৩০১ সালে নির্মাণ, এখনো দাঁড়িয়ে আছে অনুরাধাপুরার স্মৃতিস্তম্ভ
মিসরের পিরামিড সবার কাছেই পরিচিত। এর দেখা পেতে যেতে হবে সুদূর আফ্রিকা। তবে আমাদের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কায়ও কিন্তু বিস্ময়জাগানো একটি প্রাচীন কীর্তি রয়েছে। সেটি বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ। নির্মাণের ১ হাজার ৭০০ বছর পরও স্তম্ভটি এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু এর ইতিহাস সম্পর্কে বেশি জানাশোনা না থাকায়, মানুষের কাছে স্তম্ভটি ততটা পরিচিত হয়ে ওঠেনি।
বলছি শ্রীলঙ্কার প্রাচীন শহর অনুরাধাপুরার জেতাভানারামায়া স্মৃতিস্তম্ভের কথা। এ নিয়ে বিস্তারিত জানার আগে শহরটির কথা বলে নিই। ‘সিন্ধুর টিপ’ শ্রীলঙ্কার প্রথম প্রধান রাজধানী ছিল এই অনুরাধাপুরা। সারা বিশ্বের বৌদ্ধদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র শহরগুলোর একটি এটি। প্রাচীনকালে ভারতের বাইরে অনুরাধাপুরার বাসিন্দারাই প্রথম বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
শুরুতে পিরামিডের সঙ্গে জেতাভানারামায়ার তুলনা করা হলো কেন? ৩০১ খ্রিষ্টাব্দে যখন গম্বুজাকার স্মৃতিস্তম্ভটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল, তখন উচ্চতার দিক দিয়ে এটি ছিল বিশ্বে মানুষের তৈরি স্থাপনাগুলোর মধ্যে তৃতীয় (৪০০ ফুট)। প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে ছিল মিসরের গিজার পিরামিডগুলো। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জেতাভানারামায়া ক্ষতির মুখে পড়েছে। এখন এটির উচ্চতা ২৩৩ ফুট।
জেতাভানারামায়ার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো—এটি এখন পর্যন্ত ইটের তৈরি সবচেয়ে বড় স্থাপনা। ১ হাজার ৭০০ বছর আগে স্তম্ভটি নির্মাণের সময় আনুমানিক ৯ কোটি ৩৩ লাখ পোড়ামাটির ইট লেগেছিল। এই ইট দিয়ে যদি তিন ফুট উঁচু একটি দেয়াল তৈরি করা হয়, তা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বে নিউইয়র্ক শহর থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে পশ্চিমের পিটসবার্গ শহর পর্যন্ত চলে যাবে।
জেতাভানারামায়া স্মৃতিস্তম্ভটি ঘিরে একটি বিশালাকার বৌদ্ধ মঠও রয়েছে। নাম জেতাভানা বিহার। অনুরাধাপুরার জ্যেষ্ঠ প্রত্নতত্ত্ব কর্মকর্তা গোদামুনে পান্নাসেহার ভাষ্যমতে, এই বিহারে কমবেশি ২০০ জন সন্ন্যাসী বসবাস করতেন। আর বিহারের স্থাপনাগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা, যেন সন্ন্যাসীরা নিজেদের ঘর থেকে বের হলে প্রথমেই চোখে পড়ে সুউচ্চ স্মৃতিস্তম্ভটি।
গোদামুনে পান্নাসেহার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রাচীন বিভিন্ন নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, জেতাভানারামায়া স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন রাজা মহাসেনা। এর নির্মাণকাজে যুক্ত ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পাশাপাশি মহাসেনার ভারত অভিযানের সময় বন্দী করা ব্যক্তিদেরও কাজে যুক্ত করা হয়েছিল। বৌদ্ধ ভক্ত ও সাধারণ মানুষও স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণের কাজে হাত লাগিয়েছিলেন।
ইতিহাসবিদদের বিশ্বাস, জেতাভানারামায়া নির্মাণকাজে নিশ্চিতভাবে হাতি ও বলদে টানা গাড়ি ব৵বহার করা হয়েছিল। কারণ, শ্রীলঙ্কায় প্রাচীন বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে এগুলো ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে। যেমন খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০ সালে নির্মিত রুয়ানওয়েলিসায়া বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ।
প্রত্নতত্ত্ববিদদের অবাক করেছে স্মৃতিস্তম্ভটির নির্মাণকৌশল। কারণ, পিরামিড পাথরের তৈরি হলেও, এটি ইটের তৈরি। পাথরের তুলনায় ইটে অনেক বেশি ক্ষয় হয়। তারপরও স্মৃতিস্তম্ভটি পিরামিডের মতোই দীর্ঘ সময় ধরে টিকে আছে। শ্রীলঙ্কার কেলানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অনূঢ়া মানাতুঙ্গা বলেন, কোটি কোটি ইট নির্ভুলভাবে তৈরি ও স্থাপন করতে হয়েছিল।
মানাতুঙ্গা বলেন, জেতাভানারামায়ার পর শ্রীলঙ্কায় আর কখনোই এত বিশাল বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়নি। এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য জায়গায় পরে গম্বুজ আকৃতির স্তম্ভ তৈরি হলেও সেগুলো এত বড় নয়।