এক আফগান শিশুর বিয়ে ও করুণ পরিণতি

বিয়ে
প্রতীকী ছবি

আলম গুল জামশিদি শেষবার যখন তাঁর মেয়েকে দেখেছিলেন, তখন রাত। সেই রাতেই তাঁর মেয়ে আজিজ গুলের বিয়ে হয়েছিল। যাঁর সঙ্গে বিয়ে হয়, সেই ব্যক্তির বয়স দ্বিগুণের বেশি। আজিজ গুল তখন জরি লাগানো বিয়ের পোশাকে। মাথায় উজ্জ্বল হলুদ রঙের স্কার্ফ। মুখে রাজ্যের ভয়, শঙ্কা, উদ্বেগ। গত অক্টোবরে সেই রাতের বর্ণনা দিয়ে আজিজ গুলের মা বলেন, সেদিন তাঁর মেয়ে তাঁকে বলেছিল, ‘মা আমি ওখানে গেলে আমার বলিদান হবে।’ মেয়ের সেই শঙ্কা সত্যি হয়েছে।      

বিয়ের রাতে আলম গুলেরও কেমন-কেমন জানি লাগছিল। মেয়ের বিয়ে হচ্ছে ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন তিনি। আজিজ গুলের ওই বিয়ে ঠিক হয়েছিল চার বছর আগে। আলম গুলও তখন ভেবেছিলেন সময় হয়ে গেছে। এখন নতুন একটি পরিবারে যাওয়ার জন্য মেয়েকে উৎসাহিত করাটা তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

আফগান সংস্কৃতিতে একজন নারীকে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে চলে যেতে হয়। আজিজ গুলের বাড়ি আফগানিস্তানের হেরাত প্রদেশের রাজধানী শহর হেরাতের অদূরে গোজার গাহ নামক একটি এলাকায়। বিয়ের পর স্বামী মুসার সঙ্গে আজিজ গুল তার বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে স্বামীর বাড়িতে চলে যায়।

বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ির দূরত্বও ছিল অনেক বেশি। তাই চাইলেও স্বামীর বাড়ি থেকে বাবার বাড়ি যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায় আজিজ গুলের জন্য।

বিয়ের পাঁচ মাস পর আজিজ গুলের শ্বশুরবাড়ি থেকে ফোন আসে। আজিজ গুলের বাবাকে ফোন করেন মুসার বাবা। মুঠোফোনে আলম গুলকে তিনি বলেন, তাঁর মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের গ্রামের বাইরে একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয়েছে আজিজ গুলের নগ্ন মরদেহ। হত্যার আগে তাকে মারধর করা হয়েছে। এ ছাড়া আজিজ গুলের পিঠে ছিল চারটি গুলির ক্ষতচিহ্ন। তখন আজিজ গুলের বয়স হয়েছিল সবে ১৭ বছর। মৃত্যুর সময় তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল সে।

আজিজ গুলের বয়স যখন ১২, তখনই মুসার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছিল তার। শর্ত ছিল, কনের বয়স ১৬ হলেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে। কারণ, এর আগের সরকারের শাসনামলে আফগানিস্তানে বিয়ের জন্য মেয়ের বয়স কমপক্ষে ১৬ হতে হতো। এদিকে আজিজ গুলের ২৬ বছর বয়সী ভাইয়ের সঙ্গে মুসার ১৮ বছরের বোন শাকার বিয়েও ঠিক হয়েছিল।

আলম গুলের চার মেয়ে ও তিন ছেলে। মেয়েদের মধ্যে আজিজ গুল দ্বিতীয়। অন্য ভাইবোনদের চেয়ে মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল সবচেয়ে ভালো। মায়ের সঙ্গেই মূলত তার কথা হতো। অথবা প্রতিদিন বাড়ির কোনো একজনকে অন্তত একটি বার্তা পাঠাত সে।

গত মার্চে আজিজ গুলের মৃত্যুর এক দিন পর শ্বশুর-শাশুড়ি তার মা-বাবাকে জানান, তাঁদের মেয়ে পালিয়ে গেছে। দুই দিন পর এক কৃষক জঙ্গল থেকে তার মরদেহ দেখতে পেয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান। এরপর এ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। একই দিন গ্রামের মানুষজন বিষয়টি নিয়ে বলাবলি শুরু করার পর মুসার বাবা আজিজ গুলের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেন এবং ফোন করে আজিজ গুলের বাবাকে বিষয়টি জানান।

মেয়ের মৃত্যুর কথা জানার পর শোকে ভেঙে পড়েন আজিজ গুলের মা–বাবা। যাত্রা শুরুর কয়েক দিনের চেষ্টায় তাঁরা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছান। মেয়ের লাশ ফিরিয়ে আনতেই এত দূরের পথে যাত্রা করেছিলেন তাঁরা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আল-জাজিরাকে আলম গুল বলেন, ‘রমজান মাস শুরুর তিন দিন আগে মেয়ের লাশ হাতে পাই আমরা। ঘাতক তাকে হত্যার পর লাশটি জঙ্গলের বাইরে ছুড়ে মেরেছিল, যেন সে কোনো মানুষ নয়। মেয়েটা কতটা ভয় পেয়েছিল, ভেবে অবাক হচ্ছি।’

মুসা ও তাঁর কিছু আত্মীয়স্বজন দ্রুত আজিজ গুলের শাশুড়ির ওপর হত্যার দায় চাপিয়ে দেন। তাঁরা দাবি করেন, ঘরের কাজ কীভাবে করতে হয়, ছেলের স্ত্রী তা না জানার কারণে ক্ষিপ্ত ছিলেন তিনি। তাই আজিজ গুলকে মারধর করতে শুরু করেন। খুব কাছ থেকে তার পিঠে গুলি করেন। কিন্তু আজিজ গুলের মা–বাবার সন্দেহ মুসার মা নন, মুসাই তাঁদের মেয়েকে হত্যা করেছেন। বিয়ের দুই মাসের মাথায় আজিজ গুল ও তাঁর অন্য আত্মীয়রা জানতে পারেন মুসা আফিম আসক্ত। ফলে যেকোনো মুহূর্তে তাঁর পক্ষে তাঁদের মেয়েকে হত্যা করা সম্ভব।

আফগানিস্তানে শিশুদের বিয়ের ঘটনা খুবই সাধারণ একটি বিষয়। বিশেষ করে মেয়েশিশুদের জন্য। পারিবারিক ঋণ শোধ, দ্বন্দ্ব নিরসন, প্রতিপক্ষ পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা ভেবে কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। অথবা একেবারে এমন ভাবনা থেকেও শিশুদের বিয়ে দেওয়া হয় যে এতে করে তার ভাগ্য বদলাবে। কারণ, আর্থিক দুর্দশা, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পরিবারগুলো ভাবে যে বিয়ে হয়ে গেলেই হয়তো তাঁদের মেয়ে সুরক্ষিত থাকবে।

আফগানিস্তানে বাল্যবিবাহের প্রকৃত হিসাব নেই। তবে মেয়েশিশুরা যে বাল্যবিবাহের বড় শিকার, তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিল ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভবিষ্যতে বিয়ে দেওয়ার নামে আফগানিস্তানে ২০ দিন বয়সী শিশুকেও বিক্রি করে দেওয়া হয়। মেয়েশিশুরাই বৈষম্যের শিকার।

আফগানিস্তানের মানুষজন এখন চরম অর্থনৈতিক দুর্দশায় ভুগছেন। প্রতিদিন দুই বেলা খেতে পারেন, দেশটিতে এমন পরিবারের সংখ্যা এখন মাত্র ৫ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এক মুঠো খাবারের জন্য মরিয়া মানুষ ভয়ংকর সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এর মধ্যে কেউ কেউ কম বয়সী সন্তান বিক্রি করে দিচ্ছেন। বিশেষ করে মেয়েশিশু। আফগানিস্তানে মেয়ের বিয়ে দিলে বরপক্ষ থেকে যৌতুক বা মোহর হিসেবে অর্থ দেওয়ার চল আছে। সেই আশায় কেউ কেউ কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে দিয়ে থাকেন। চলমান আর্থিক দুর্দশার মধ্যে এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।