সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রীর বার্ষিক বেতন বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৩৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা
নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হলে সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওয়ং বছরে প্রায় ২৮ লাখ মার্কিন ডলার বা ৩৪ কোটি ৪০ লাখ ৩৬ হাজার টাকা বেতন পাবেন। বর্তমানে তিনি বছরে ১৭ লাখ মার্কিন ডলার বেতন পান। নতুন কাঠামোতে তাঁর বার্ষিক বেতন প্যাকেজ প্রায় ৬৪ শতাংশ বাড়বে। গতকাল মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সিঙ্গাপুরের পার্লামেন্টে মন্ত্রীদের বেতন বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়।
বিশ্বের যেসব দেশের রাজনীতিবিদেরা সবচেয়ে বেশি বেতন পান, সিঙ্গাপুরের মন্ত্রীরা তাঁদের অন্যতম। দেশটির প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওয়ং বর্তমানে বছরে যে বেতন পান, তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকারি বেতনের চার গুণের বেশি।
তা সত্ত্বেও ওয়ংয়ের বার্ষিক বেতন আরও ১০ লাখ ডলার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১৫ বছর পর প্রথমবারের মতো ধনী নগররাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত সিঙ্গাপুরে মন্ত্রীদের বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হলো। মন্ত্রীদের বেতন এতটা বাড়ায় সমালোচনা হচ্ছে।
মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে বেতন বৃদ্ধি
গতকাল পার্লামেন্টে বেতন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ওয়ং বলেন, সরকারি চাকরিতে মেধাবী ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করতে এই বেতন সমন্বয় প্রয়োজন ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক নেতা ও বেসরকারি খাতের নির্বাহীদের পারিশ্রমিকের ব্যবধান বেড়েছে।
নতুন কাঠামোতে ওয়ংয়ের বার্ষিক বেতন প্যাকেজ প্রায় ৬৪ শতাংশ বেড়ে ২২ লাখ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার (১৭ লাখ মার্কিন ডলার) থেকে ৩৬ লাখ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার (২৮ লাখ মার্কিন ডলার) হবে। অন্য মন্ত্রীদের বেতন সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে।
ওয়ং প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, বেতন বাড়ানোর ফলে আগামী পাঁচ বছরে তিনি যে অতিরিক্ত অর্থ পাবেন, তা দাতব্য কাজে দান করবেন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, রাজনীতিবিদদের উচ্চ বেতন দুর্নীতি দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ, প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে দুর্নীতির মাত্রা অনেক বেশি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে (সিপিআই) সিঙ্গাপুরের অবস্থান ছিল তৃতীয়। এই সূচকে সরকারি খাতে দুর্নীতির ধারণাগত মাত্রা পরিমাপ করা হয়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল ২৯তম। সূচকের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় সিঙ্গাপুরে সরকারি খাতে দুর্নীতির মাত্রা কম বলে ধারণা করা হয়।
বেতন বাড়ানো নিয়ে সমালোচনা
ওয়ং নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণা করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। সিঙ্গাপুরে মন্ত্রীদের উচ্চ বেতন বরাবরই একটি স্পর্শকাতর বিষয়। গত বছর দেশটির অর্ধেক মানুষের মাসিক আয় ছিল ৫ হাজার ৭৭৫ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার (প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার)।
সিঙ্গাপুর ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইনের সহযোগী অধ্যাপক ইউজিন তান বলেন, ‘অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তির কারণে বড় ধরনের পরিবর্তনের এই সময়ে বেতন বাড়ানোর ঘোষণা অনেকের কাছে রাজনীতিবিদদের জনবিচ্ছিন্ন বা নিজেদের স্বার্থে নেওয়া সিদ্ধান্ত বলেও মনে হতে পারে।’
তানের মতে, বেশির ভাগ সিঙ্গাপুরবাসী জানেন যে মন্ত্রীরা বেসরকারি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের তুলনায় কম বেতন পান। তা সত্ত্বেও তাঁদের নেতারা এত বেশি বেতন পাচ্ছেন, বিষয়টি তাঁরা সহজে মেনে নিতে পারেন না।
বেতন বাড়ানোর আগেও সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী ওয়ং বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ বেতন পাওয়া রাজনীতিবিদ ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যেখানে কর কাটার আগে বছরে ৪ লাখ ডলার পান, বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেতন পাওয়া নেতা হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী জন লি পান ৭ লাখ ১৯ হাজার ডলার, সেখানে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হওয়ার আগেই ওয়ংয়ের বেতন এই দুই নেতার বেতনের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
নতুন বেতনকাঠামো প্রসঙ্গে ওয়ং বলেন, এটি একটি ‘কঠিন ও সংবেদনশীল বিষয়’, যা মানুষ গভীরভাবে খেয়াল করবে।
ওয়ং আরও বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে কঠিন বলেই আমরা বিষয়টিকে এড়িয়ে যেতে পারি না। আর এটি শুধু বেতনসংক্রান্ত বিষয়ও নয়। মূল প্রশ্নটি হলো, সিঙ্গাপুরকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং আগামী দিনগুলোতে দেশের মানুষকে সঠিকভাবে সেবা দিতে যে মানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আমাদের প্রয়োজন, সিঙ্গাপুর তা ধরে রাখতে পারবে কি না।’
বেতন বাড়ানোর হিসাব
ওয়ংয়ের ক্ষমতাসীন পিপলস অ্যাকশন পার্টি (পিএপি) ১৯৫৯ সাল থেকে একটানা ক্ষমতায় রয়েছে। ছোট এই দেশটিকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রায়ই দলটির প্রশংসা করা হয়। তবে ভিন্নমত দমনের জন্য দলটির সমালোচনাও রয়েছে।
২০১১ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া ও আয়বৈষম্য নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে মন্ত্রীদের বেতন কমানো হয়েছিল। ওই সময় সাধারণ নির্বাচনে পিএপি যে পরিমাণ জনপ্রিয় ভোট পেয়েছিল, তা দলটির ইতিহাসে কোনো সাধারণ নির্বাচনে সর্বনিম্ন ছিল।
এবার একটি স্বাধীন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে মন্ত্রীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। কত বেতন বাড়ানো হবে, তা নির্ধারণে কমিটি সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ১ হাজার আয়কারীর আয়কে মানদণ্ড হিসেবে নিয়েছে।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জা ইয়ান চং এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, এত অল্পসংখ্যক উচ্চ আয়ের মানুষের আয়ের সঙ্গে রাজনীতিকদের বেতনকে যুক্ত করার যুক্তি স্পষ্ট নয়। এ ধরনের যোগসূত্র রাজনীতিকদের দৃষ্টিভঙ্গিকে সিঙ্গাপুরের সমাজের সবচেয়ে ধনী অংশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে পারে।
উচ্চ বেতন কি দুর্নীতি কমায়
সিঙ্গাপুরে সরকারি চাকরিতে দুর্নীতির ঘটনা অত্যন্ত বিরল। এতে বোঝা যায়, মন্ত্রীদের বেশি বেতন দেওয়ার কারণে ঘুষ বা দুর্নীতির লোভ কিছুটা হলেও কমে। তবে চং মনে করেন, এই ব্যবস্থা ‘পুরোপুরি নিখুঁত নয়’।
২০২৪ সালে সাবেক পরিবহনমন্ত্রী এস ঈশ্বরনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পদে থাকাকালে তিন লাখ ডলারের বেশি মূল্যের বিভিন্ন উপহার ও সুবিধা নেওয়ার অপরাধে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন।
চং আরও বলেন, ‘বেশি বেতনের লোভ থাকলে রাজনীতিতে জনসেবা করার আসল উদ্দেশ্যটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। অথচ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতাদের জন্য জনসেবাই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।’