মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং পাঁচ বছর আগে অবসরের কয়েক মাস আগে একটি অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত নেন। গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে তিনি নিজেকে দেশের শাসক ঘোষণা করেন।
চশমা পরা এ সেনা কর্মকর্তা ২০১১ সালে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান হন। ঠিক ওই সময় দেশটি দীর্ঘদিনের কঠোর সামরিক শাসনের ইতিহাসকে ভেঙে দিয়ে গণতন্ত্রের নতুন পথে যাত্রা শুরু করেছিল।
৬৯ বছর বয়সী মিন অং হ্লাইং অভ্যুত্থান করার আগে প্রায় এক দশক ধরে নীরবে নিজের আধিপত্য সুদৃঢ় করেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে কারাগারে পাঠান। এর কয়েক মাসের মধ্যে দেশটিতে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
গত মাসের শেষের দিকে মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হয়। তিন ধাপে এ নির্বাচনের ভোট চলছে। তৃতীয় ও শেষ ধাপের ভোট গ্রহণ হয়েছে গতকাল রোববার। মিন অং হ্লাইং নিজেই পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করেছেন।
মিয়ানমারের চলতি নির্বাচনে সু চির নেতৃত্বাধীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি–সহ (এনএলডি) গুরুত্বপূর্ণ অনেক দল অংশ নিচ্ছে না। তাই এ নির্বাচন কী ফল বয়ে আনবে, তা নিয়ে দেশটির জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু মিন অং হ্লাই সব সন্দেহ উপেক্ষা করে বারবার বলেছেন, এ নির্বাচন দেশে শান্তি ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে।
এবারের নির্বাচনে সেনা-সমর্থিত প্রধান রাজনৈতিক দল যাতে নিরঙ্কুশ জয় পায়, সেভাবেই সবকিছুর আয়োজন করা হয়েছে। আর মিন অং হ্লাইং নিজেই স্পষ্ট করে বলেছেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি সামরিক ইউনিফর্ম খুলে প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণ করতে প্রস্তুত।
মিন অং হ্লাইং এখনো সেনাপ্রধান। আইনি বৈধতা না থাকলেও তিনিই দেশটির ক্ষমতার সর্বেসর্বা-এটা সব মিয়ানমারবাসী জানেন।
তৃতীয়বারের চেষ্টায় সেনাবাহিনীতে
মিয়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলের দাওয়ে শহরে মিন অং হ্লাইংয়ের জন্ম। বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়াশোনা শেষে তিনি তৃতীয়বারের চেষ্টায় অফিসার ট্রেইনিং স্কুলে ভর্তি হন। এরপর ধাপে ধাপে সামরিক ক্যারিয়ারের শীর্ষে উঠতে থাকেন। চীনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট আছে, এমন এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী একটি জাতিগত বিদ্রোহীদের দমন করে তিনি সুপরিচিত হয়ে ওঠেন।
মিন অং হ্লাইংয়ের আগে সেনাপ্রধান ছিলেন থান শ্যে। তিনি প্রায় দুই দশক মিয়ানমার শাসন করেন। এর ভেতর তাঁর কপাল ঘটল এক বিরল ঘটনা—তিনি নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের অধীনে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। কিন্তু দেশটির খসড়া সংবিধান তাঁকে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান দৃঢ় করার সুযোগ করে দিয়েছিল। দেশটির খসড়া সংবিধানে পার্লামেন্টের এক-চতুর্থাংশ আসন এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীপদ সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
রোহিঙ্গা নিধন
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের আগে থেকেই মিন অং হ্লাইং অনেক দেশের কাছে অবাঞ্ছিত ব্যক্তির তালিকায় ছিলেন। ২০১৭ সালে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনী বড় সামরিক অভিযান চালায়। এতে করে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেন। এ অভিযানের সঙ্গে মিন অং হ্লাইংয়ের সংশ্লিষ্টতা থাকায় তিনি আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়েছেন।
হিংসাত্মক বক্তব্যের কারণে ফেসবুক মিন অং হ্লাইংকে নিষিদ্ধ করে। বিশ্বের অনেক দেশ তাঁর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান প্রসিকিউটর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য আবেদন করেন।
কিন্তু মিন অং হ্লাইং বারবার তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের দমনের জন্য সামরিক অভিযান জরুরি ছিল। অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে আধুনিকীকরণের বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছেন মিন অং হ্লাইং। এ প্রকল্পে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন। চীন, রাশিয়া ও ইসরায়েল থেকে আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম কিনছেন।
মেডেলের আড়ালে অপকর্ম
প্রতিবছরের ২৭ মার্চ রাজধানী নেপিডোতে সশস্ত্র বাহিনী দিবসে জাঁকজমকপূর্ণ সামরিক কুচকাওয়াজের নেতৃত্ব দেন মিন অং হ্লাইং। হুড খোলা জিপে দাঁড়িয়ে তিনি অভিবাদন গ্রহণ করেন। তাঁর দুই বাহু ও বুকে থাকে সামরিক ও বেসামরিক স্বীকৃতির অনেক মেডেল।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দাপ্তরিক পদবি হিসেবে মিন অং হ্লাইংয়ের একটি দীর্ঘ নাম লেখা হয়। তা হলো ‘স্টেট সিকিউরিটি অ্যান্ড পিস কমিশন চেয়ারম্যান কমান্ডার ইন চিফ অব ডিফেন্স সার্ভিসেস সিনিয়র জেনারেল থাদো মহা থ্রায় সিত্থু থাদো থিরি থুদধর্মা মিন অং হ্লাইং’। এতে তাঁর একাধিক সামরিক-বেসামরিক খেতাব ও দায়িত্বের কথা উল্লেখ আছে।
তবে মিন অং হ্লাইংয়ের খেতাব ও পদবি যত লম্বাই হোক, বার্ষিক কুচকাওয়াজে প্রতিবছর সেনাসংখ্যা কমছে। কারণ, তাঁর বাহিনীকে বিস্তৃত ও দুর্গম দেশটির নানা অঞ্চলে বিদ্রোহ দমনে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জোরদার হচ্ছে সেনাশাসন
অং সান সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করে কারাগারে পাঠানোর পর মিন অং হ্লাইং তাঁর বিরুদ্ধে ২০২০ সালের নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ আনেন। কিন্তু নিজের দাবির পক্ষে তিনি প্রমাণ দিতে পারেননি।
বিশ্লেষকেরা তখন বলেছিলেন, ২০২০ সালের নির্বাচনে সেনা-সমর্থিত দলগুলো ভালো করতে পারেনি। তাই রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা কমা নিয়ে মিন অং হ্লাইং উদ্বিগ্ন ছিলেন।
অভ্যুত্থানের পর নাগরিকেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের শক্ত হাতে দমন শুরু করে। এ অবস্থায় বিক্ষোভকারীরা শহর ছেড়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন। তাঁদের সঙ্গে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের পুরোনো অনেক বিদ্রোহী গোষ্ঠীও যোগ দেয়। কর্মজীবনের শুরুতে এসব বিদ্রোহী দমনে মিন অং হ্লাইং নিজেই লড়াই করেছিলেন।
পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধে মিয়ানমারে কত মানুষ মারা গেছে, সেটার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটার (এসিএলইডি) তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর থেকে সব পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহত মানুষদের একটি বড় অংশ জান্তার জোর করে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া সেনাসদস্য বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।