুতে শ্রীলঙ্কার মতো একটি দেশে একজন নারীর প্রধানমন্ত্রী হওয়া ছিল কিছুটা ‘বিস্ময়কর’ ঘটনা।

তবে এই সংবিধান নতুন বিতর্কেরও জন্ম দেয়। এতে বৌদ্ধধর্মকে বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া হয় এবং সিংহলি ভাষার প্রাধান্য আরও সুসংহত করা হয়। তামিল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ মনে করেছিল, নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থায় তাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার আরও সীমিত হয়ে পড়েছে। পরবর্তী কয়েক দশকে দেশটি জাতিগত সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়। অনেক গবেষক এর পেছনে সে সময়ের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোকেও দায়ী করেছেন।

শ্রীলঙ্কাবিষয়ক গবেষক নীল ডিভোটা তাঁর ‘ব্লোব্যাক: লিঙ্গুইস্টিক ন্যাশনালিজম, ইনস্টিটিউশনাল ডিকে অ্যান্ড এথনিক কনফ্লিক্ট ইন শ্রীলঙ্কা’ বইয়ে যুক্তি দিয়েছেন, ভাষাভিত্তিক সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয়তাবাদ ও ১৯৭২ সালের সংবিধানের মতো নীতিগত পদক্ষেপ তামিলদের ক্রমে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে এবং সংঘাতের ভিত্তি শক্তিশালী করে।

শ্রীলঙ্কার প্রবীণ ইতিহাসবিদ কে এম ডি সিলভা তাঁর ‘আ হিস্ট্রি অব শ্রীলঙ্কা’ বইয়ে লিখেছেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান শ্রীলঙ্কার জাতিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘সাম্প্রদায়িক বৈরিতার নতুন পর্যায়ের সূচনা’ করেছিল, বিশেষ করে সিংহলি ও তামিল জনগোষ্ঠীর সম্পর্কে।

জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের যাত্রা

দেশের অভ্যন্তরে নানা সংকট থাকলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শ্রীমাভোর মর্যাদা বাড়তে থাকে। শীতল যুদ্ধের সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ নেননি। বরং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বাধীন কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠার পক্ষে কাজ করেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, যুগোস্লাভিয়ার জোশেফ ব্রজ টিটো, মিসরের জামাল আবদেল নাসেরসহ জোটনিরপেক্ষ নেতাদের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। ভারত মহাসাগরকে ‘শান্তি অঞ্চল’ ঘোষণার দাবিও আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরেন।

শ্রীলঙ্কার সিনেটে জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ১৯৬৪ সালের ২৩ জানুয়ারি দেওয়া এক ভাষণে শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে বলেছিলেন, ‘জোটনিরপেক্ষ নীতির মূল ভিত্তি হলো একটি বিশ্বাস। তা হলো বিভিন্ন স্বাধীন দেশ—তারা আকারে ছোট হোক বা সামরিক শক্তিতে দুর্বল হোক—আজকের বিশ্বে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। জোটনিরপেক্ষতা মানে আন্তর্জাতিক বিষয় থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা নয়। নিরপেক্ষতাবাদ বলতে প্রচলিত ধারণায় হয়তো এমনটি ভাবা হতো। কিন্তু জোটনিরপেক্ষতা ও বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এ বিষয়ে সম্মানিত সিনেট সদস্যরা নিশ্চয়ই একমত হবেন।’

১৯৭৬ সালে কলম্বোতে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের পঞ্চম শীর্ষ সম্মেলনে শ্রীমাভো চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সে সময় পর্যন্ত এটি ছিল শ্রীলঙ্কার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলন। এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার অসংখ্য নেতা এতে অংশ নেন। এই সম্মেলনের মাধ্যমে উন্নয়নশীল বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে তাঁর অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়।

ভাষাভিত্তিক সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয়তাবাদ ও ১৯৭২ সালের সংবিধানের মতো নীতিগত পদক্ষেপ তামিলদের ক্রমে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে এবং সংঘাতের ভিত্তি শক্তিশালী করেছিল।
নীল ডিভোটা, শ্রীলঙ্কাবিষয়ক গবেষক

জনপ্রিয়তায় ধস

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য এলেও দেশের অর্থনীতি ক্রমে দুর্বল হতে থাকে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, খাদ্যঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘদিনের রেশনিং সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তোলে। একই সময়ে উৎপাদন ও বিনিয়োগও কমে যায়।

সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ বাড়তে থাকে। তামিল প্রশ্নে অসন্তোষও আরও তীব্র হয়।

এই পরিস্থিতিতে ১৯৭৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি বড় পরাজয়ের মুখে পড়ে। ১৬৮ সদস্যের পার্লামেন্টে দলটি মাত্র আটটি আসন পায়। কয়েক বছর আগেও জোটনিরপেক্ষ বিশ্বের অন্যতম পরিচিত মুখ শ্রীমাভোকে এবার ক্ষমতা ছেড়ে বিরোধী রাজনীতিতে ফিরতে হয়।

(বাঁ থেকে) শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী এস ডব্লিউ আর ডি বন্দরনায়েকে ও তাঁর স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। পাশে নেহরুর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে, ৪ ডিসেম্বর ১৯৫৭ সাল
ছবি: নেহরু আর্কাইভ থেকে

রাজনৈতিক নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তন

ক্ষমতা হারানোর পরও শ্রীমাভোর রাজনৈতিক জীবন থেমে যায়নি। ১৯৮০ সালে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে একটি বিশেষ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে তাঁর নাগরিক অধিকার সাত বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। এর ফলে তিনি সংসদ সদস্য থাকার অধিকার হারান এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন।

সমর্থকেরা এই উদ্যোগকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে মনে করতেন। তবে সমালোচকদের মতে, এটি ছিল ক্ষমতায় থাকাকালে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তের জবাবদিহির অংশ।

১৯৮৬ সালে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে শ্রীমাভো আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন। সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টিকে পুনর্গঠনে মনোযোগ দেন। ধীরে ধীরে দলটি আবার জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে ওঠে।

১৯৮৯ সালের নির্বাচনে শ্রীমাভো সংসদে ফিরে আসেন এবং বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন। যাঁকে একসময় রাজনৈতিকভাবে শেষ বলে মনে করা হচ্ছিল, তিনি আবারও জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসেন।

ক্ষমতায় ফিরে শ্রীমাভো চা–রাবারবাগান ও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, ভূমি সংস্কার এবং ওষুধ খাতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ার উদ্যোগ নেন।

তৃতীয় মেয়াদ: মেয়ের অধীনে মায়ের প্রত্যাবর্তন

শ্রীলঙ্কার ১৯৯৪ সালের নির্বাচন দেশটির রাজনীতিতে আরেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। শ্রীমাভোর মেয়ে চন্দ্রিকা বন্দরনায়েকে কুমারাতুঙ্গা প্রথমে প্রধানমন্ত্রী এবং পরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি তাঁর মাকে আবার প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন।

একই পরিবারের দুই প্রজন্মের দুই নারী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দুটি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার ঘটনা তখন পর্যন্ত বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ছিল। তবে শ্রীমাভোর তৃতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক বাস্তবতা আগের দুই মেয়াদ থেকে ভিন্ন ছিল। ১৯৭৮ সালের সংবিধানের মাধ্যমে নির্বাহী রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান কর্তৃত্ব ছিল রাষ্ট্রপতি চন্দ্রিকার হাতে।

তবু দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে সরকার পরিচালনা, দলীয় ঐক্য ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় শ্রীমাভো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ সময় সরকার তামিল বিদ্রোহীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করে। যদিও সংঘাত পুরোপুরি থামানো সম্ভব হয়নি।

জীবনের শেষ দিন

স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতির কারণে ২০০০ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়ান শ্রীমাভো। তবে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরে যাননি।

২০০০ সালের ১০ অক্টোবর শ্রীলঙ্কায় ১১তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি ভোট দেন। ভোটকেন্দ্র থেকে ফেরার পথে হঠাৎ হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।

শ্রীমাভোকে কেবল তাঁর সাফল্য বা ব্যর্থতা দিয়ে বিচার করলে পূর্ণ চিত্রটি ধরা পড়বে না। তাঁকে দেখতে হবে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসা একটি রাষ্ট্রের পরিচয় নির্মাণ, উন্নয়নের পথ খোঁজা এবং শীতল যুদ্ধের বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে।
ডি বি এস জেয়ারাজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মূল্যায়ন

শ্রীমাভো বন্দরনায়েকের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত।

সমর্থকদের মতে, স্বাধীনতার পর শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্র গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্বের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। শীতল যুদ্ধের সময় জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব শ্রীলঙ্কাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিতি দেয়।

অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, ভাষানীতি ও রাষ্ট্রকাঠামো–সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত জাতিগত বিভাজনকে আরও গভীর করে তোলে। বিশেষ করে সিংহলি ভাষার প্রাধান্য এবং রাষ্ট্রে বৌদ্ধধর্মের বিশেষ মর্যাদা তামিল জনগোষ্ঠীর মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি বাড়ায়। অনেক গবেষকের মতে, এসব নীতি পরবর্তী কয়েক দশকে গৃহযুদ্ধের পটভূমি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে মতভেদ রয়েছে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি, ভূমি সংস্কার ও জাতীয়করণ সামাজিক বৈষম্য কমাতে কিছুটা সহায়ক হলেও উৎপাদন, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করেন অনেক অর্থনীতিবিদ। অন্যদিকে সমর্থকদের মতে, সীমিত সম্পদ সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের চেষ্টাই ছিল তাঁর নীতির মূল লক্ষ্য।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডি বি এস জেয়ারাজ ২০১৬ সালের এক প্রবন্ধে লিখেছেন, শ্রীমাভোকে শুধু তাঁর সাফল্য বা ব্যর্থতা দিয়ে বিচার করলে পূর্ণ চিত্রটি ধরা পড়বে না। তাঁকে দেখতে হবে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসা একটি রাষ্ট্রের পরিচয় নির্মাণ, উন্নয়নের পথ খোঁজা এবং শীতল যুদ্ধের বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে তাঁর অনেক সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা সহজ হয়, যদিও তাঁর সব সিদ্ধান্ত সমর্থনযোগ্য নয়।

শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে শুধু একটি নির্বাচনে জয়ী হননি, তিনি নারীর নেতৃত্ব নিয়ে প্রচলিত মানসিক বাধাও ভেঙেছিলেন। তাঁর পথ ধরেই পরবর্তী কয়েক দশকে বিশ্বের বহু দেশে নারী সরকারপ্রধানের আবির্ভাব ঘটে। ইতিহাসের সেই প্রথম পদক্ষেপটি এসেছিল শ্রীলঙ্কা থেকে।

ইতিহাসে তাঁর স্থান

আজ বিশ্বের অনেক দেশে নারী রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ১৯৬০ সালে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। তখন অধিকাংশ দেশেই জাতীয় নেতৃত্বে পুরুষদের আধিপত্য ছিল।

শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে শুধু একটি নির্বাচনে জয়ী হননি, নারীর নেতৃত্ব নিয়ে প্রচলিত ধারণায়ও পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন। তাঁর পরবর্তী কয়েক দশকে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, ফিলিপাইন, জার্মানি ও নিউজিল্যান্ডসহ বহু দেশে নারী সরকারপ্রধানের আবির্ভাব ঘটেছে। ইতিহাসের সেই প্রথম পদক্ষেপটি এসেছিল শ্রীলঙ্কা থেকে।

একসময় যাঁকে প্রতিপক্ষ ‘ক্রন্দসী বিধবা’ বলে বিদ্রূপ করেছিল, ইতিহাস তাঁকেই বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্মরণ রেখেছে।

তথ্যসূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, অক্সফোর্ড ডিকশনারি অব ন্যাশনাল বায়োগ্রাফি, শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টের ওয়েবসাইট, কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) আর্কাইভ, লাইব্রেরি অব কংগ্রেস, শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে ডট নেট, শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে ফাউন্ডেশন।