নেপালে সুড়ঙ্গে আটকে পড়া ৪৬ জনের বেঁচে থাকার আশা

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক ঢলের এক সপ্তাহ পরও রসুয়াগাড়ি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকেরা বেঁচে থাকতে পারেন বলে মনে করছেন কয়েকজন কর্মকর্তাছবি: এক্স/রয়টার্স

হিমবাহধসে নেপালে সৃষ্ট প্রলয়ঙ্করী ঢলের এক সপ্তাহের বেশি সময় পার হয়েছে। এই দুর্যোগে রাসুয়াগাড়ি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ভূগর্ভস্থ কক্ষে অনেক কর্মী আটকা পড়েছেন। সেখানে আটকা পড়া কয়েক ডজন কর্মী এখনো জীবিত আছেন বলে নেপাল কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা।

কর্তৃপক্ষ বলেছে, ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর অন্তত ৬৩৯ কর্মী এখনো নিখোঁজ আছেন।

গত সপ্তাহে নেপাল ও চীন–নিয়ন্ত্রিত তিব্বত সীমান্তে হিমবাহধসে সৃষ্ট তীব্র পানির ঢল ও কাদা-পাথরের তোড়ে প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগই ধ্বংস হয়ে যায়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, পাহাড়ি ঢলটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০০ মাইল (১৬০ কিমি) বেগে নদী উপত্যকা ধরে ৬০ মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে সম্পূর্ণ গ্রাম, সেতু ও জলবিদ্যুৎ বাঁধ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।

এই দুর্যোগে এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ২৫২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ।

পাহাড়ি ঢলটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০০ মাইল (১৬০ কিমি) বেগে নদী উপত্যকা ধরে ৬০ মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে সম্পূর্ণ গ্রাম, সেতু ও জলবিদ্যুৎ বাঁধ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বন্যায় এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ২৫২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে ভবন, পাথর ও পলিমাটি মিলিয়ে অন্তত ২২ লাখ টন ধ্বংসস্তূপের সৃষ্টি হয়েছে। বিশাল পাথর ও ঢলের পানির সঙ্গে ভেসে আসা কাদা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলো প্লাবিত করে প্রবেশপথ বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক সুড়ঙ্গ গভীর কাদায় তলিয়ে গেছে।

এসব সুড়ঙ্গে উদ্ধার তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষের ধারণা, সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকা বাতাসের বুদ্‌বুদের (এয়ার পকেট) কারণে শ্রমিকেরা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকতে পারেন। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো থেকে এ পর্যন্ত ২৭১ জনের বেশি মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

সুড়ঙ্গ থেকে একজনকে উদ্ধার করে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। এ সময় প্রার্থনার ভঙ্গিতে দুই হাত তুলে ধরেন তিনি। রাসুয়া, নেপাল, ৪ সেপ্টেম্বর
ছবি: এএফপি

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯ দিন পর আজ শুক্রবার ত্রিশূলী–৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে দুই ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

গত বুধবার কর্মকর্তারা বলেছেন, রাসুয়াগাড়ি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি ভূগর্ভস্থ কক্ষে ৪৬ জন মানুষ এখনো জীবিত আছেন বলে তাঁরা ধারণা করছেন। তাঁদের উদ্ধারে কাজ চলছে।

রাসুয়াগাড়ি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি নেপালের রাসুয়া জেলায়, তিব্বত সীমান্ত থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি রাসুয়া। এখনো হেলিকপ্টার ছাড়া সেখানে যাতায়াত প্রায় অসম্ভব।

নেপাল বিদ্যুৎ বিভাগের পর্ষদ সদস্য অংশু কিরণ শাহি রয়টার্সকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ পরও তাঁরা বেঁচে আছেন বলে আমরা আত্মবিশ্বাসী। কারণ, ওই ভবনের ভেতরে তাঁদের জন্য খাবার ও পানি ছিল।’

তবে নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনদের উৎকণ্ঠা কাটছে না। ৬০ বছর বয়সী দুর্গা গুরুংয়ের ভাই ঝাপ্পাদ ভূজেলও একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে আটকা পড়েছেন।

দ্য গার্ডিয়ানকে দুর্গা বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা শুধু সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করছি।’ সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা জীবিত আছেন কি না, সে বিষয়ে তাঁদের কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

দুর্গা আরও বলেন, ‘সেনাবাহিনী কিংবা বিদ্যুৎ বিভাগের কেউ আমাদের কিছুই বলেনি। অনেক দিন পার হয়ে গেছে। এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, অলৌকিক কোনো ঘটনা ছাড়া আমাদের আর কোনো আশা নেই।’

দুর্গা বলেন, ‘আমাদের স্বজনেরা অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতরে বসে আছেন। তাঁরা আর কতক্ষণ বেঁচে থাকতে পারবেন?’

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ২০ হাজারের বেশি বাড়ি নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। পুনর্গঠনে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় হবে বলে প্রাথমিকভাবে হিসাবে ধারণা করা হয়েছে।

কিরণ শাহি জানিয়েছেন, চারটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান চলছে। এর মধ্যে রাসুয়াগাড়ি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও আপার ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পে প্রায় ৯০ জন নিখোঁজ আছেন। এসব স্থানে সুড়ঙ্গের ভেতরে বাতাস থাকার কারণে কর্মীদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা বেশি।

রাসুয়াগাড়ি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি নেপালের রাসুয়া জেলায়, তিব্বত সীমান্ত থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি রাসুয়া। এখনো সেখানে হেলিকপ্টার ছাড়া যাতায়াত প্রায় অসম্ভব।

নেপালে পাহাড়ি ঢলের ধ্বংসচিত্র। ৩০ আগস্ট, ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

অংশু কিরণ শাহি বলেন, এটি একমাত্র প্রকল্প, যেখানে সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া সম্ভব। তিন দিন আগে সেনাবাহিনী সুড়ঙ্গে ঢোকার চেষ্টা করলেও কক্ষটি খুঁজে পায়নি। আবারও সেখানে অভিযান চালানো হচ্ছে।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত আরেকটি প্রকল্প আপার ত্রিশূলী-৩এ। সেখানে ঘন কাদার কারণে সুড়ঙ্গের সন্ধান পেতেই উদ্ধারকর্মীদের প্রায় ছয় দিন লেগেছে। কর্তৃপক্ষের ধারণা, সেখানে ৩০ থেকে ৪০ জন এখনো জীবিত থাকতে পারেন।

নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত ২ সেপ্টেম্বর বলেছেন, ‘আমরা আশা করছি সেখানে জীবিত মানুষ পাওয়া যাবে। কারণ, আমাদের জানানো হয়েছে, সুড়ঙ্গের ভেতরে একটি শুকনা জায়গা আছে। এখন আমরা সুড়ঙ্গে প্রবেশের পথ তৈরি করার চেষ্টা করছি।’

আরও পড়ুন

এদিকে সেনাবাহিনী জানিয়েছে, জীবিত ব্যক্তিদের উদ্ধারের আশা যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ অভিযান চলবে। একই সঙ্গে মৃতদেহ উদ্ধারের চেষ্টাও অব্যাহত থাকবে।

বাসনেত আরও বলেছেন, উদ্ধার অভিযানে সব ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকেও সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞরাও উদ্ধার অভিযানে সহযোগিতা করছেন।

নেপাল পাহাড়জুড়ে জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণে ৯০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। দেশটির জন্য এই বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক বড়। প্রাথমিক জরিপে দেখা গেছে, বন্যায় ১১টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এতে নেপালের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ২০ হাজারের বেশি বাড়ি নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। পুনর্গঠনে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় হবে বলে প্রাথমিকভাবে হিসাবে ধারণা করা হয়েছে।

আরও পড়ুন