খাদ্য ও জ্বালানিসংকটে দিশেহারা শ্রীলঙ্কার বাসিন্দারা গত এপ্রিল মাস থেকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করছেন। গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের সরকারি বাসভবনে ঢুকে পড়েন বিক্ষোভকারীরা। একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় রাজধানী কলম্বোয় ওই সময়ের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহের ব্যক্তিগত বাসভবন ও অফিসে। আন্দোলনের ধাক্কা সামলাতে না পেরে মালদ্বীপ হয়ে সিঙ্গাপুরে পালিয়ে যান গোতাবায়া। মাত্র দুই মাস আগেই জনরোষের মুখে প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়তে বাধ্য হন তাঁর বড় ভাই মাহিন্দা রাজাপক্ষে।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরপরই বিক্ষোভকারীদের শক্ত হাতে দমন করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন রনিল। বলেছেন, ‘যদি আপনারা সরকার পতনের চেষ্টা করেন, প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দখলের চেষ্টা করেন, এটা কোনো গণতন্ত্র হবে না; বরং আইনবিরোধী হবে। আমরা এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শক্ত পদক্ষেপ নেব।’

শ্রীলঙ্কায় জরুরি অবস্থাও জারি করেছেন রনিল। এতে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে, তাঁদের ঠেকাতে সরকার দমন-পীড়নের পথ বেছে নিতে পারে। এরই মধ্যে আন্দোলন দমাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে রনিল বিক্রমাসিংহের সরকার।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে রাজধানী কলম্বোয় সরকারি দপ্তরগুলো থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে বিক্ষোভকারীদের হটিয়ে দিয়েছেন। অভিযানকালে আটক করা হয়েছে অন্তত নয়জনকে। এ সময় আহত হন সাংবাদিকসহ কয়েকজন।

শালিকা বিমলাসেনা নামের একজন বিক্ষোভকারী আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের এখন অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বের অধীনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা যত অপেক্ষা করব, রনিল আমাদের দমন-পীড়নের আরও সুযোগ পাবেন। রাজাপক্ষেদের রক্ষা করার জন্য রনিলকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয়েছে।’

আল-জাজিরার কথা হয়েছে দামিথা আবেরাত্নে নামের একজন নারীর সঙ্গেও। তিনি শ্রীলঙ্কার জনপ্রিয় অভিনেত্রী। এখন বিক্ষোভের নেতৃত্বদানকারীদের একজন। আবেরাত্নে বলেন, যত দিন পর্যন্ত নির্বাচন না হচ্ছে, তত দিন শ্রদ্ধাভাজন কোনো ব্যক্তির নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চান আন্দোলনকারীরা।

১৯৪৯ সালের ২৪ মার্চ এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম রনিল বিক্রমাসিংহের। তাঁর চাচা জুনিয়াস রিচার্ড জয়াবর্ধনে শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭৭ সালে প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করেন রনিল। প্রথম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন ১৯৯৩ সালে। মোট ছয়বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

শ্রীলঙ্কায় ২০২০ সালে পার্লামেন্ট নির্বাচনে রনিল বিক্রমাসিংহের দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) কোনো আসনে জয় পায়নি। তবে দেশটিতে চলমান নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সম্প্রতি নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। মাহিন্দা রাজাপক্ষে পদত্যাগ করলে ষষ্ঠবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গত ১২ মে শপথ নেন রনিল। এরপর ঘুরেফিরে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ও শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টই হলেন তিনি।
মে মাসে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর রনিল বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার সম্পর্ক পুনর্গঠনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রস্তাব দিয়েছিলেন সংবিধানে সংস্কার আনার। এ ছাড়া দেশে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।
রনিলের সমর্থক, এমনকি তাঁর কয়েকজন সমালোচকও বলছেন, রনিলের সরকার চালানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ ছাড়া তিনি আন্তর্জাতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য এক ব্যক্তি। তাই বর্তমান সংকট থেকে শ্রীলঙ্কাকে রক্ষা করতে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি তিনিই। গত মাসে আল-জাজিরার সঙ্গে এক আলাপচারিতায়ও রনিল বলেছিলেন, দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা কাটাতে পারবেন বলে তিনি আত্মবিশ্বাসী।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষক অ্যালান কেনান বলেন, গত কয়েক মাসে রনিল বিক্রমাসিংহের সঙ্গে রাজাপক্ষে পরিবারের সম্পৃক্ততা তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নিজের গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা হলেও বাঁচিয়ে রাখতে রনিলের উচিত নির্বাহী প্রেসিডেন্টের পদ বিলুপ্ত করতে সংবিধান সংশোধনে সমর্থন ও সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া।

বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে রনিল বিক্রমাসিংহের উদ্দেশে এই গবেষক বলেন, নতুন প্রেসিডেন্ট যে বুকে দেশের স্বার্থই ধারণ করছেন, সে বিষয়ে বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করতে রনিলকে অনেক কাজ করতে হবে।

২০১৭ সালে রনিল ক্ষমতায় থাকাকালে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির বেশ উন্নতি হয়েছিল। সে বছর ছয় দশক পর প্রথমবারের মতো দেশটিতে সরকারি ব্যয়ের চেয়ে রাজস্ব আয় বেশি হয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালে চীনকে সঙ্গে নিয়ে ভালো কাজ করেছিলেন রনিল। তখন পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গেও তাঁর ভালো সম্পর্ক ছিল। ভারতের সঙ্গেও গড়ে তুলেছিলেন উষ্ণ সম্পর্ক।

গত মে মাসে ক্ষমতায় আসার পরও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য ধরে রেখেছেন রনিল। পশ্চিমা দেশগুলোর পাশাপাশি চীন ও ভারতের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। এমনকি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পশ্চিমাদের পক্ষ নেননি তিনি।

তবে ক্ষমতা ধরে রাখতে রনিল সুযোগকে কাজে লাগিয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে। এমনই একজন শ্রীলঙ্কাভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ফ্যাকটামের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক উদিতা দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, রনিল একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক। সংসদীয় রাজনীতির খুঁটিনাটি বোঝেন। বিভিন্ন পরিস্থিতি নিজের সুবিধার জন্য কাজে লাগিয়ে দেখিয়েছেন তিনি।

২০১৫-১৯ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও রনিলের বিরুদ্ধে রাজাপক্ষে পরিবারকে রক্ষায় কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। উদিতা দেবপ্রিয় বলেন, ২০১৫ সালে রনিল যখন প্রধানমন্ত্রী হলেন, তখন রাজাপক্ষে পরিবারকে ব্যাপকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত একটি পরিবার হিসেবে দেখা হতো। তিনি রাজাপক্ষেদের সাজার মুখোমুখি করার আদেশ দিয়েছিলেন। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করার সময় এলে থেমে যান।

রনিল সরকারের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত রনিলের সঙ্গে কাজ করেছিলেন শিরাল লাখথিলাকা নামের একজন আইনজীবী। তিনি বলেন, সে সময় যদি কেউ রনিলের বন্ধু হতেন, তাহলেই তাঁকে সরকারি পদে দেখা যেত। এটা স্বজনপ্রীতি।

এদিকে শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট রনিল সামাল দিতে পারবেন না বলে বিশ্বাস করেন দেশটির ফ্রন্টলাইন সোশ্যালিস্ট পার্টির শিক্ষাসচিব পুবুদু জায়াগোদা। এর জন্য তিনি দায়ী করেছেন গত চার দশকে দেশটিতে কার্যকর করা আর্থিক নীতিকে। আল-জাজিরাকে জায়াগোদা বলেন, ‘সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারীকরণের মধ্য দিয়ে আমরা জ্বালানির ওপর আমাদের সার্বভৌমত্ব হারিয়েছি। জাতীয় সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়াও এর জন্য দায়ী।’

ফ্রন্টলাইন সোশ্যালিস্ট পার্টির এই রাজনীতিক বলেন, ‘আমি পুরোপুরি মৃত কোনো অর্থনীতির কথা বলছি না। আমাদের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তবে আমি মনে করি, আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে জ্বালানি খাতের।’

রনিলকে নিয়ে আরেকটি সমালোচনা রয়েছে যে তিনি তাঁর দল ইউএনপির নতুন নেতাদের বেড়ে ওঠার সুযোগ দেননি। ২০১৯ সালে তাঁর সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় জ্যেষ্ঠ নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা ইউএনপি ছেড়ে নতুন দল গড়ে তোলেন।

২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রেমাদাসার প্রার্থিতা চূড়ান্ত করা হয়নি। ওই সময় রনিল ও প্রেমাদাসা বিভিন্ন নীতিগত বিষয়ে প্রকাশ্যে ঝগড়ায় জড়ান।
এ অভিজ্ঞতায় এমন ধারণা জন্মে, সাজিথের পরিবর্তে রনিল বেছে নিয়েছিলেন গোতাবায়াকে। কেননা যদি সাজিথ প্রেসিডেন্ট হতেন, তবে রনিলকে তাঁর অধীন কাজ করতে হতো, বলেন ফ্যাকটামের উদিতা দেবপ্রিয়।

কিন্তু ওই পদক্ষেপ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রনিলের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর দল ইউএনপি ২০১৯ সালের নির্বাচনে দলটির ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ পরাজয় বরণ করে।

ক্ষমতায় থাকাকালে রনিল বুর্জোয়া হয়ে ওঠেন, এমন অভিযোগও রয়েছে। যদিও তিনি তা নাকচ করে দেন।

তবে দুই দশক ধরে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে দাপিয়ে বেড়ানো রাজাপক্ষেদের মতো রনিল যেমন জনতুষ্টিকর কোনো প্রস্তাব রাখতে পারেননি, তেমন জনগণকে খেপিয়েও তুলতে পারেননি। উদিতা বলেন, ‘রনিল দেশের জনগণের অনুভূতিতে টোকা দিতে সক্ষম হননি। আর এটাই রনিল ও যাদের (রাজাপক্ষেদের দল) আশীর্বাদে তিনি এখন প্রেসিডেন্ট, তাদের মধ্যকার সবচেয়ে বড় ফারাক।’

‘ইউএনপির জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করার ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭৭ সালে জয়াবর্ধনে একটি মুক্ত স্বাধীন অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসেননি; বরং এসেছিলেন একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে,’ বলেন বিশ্লেষক উদিতা দেবপ্রিয়।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন