মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে তেমন কিছু বলছে না। বরং আরও ফ্লাইটে মিয়ানমারের আশ্রয়প্রার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া।

নথিভুক্ত নন, এমন নাগরিকদের দেশে ফেরত নেওয়ার এই প্রচেষ্টা সম্পর্কে কুয়ালালামপুরের মিয়ানমার দূতাবাস তাদের ফেসবুক পেজে নিয়মিত পোস্ট দিচ্ছে। এসব পোস্টে মিয়ানমারগামী ফ্লাইটে থাকা যাত্রীদের ছবি জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। ছবিতে আপাতদৃষ্টে যাত্রীদের ‘খুশি’ মনে হয়। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার অভিবাসন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কুয়ালালামপুরের মিয়ানমার দূতাবাসের কর্মীদের ছবিও ফেসবুকে দেওয়া হচ্ছে।

মালয়েশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শরণার্থীদের স্বাগত জানায় না। তারা জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক কনভেনশন ও প্রটোকলে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়।

নিজ দেশে ফিরলে ঝুঁকিতে পড়তে পারেন, এমন আশ্রয়প্রার্থীদের শরণার্থীর মর্যাদা দেওয়া-সংক্রান্ত জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের নিয়মকে মালয়েশিয়া স্বীকৃতি দেয়নি।

তা সত্ত্বেও মালয়েশিয়ায় ১ লাখ ৮৫ হাজার নিবন্ধিত শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী আছেন। এর বাইরে আরও অনেক লোক আছেন, যাঁরা নিবন্ধিত নন, যাঁদের বেশির ভাগই মিয়ানমার থেকে যাওয়া।

মালয়েশিয়ায় এক লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম আশ্রয় নিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ফিল রবার্টসন বলেন, রোহিঙ্গা, চিন, কাচিনসহ হুমকিতে থাকা মিয়ানমারের বেশ কিছু সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠেছে মালয়েশিয়া।

ফিল রবার্টসন বলেন, মালয়েশিয়ায় থাকা এসব সম্প্রদায়ের সদস্য ও তাঁদের নেটওয়ার্ক নতুন আগত মানুষদের সুরক্ষায় সহায়তা দেয়। ইউএনএইচসিআর থেকে শরণার্থীর মর্যাদা ও সুরক্ষা পাওয়ার প্রচেষ্টায় তারা সমর্থন দেয়।

কিয়াওয়ের স্বজন স শোয়ে মায়া। তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে মালয়েশিয়ায় আছেন। তিনি বলেন, কিয়াও গত বছর মালয়েশিয়ায় এসেছিলেন।

গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন সরকার উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে দেশটির সামরিক জান্তা। সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে মিয়ানমারে শুরু হয় আন্দোলন-সংঘাত, যা দেশটির বেশির ভাগ অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কিয়াও মিয়ানমার থেকে পালান।

সম্প্রতি কিয়াওয়ের স্ত্রীও মালয়েশিয়ায় আসেন। তাঁদের বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইনে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে ভয়ংকর লড়াইয়ের সাক্ষী এই রাখাইন। কিয়াওয়ের দুই ছেলে ও তাঁর মা এখন রাখাইনে আছেন।

মায়া বলেন, সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে মিয়ানমারজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আইন অমান্য আন্দোলনে কিয়াও জড়িত ছিলেন কি না, সে কথা তাঁকে তিনি জিজ্ঞাসা করেননি।

সামরিক অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করে, নাকি রাখাইনে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের কারণে কিয়াও নৌবাহিনী ত্যাগ করেছেন, তা–ও জানেন না মায়া।

কিয়াও পালিয়ে মালয়েশিয়ায় আসার পর রাজধানী কুয়ালালামপুরের কাছে ছিলেন। তিনি আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে ইউএনএইচসিআরের কাছে নাম জমা দিয়েছিলেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ‘বিবেচনাধীন’ কার্ড পাওয়ার আশা করছিলেন।

অভ্যুত্থানবিরোধী হাজারো ব্যক্তিকে কারাগারে পুরেছে মিয়ানমারের জান্তা। এ অবস্থায় দেশটির নৌবাহিনী ত্যাগ করে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেওয়া কিয়াওয়ের শরণার্থীর মর্যাদা পাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা ছিল।

মায়া বলেন, গত ২১ সেপ্টেম্বর কিয়াও একটি কল পেয়েছিলেন। ফোনকলে তাঁকে বাইরে এসে তাঁর ইউএন কার্ড সংগ্রহ করতে বলা হয়েছিল। আসলে এই ফোনকল ছিল একটা ফাঁদ। স্ত্রীসহ কিয়াওকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়। ৬ অক্টোবর তাঁরা ইয়াঙ্গুনে পৌঁছান। সেখানে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা এখন পৃথক কারাগারে বন্দী।

অতীতে মালয়েশিয়াকে শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের তেমন একটা ঘাঁটাতে দেখা যায়নি। কিন্তু গত ছয় মাসে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, দেশটি মিয়ানমারের প্রায় দুই হাজার আশ্রয়প্রার্থীকে ফেরত পাঠিয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনটির মতে, এসব মানুষ মিয়ানমারে ফেরার পর কী ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারেন, তা পর্যন্ত বিবেচনায় নেয়নি মালয়েশিয়া।

মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের ব্যাপারে মালয়েশিয়ার যে অবস্থান, তার সঙ্গে দেশটির আশ্রয়প্রার্থীদের প্রতি কুয়ালালামপুরের বর্তমান কট্টর মনোভাবের মিল পাওয়া যায় না।

মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন আবদুল্লাহ একজন সাবেক মানবাধিকারকর্মী। মিয়ানমারের জান্তাবিরোধীরা তাঁকে আসিয়ানে তাঁদের অন্যতম সেরা বন্ধু বলে মনে করেন। অথচ, তাঁর দেশের কর্তৃপক্ষ এখন মিয়ানমারের আশ্রয়প্রার্থীদের ফেরত পাঠাচ্ছে।

মালয়েশিয়া সরকারের এমন আচরণকে একই বিষয়ে দ্বৈতনীতি বলে অভিহিত করেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ফিল রবার্টসন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একদিকে মিয়ানমারের জান্তাকে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে ও সহিংসতা বন্ধ করতে বলছে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অপর দিকে, মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অভিবাসন বিভাগ শরণার্থীদের ফেরত পাঠাতে মিয়ানমার দূতাবাসের সঙ্গে কাজ করছে।

রবার্টসন বলেন, মালয়েশিয়ায় থাকা বিপুল শরণার্থী ও অভিবাসী করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে বলে দেশটির জনসাধারণ আশঙ্কা প্রকাশ করে। এমন প্রেক্ষাপটে শরণার্থীদের প্রতি মালয়েশিয়ার শিথিল মনোভাব বদলে যায়। আগামী মাসে মালয়েশিয়ায় সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচন সামনে রেখে একটি জনপ্রিয় পদক্ষেপ হিসেবে দেশটির সরকার গণহারে আশ্রয়প্রার্থী মানুষদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে।

আশ্রয়প্রার্থীদের নিজ দেশে পাঠানোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হামজাহ জয়নুদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিবিসি। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।