‘আমার ছেলেকে কেন হত্যা করা হলো, পুড়িয়ে ফেলা হলো’

নিজের মোবাইলে ছেলের খাবার খাওয়ার একটি ভিডিও দেখাচ্ছেন সামিরা মোহাম্মদি। হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি ছেলের এ ভিডিও করেছিলেনছবি: এএফপির ইউটিউব ভিডিও থেকে

আফগান মা সামিরা মোহাম্মদির আশা, একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত হয়তো তাঁর ছেলে হারানোর যন্ত্রণার আগুন নেভাতে পারবে।

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে গত মাসে পাকিস্তানের বোমা হামলায় শতাধিক মানুষ নিহত হন, যাঁদের মধ্যের সামিরার ছেলেও রয়েছেন।

আফগান কর্মকর্তারা বলেন, গত ১৬ মার্চ পাকিস্তানের ছোড়া একটি বোমা কাবুলের একটি মাদকাসক্তি চিকিৎসাকেন্দ্রে আঘাত হানে এবং সেখানে ৪১১ জন নিহত হন।

জাতিসংঘের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে এএফপিকে বলে, সেখানে তারা অন্তত ২৫০ জন নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে, এখনো আরও অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন।

৪৩ বছর বয়সী সামিরা বাড়িতে বসে মোবাইলে তাঁর বড় ছেলের ছবি দেখছিলেন। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে তদন্ত হওয়া উচিত...আমার মতো অনেক মা তাঁদের সন্তান হারিয়েছেন, অনেক নারী তাঁদের স্বামী হারিয়েছেন এবং অনেক বোন তাঁদের ভাই হারিয়েছেন।’

কয়েক মাস ধরে দুই প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা এবং পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। ইসলামাবাদের অভিযোগ, সীমান্তের ওপার থেকে এসে পাকিস্তানে হামলা চালানো জঙ্গিদের কাবুল আশ্রয় দিচ্ছে। তালেবান সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

পাকিস্তানের দাবি, তারা (১৬ মার্চ) একটি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। কাবুলে প্রাণঘাতী বোমা হামলার সম্ভাব্য তদন্ত সম্পর্কে এএফপির প্রশ্নের কোনো জবাব তারা দেয়নি।

হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এএফপির সাংবাদিকেরা বেশ কয়েকটি মৃতদেহ দেখেছেন। মৃতদেহগুলোর মধ্যে কয়েকটি ছিন্নভিন্ন বা দগ্ধ অবস্থায় ছিল।

কয়েক মাস ধরে দুই প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা এবং পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। ইসলামাবাদের অভিযোগ, সীমান্তের ওপার থেকে এসে পাকিস্তানে হামলা চালানো জঙ্গিদের কাবুল আশ্রয় দিচ্ছে। তালেবান সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছে, বিস্ফোরণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে কিছু মৃতদেহ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সামিরার ছেলের নাম আরেফ খান, বয়স ২০ বছর। মায়ের সঙ্গে ইরানে একটি কসাইখানায় কাজ করার সময় আরেফ মেথামফেটামিন নামের একটি মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন।

ছেলের মাদকাসক্ত হয়ে পড়া নিয়ে এ নারী বলেন, তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে বলেছিলেন, এই মাদক তাঁকে জেগে থাকতে সহায়তা করবে।

কয়েক মাস আগে পরিবারটি আফগানিস্তানে ফিরে আসে এবং কাবুলে নিজেদের ভাগ্য গড়ার চেষ্টা করতে থাকে।

কাবুলে আরেফ দিনমজুর হিসেবে এবং তাঁর মা সামিরা গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছিলেন।

মাদকের নেশা থেকে মুক্ত করার জন্য আফগান কর্তৃপক্ষ আরেফকে কাবুলের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ‘ক্যাম্প ওমিদ’ পুনর্বাসনকেন্দ্রে ভর্তি করায়।

কাবুলে এই জরাজীর্ণ বাড়িতে থাকেন সামিরা মোহাম্মদি। ৩০ মার্চ এখানেই এএফপি তাঁর সাক্ষাৎকার নেয়। সে সময় ছবিটি তোলা
ছবি: এএফপি

সামিরা হামলার দিনের কথা মনে করে বলেন, হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি তাঁর ছেলের জন্য কিছু জিনিসপত্র নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন।

এই মা বলেন, ‘আমি তার সঙ্গে বসেছিলাম, তার একটি ভিডিও রেকর্ড করেছিলাম এবং সে তার খাবার খেয়েছিল।’

কান্নাভেজা চোখে সামিরা বলেন, ‘সাধারণত, যখন কোনো যুদ্ধ হয়, সামরিক ক্ষেত্র লক্ষ্যবস্তু হয় বা হামলার শিকার হয়, তাহলে কেন তারা (পাকিস্তান) এই হাসপাতালে হামলা করল?’

ওয়ার চাইল্ড ইউকেসহ ১৭টি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে—তারপরও এ ঘটনায় বিচার হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার এ ঘটনায় একটি স্বতন্ত্র তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।

তাঁরা বলেন, যারা এর জন্য দায়ী, তাদের ‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে’।

তালেবান সরকার এএফপিকে বলেছে, তারা গণমাধ্যম, কূটনীতিক ও বেসরকারি সংস্থাকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছে এবং তাদের কাছে ‘প্রমাণ দিয়েছে’।

আফগানিস্তান বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক রিচার্ড বেনেট এএফপিকে বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে, প্রাথমিকভাবে তাদের ওপরই দায়ভার বর্তায়, আর তারা হলো পাকিস্তান।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং অধ্যাপক কেনেথ রথ বলেন, অনেক নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুর পর ঠিক কোথায় ভুল হয়েছিল, পাকিস্তান তা খুঁজে বের করতে চেষ্টা করবে বলে তিনি আশা করছেন।

এ হামলায় নিহত কয়েকজনের স্বজন বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থার দ্বারা পরিচালিত তদন্তের ওপর তাঁরা আরও বেশি আস্থা রাখতে পারবেন।

আফগানিস্তানে জাতিসংঘ মিশন (ইউএনএএমএ) যেসব কার্যক্রম পরিচালনা করে, তার একটি হলো দেশটির নাগরিকদের ওপর সংঘাতের প্রভাব নিয়ে তদন্ত করা। সে অনুযায়ী বোমাবর্ষণের প্রভাব নিয়ে তদন্ত করা হবে।

যদি তদন্তে ‘নাগরিকদের ওপর ইচ্ছাকৃত বা বেপরোয়া আক্রমণের’ প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে এই হামলার বিরুদ্ধে অপরাধমূলক অভিযোগ উঠতে পারে বলে এএফপিকে বলেন রথ।

যদিও ইউএনএএমএ–এর বিচার করার কোনো ক্ষমতা নেই, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) আফগানিস্তানে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে পারেন। আইসিসি একটি অসদস্য রাষ্ট্রের নাগরিকদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধাপরাধের মামলা চালাতে পারেন। তবে এটি সাধারণত কোনো একটি ঘটনার চেয়ে সংঘাতের প্যাটার্ন বা ধারা পর্যবেক্ষণ করে।

রথ বলেন, গাজা, ইউক্রেন, সুদান বা মিয়ানমারে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর ওপর হামলার দায়ে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিকভাবে কেউ দোষী সাব্যস্ত হয়নি। মামলা না হওয়া এ ধরনের যুদ্ধাপরাধকে উত্সাহ দেয় বলেও মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুন

তবে কঠিন সংগ্রামে জীবন চালিয়ে নেওয়া সামিরা এখনো আশা ছাড়েননি। তিনি ছেলে হত্যার ন্যায়বিচার পেতে চান। তিনি বলেন, ‘২০ বছরের একটি ছেলে, যাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, তাকে কেন হত্যা করা হলো, পুড়িয়ে ফেলা হলো, এর তদন্ত করতে হবে।’

‘যদি আমরা এখনই এর কারণ জানতে না চাই, তবে হয়তো ভবিষ্যতে আমাদের একই ক্ষতি আবার দেখতে হবে।’

আরও পড়ুন