সেটা ছিল এমন এক সময়, যখন তালেবান আফগানিস্তানজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা দেশটির রাজধানী কাবুলের উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে।

২৪ বছর বয়সী শবনম ছিলেন একজন উঠতি তারকা। দেশটির সবশেষ পরিস্থিতি দর্শকদের জানাতে সেদিন তিনি ‘অন-এয়ারে’ গিয়েছিলেন।

তখনকার পরিস্থিতি সম্পর্কে শবনম বলেন, ‘আমি এতটাই আবেগপ্রবণ ছিলাম যে প্রধান সংবাদ পর্যন্ত পড়তে পারছিলাম না। যাঁরা (দর্শক) বাড়িতে বসে আমাকে দেখেছেন, তাঁরা বলতে পারবেন, আমি কী অবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলাম।’

পরের দিন সকালে শবনম যখন ঘুম থেকে ওঠেন, তখন তালেবানের হাতে কাবুলের পতন ঘটে গেছে।

শবনমের টিভি স্টেশনে হানা দেয় তালেবান। একজন তালেবান সদস্য তাঁর পেছনে সংগঠনের পতাকা রেখে টিভি স্টেশনের স্টুডিওর চেয়ারে বসেন। এ চেয়ারেই আগের রাতে বসেছিলেন শবনম।—এই যে বদল, তা আফগানিস্তানে একটি যুগের সমাপ্তির বার্তা দেয়।

ক্ষমতায় আসার পর প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে তালেবানের একজন মুখপাত্র সাংবাদিকের বলেন, দেশটিতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও কাজ করতে পারবেন।

পরের দিন কিছুটা শঙ্কা ও উত্তেজনা নিয়ে শবনম তাঁর কাজের পোশাক পরে কর্মক্ষেত্রে যান। কিন্তু তিনি টিভি স্টেশনে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তালেবান যোদ্ধাদের সামনে পড়েন। তাঁরা ভবনটি পাহারা দিচ্ছিলেন। তাঁরা শুধু পুরুষ কর্মীদের ভবনে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছিলেন।

শবনম বলেন, একজন তালেবান যোদ্ধা তাঁকে বলেছিলেন, ইসলামিক আমিরাত অব আফগানিস্তানে তাঁরা এখনো নারীদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।

অপর এক তালেবান যোদ্ধা শবনমকে বলেছিলেন, ‘আপনি যথেষ্ট কাজ করেছেন। এখন আমাদের সময়।’

শবনম বলেছিলেন, তাঁর কাজ করার অধিকার আছে।

ঠিক তখন এক তালেবান যোদ্ধা শবনমের দিকে রাইফেল তাক করেন। রাইফেলের ট্রিগারে আঙুল রেখে তিনি বলেন, ‘আপনার জন্য একটি গুলিই যথেষ্ট। আপনি চলে যাবেন নাকি আমি আপনাকে এখানেই গুলি করে দেব?’

তারপর শবনম চলে যান। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। ভিডিওটি ভাইরাল হয়। এতে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জীবন হুমকির মধ্যে পড়ে।

শবনম বুঝে যান, আফগানিস্তানে তাঁর আর থাকা হবে না। তিনি ব্যাগ গুছিয়ে ফেলেন। দিন কয়েক পর দেশ ছেড়ে পালান। এই অনিশ্চিত যাত্রায় তাঁর সঙ্গী হন দুই ভাই-বোন—মিনা ও হেমাত।

default-image

নতুন জীবন, কঠিন জীবন

হাজারো আফগান শরণার্থীর সঙ্গে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান শবনম ও তাঁর দুই ভাই-বোন। তাঁদের এ যাত্রা ছিল কষ্টকর, অনিশ্চিত।

যুক্তরাজ্যে পা রেখে নতুন ও কঠিন এক জীবনের মুখোমুখি হন শবনম। এ জীবন শরণার্থীর। তাঁর ইংরেজি জানা ছিল না। ফলে তাঁকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। তাঁর জন্য চাকরির সম্ভাবনাও সীমিত।

একটা পুরোপুরি নতুন পরিবেশের সঙ্গে শবনমদের খাপ খাইয়ে নিতে খুব বেগ পেতে হয়।

শবনম বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে, আমি আফগানিস্তানে যে ছয় বছর কাজ করেছি, তা হারিয়ে ফেলেছি। এখন আমাকে ইংরেজি শিখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হবে। যুক্তরাজ্যে আসার পরের দিনগুলোতে আমরা কেনাকাটা করতে পর্যন্ত যেতে পারিনি। আমাদের যদি কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসের দরকার হতো, আমরা তা বলতে পারিনি। এটা অত্যন্ত কঠিন ও বেদনাদায়ক ছিল।’

যুক্তরাজ্যে শবনমের শরণার্থীজীবনের প্রায় এক বছর হতে চলছে। যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে আসা আফগান শরণার্থীদের বেশির ভাগই দেশটির বিভিন্ন হোটেলে রয়ে গেছেন। তবে শবনম ও তাঁর ভাইবোনেরা ভাগ্যবান। চলতি বছরের শুরুর দিকে তাঁদের একটি বাসা দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে বসবাসের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে শবনম বলেন, ‘আমাদের জীবন এখন শুরু হয়েছে। আমরা নতুন শিশুর মতো, যাঁদের শুরু থেকে শুরু করতে হয়।’

শবনমরা ধীরে ধীরে যুক্তরাজ্যের জীবনধারার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। তাঁরা সেখানে প্রথম গ্রীষ্মকাল উপভোগ করছেন। যদিও তাঁরা তাঁদের জন্মভূমিকে ভীষণ অনুভব করছেন।

শবনম ও তাঁর ছোট বোন এখন একটি কলেজে ইংরেজি পড়ছেন। আর ছোট ভাই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে।

শবনমের ভাষ্য, তাঁদের ভালোভাবেই সাহায্য-সহযোগিতা করছে যুক্তরাজ্য সরকার। তবে তিনি অন্য আফগান শরণার্থীদের নিয়ে চিন্তিত। যাঁদের মধ্যে তাঁর কয়েক বন্ধুও আছেন। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তাঁদের দুর্দশা আরও বেড়েছে।

শবনম একদিন আফগানিস্তানে ফিরে যাওয়ার আশা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি সেই দিনের আশায় আছি, যেদিন আফগানিস্তান এমন একটি স্থান হবে, যেখানে মানুষ শুধু বেঁচেই থাকবে না, সমৃদ্ধিও অর্জন করবে। তখন দেশে ফিরে যাওয়া নিয়ে আমার মধ্যে কোনো সন্দেহ থাকবে না।’

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন