শোক আর শঙ্কার মধ্যে নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাচ্ছেন মানুষ। বাড়ছে আহত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা। মরদেহের সংখ্যাও বাড়ছে। উদ্ধারকাজে পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনীসহ বিভিন্ন বিভাগের হাজারো সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। জীবিতদের খুঁজে বের করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নেপালে এমন এক পরিস্থিতিতে গতকাল শুক্রবার নতুন করে বন্যার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নেপাল ও চীনের তিব্বত অংশে কয়েক ঘণ্টা উদ্ধারকাজ বন্ধ ছিল। পরে ঝুঁকি কমে এলে উদ্ধারকাজ আবার শুরু হয়। গত বুধবার তিব্বত-নেপাল সীমান্তে হিমবাহধসে আকস্মিক বন্যায় মরদেহের সংখ্যা বাড়ছেই।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, হিমবাহধসের ঘটনায় তৈরি হ্রদের পানির উচ্চতা বাড়লেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হিমবাহধসের পর সৃষ্টি হওয়া দুর্যোগে নেপালে সরাসরি অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিগুলোর ফেডারেশন (আইএফআরসি)। নেপালে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্তত ৫৭৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। চীনের তিব্বতে উদ্ধার করা হয়েছে অন্তত পাঁচজনের মরদেহ।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৯২৪ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি। তাঁদের অনেকে ভারতের তীর্থযাত্রী। তাঁরা তিব্বতের কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবরের দিকে যাচ্ছিলেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে নিখোঁজ রয়েছেন ৫৫৮ জন, যাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের ১০ নাগরিকের একটি দল তিব্বতের কৈলাস পর্বতে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। নিখোঁজ একজনের স্ত্রী ভার্জিনিয়ার চ্যান্টিলির বাসিন্দা স্নেহা সুধীর। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে পরিবারের সদস্যরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। স্নেহা রয়টার্সকে বলেন, ‘তাঁরা কোথায়?...আমরা সবাই কাঁদছি। চোখের পানি মুছে আবার স্বজনের খোঁজ করছি।’
এদিকে নেপাল সরকার প্রথমে বিদেশি উদ্ধারকারী দলকে সহায়তার সুযোগ দিতে রাজি না হলেও তীব্র আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পরে অবস্থান বদলেছে।
নতুন বন্যার শঙ্কা
হিমবাহধসের পর তিব্বত-নেপাল সীমান্তের কাছে দুটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। এর একটি উজানে হিমবাহের কাছে। সেখানে বরফগলা পানি জমেছে। অন্যটি নেপালের লেন্দেখোলা নদীতে ছোছেনখোলা ও পুরেপুসাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে। হিমবাহধসের পর ভূমিধসে পাথর, বরফ, কাদা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ নদীর প্রবাহ আটকে দেওয়ায় সেখানে পানি জমে এই হ্রদ (ব্যারিয়ার লেক) তৈরি হয়েছে। ওই নদীগুলোর উৎপত্তি তিব্বতে। পরে দুটি নদী মিলে নেপালে ঢোকে, যেখানে নদীটির নাম হয়েছে ভোটেকোশি।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানায়, চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে গত বৃহস্পতিবার সকালে ওই হ্রদে ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমে ছিল। পরের তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি সেখানে জমতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। গতকাল হ্রদটির পানি উপচে লেন্দেখোলা নদীতে এবং পরে ত্রিশূলী নদীতে যায় বলে নেপালের কর্মকর্তারা জানান। রয়টার্স জানায়, গতকাল হ্রদটির পানির পরিমাণ ছিল ২৫ লাখ ঘনমিটারের বেশি।
হ্রদটির পানি উপচে পড়ার খবর এলেও সেখানে তৈরি বড় কোনো প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙেছে কি না, তা নেপাল সরকার নিশ্চিত করেনি। ফলে উজান থেকে ঠিক কতটা পানি নেমেছে এবং দু-এক দিনের মধ্যে আবার বড় ধরনের ঢল আসবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
নেপাল সরকার নতুন সৃষ্টি দুটি হ্রদের ওপর নজর রাখছে। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, হ্রদ দুটির পানি পুরোপুরি নেমে না যাওয়া পর্যন্ত নতুন করে বন্যার ঝুঁকি থাকবে। স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা গেছে, একটি হ্রদের পানি বেরিয়ে যেতে শুরু করেছে। আরও উজানে, তথা তিব্বতে সৃষ্ট হ্রদটি আরও বড় হচ্ছে এবং গতকাল সেখান থেকে পানি বের হওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ পরিস্থিতিতে ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। রাসুয়ার ধুনচে ও আশপাশে থাকা হেলিকপ্টারগুলো নদী ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তিমুরেসহ ভাটির এলাকায় ক্যামেরা ও পানির স্তর মাপার সেন্সর বসানোর পরিকল্পনাও করছে নেপাল সরকার।
কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পাওয়ান ভট্টরাই আল-জাজিরাকে বলেন, প্রাকৃতিক বাঁধ হ্রদ (ব্যারিয়ার লেক) সৃষ্টি হওয়া ঠেকানো সম্ভবত সম্ভব ছিল না। তবে স্যাটেলাইটে নজরদারি, নদীর প্রবাহ ও নতুন হ্রদ তৈরির দ্রুত শনাক্তকরণ, তাৎক্ষণিক সতর্কতা এবং নেপাল-চীনের মধ্যে শক্তিশালী আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা থাকলে (বুধবারের) ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেত। তাঁর মতে, নতুন তৈরি হওয়া হ্রদটি নিরাপদভাবে পানি কমানোর সুযোগ থাকলে তা করা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং নিচু এলাকার মানুষকে সময়মতো সরিয়ে নেওয়াই এখন ঝুঁকি কমানোর প্রধান উপায়।
উদ্ধারকাজে হাজারো কর্মী
বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া জনপদগুলোতে হেলিকপ্টার দিয়ে উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে। জরুরি ত্রাণও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নেপালের সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট জানায়, ৪ হাজার ৪০০-এর বেশি পুলিশ সদস্যকে উদ্ধারকাজে মোতায়েন করা হয়েছে। নেপালের সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশও অভিযানে যুক্ত আছে। নুয়াকোট, রাসুয়া ও ধাদিংয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ১ হাজার ৪৭৩ জনকে উদ্ধার বা প্রাথমিক সহায়তা দিয়েছে।
রাস্তা ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় অনেক এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই হেলিকপ্টারের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
নেপালের পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, রাসুয়ার বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ১১৭ জন বিদেশি পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৮৫ জন ভারতীয়, ১৬ জন চীনা, ৯ জন দক্ষিণ কোরীয়, ২ জন মার্কিন ও ২ জন ইতালীয়। উদ্ধার হওয়া তিনজনের জাতীয়তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
‘আমার জন্য অপেক্ষা করার কেউ নেই’
নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে অনেকে এখন বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ভাটির জেলাগুলোতে যাচ্ছেন। বিশেষ করে চিতওয়ানে মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সেখানে স্বজনদের ভিড় হচ্ছে। কেউ সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন নিখোঁজ স্বজনের ছবি, কেউ হাসপাতাল ও অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণকেন্দ্রের সামনে অপেক্ষা করছেন।
রাসুয়া থেকে বৃহস্পতিবার শেষ দিকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের একজন ছিলেন দিবগা তামাং। তাঁকে আরও তিনজনের সঙ্গে হেলিকপ্টারে করে নুয়াকোটের একটি সেনাশিবিরে নেওয়া হয়। সেখানে নিজের স্বজন ও পরিচিতদের হারানোর কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের সবাই চলে গেছে। তারা মারা গেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করার মতো আর কেউ নেই। সবকিছু, সবাই ভেসে গেছে।’
ত্রাণ ও পুনর্গঠনে অর্থের প্রয়োজন
উদ্ধারকাজের পাশাপাশি ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য দ্রুত অর্থ জোগাড় করছে নেপাল সরকার। কাঠমান্ডু পোস্ট জানায়, চলতি অর্থবছরের বাজেটে আগে থেকে বরাদ্দ থাকা বিভিন্ন খাত থেকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় দুই হাজার কোটি নেপালি রুপি জরুরি তহবিলে ব্যবহার করা যাবে। তবে মোট ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনো পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। তাই দেশ-বিদেশের সরকার ও সংস্থার কাছ থেকেও অতিরিক্ত সহায়তা চাওয়া হচ্ছে।
ভারত, চীন ও বিশ্বব্যাংক সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উৎস থেকে আড়াই হাজার কোটি নেপালি রুপি পর্যন্ত জরুরি সহায়তা জোগাড়ের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। চীন নগদ সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে। ভারত জরুরি ত্রাণসামগ্রীর তালিকা চেয়েছে এবং কিছু সামগ্রী ইতিমধ্যে পৌঁছেছে।
ত্রাণে অনিয়ম ঠেকাতে সরকার ওয়ান-ডোর-পলিসি বা এক দরজা নীতি চালু করেছে। অর্থাৎ অর্থ ও ত্রাণসামগ্রী প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলের মাধ্যমে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নেপালের সাবেক জাতীয় পুনর্গঠন কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী গোবিন্দ রাজ পোখরেল বলেন, এবারের ক্ষয়ক্ষতি ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের চেয়েও বেশি হতে পারে। তাঁর মতে, রাসুয়ায় ব্যাপক অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করতে শুধু দেশের অর্থ দিয়ে হবে না। বিপুল পরিমাণ বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন হবে।