পাকিস্তান–শাসিত কাশ্মীরে আসলে কী হচ্ছে

পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের স্থানীয় আইনসভার প্রথম দফার ভোটের সময় অস্থিরতা দেখা দেয়। এর প্রতিবাদে বুধবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। ২৯ জুলাই ২০২৬ছবি: এএফপি

পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের (পিএকে) রাওয়ালাকোট শহরের মূল বিক্ষোভস্থল থেকে খুব বেশি দূরে নয় ডা. আনোয়ারের অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রটি। এখানকার একটি বাড়তি শোবার ঘরকে ওষুধের মজুতকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাইরে লাল রঙের একটি ত্রিপল টানানো। তার নিচে রাখা একটি বিছানা।

সেই বিছানায় শুয়ে আছেন শাফকাত হোসেন। তাঁর বুকে গুলি লেগেছে। তিনি যে চাদরের ওপর শুয়ে আছেন, সেটি আগে আসা আহত রোগীদের রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে। তিনি মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।

গত দুই মাসে এই অঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির (জেএএসি) বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হয়েছেন।

প্রায় ৪৫ লাখ মানুষের বসবাস এই অঞ্চলে। বর্তমানে এখানে নির্বাচন হচ্ছে।

পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর (পিএকে) কর্তৃপক্ষের দাবি, রাওয়ালাকোট শহরে ঢোকার রাস্তাগুলো আটকে দিয়েছে জেএএসি। বিবিসির প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট

প্রথম সংবাদমাধ্যম হিসেবে রাওয়ালাকোটে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে বিবিসি। তারা এই বিক্ষোভের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে থাকা মানুষদের সঙ্গে কথা বলেছে।

ডা. আনোয়ার (নিরাপত্তার স্বার্থে এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত বেশির ভাগ মানুষের মতো তাঁর নামও পরিবর্তন করা হয়েছে) বিবিসিকে বলেন, ‘প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ওষুধ ও সরঞ্জাম আমাদের আছে। আমরা রক্তপাত বন্ধ করা, ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ বাঁধা এবং শরীরে অগভীরভাবে আটকে থাকা গুলি বের করতে পারি। কিন্তু যাঁদের বুক, পেট, মাথা বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে গুরুতর আঘাত রয়েছে, তাঁদের উন্নত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন।’

আনোয়ার আরও বলেন, ‘এমনকি একসঙ্গে এ রকম অনেক রোগী চলে এলে বড় হাসপাতালগুলোও হিমশিম খাবে।’

এই চিকিৎসক জানান, গত ২৭ জুলাইয়ের পর থেকে তাঁর এই অস্থায়ী কেন্দ্রে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন গুরুতর আহত রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তিনি নিজে গুলিবিদ্ধ ১৫ থেকে ২০ জনকে চিকিৎসা দিয়েছেন।

বিক্ষোভকারীরা মূল হাসপাতালে যেতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ তাঁদের ভয়, তাঁরা গ্রেপ্তার বা গুলিবিদ্ধ হতে পারেন।

কর্তৃপক্ষ বলেছে, এমন দাবির কোনো সত্যতা নেই।

চিকিৎসক বলেন, ‘নিহত বা গুরুতর আহত হওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই তরুণ। তাঁদের বয়স ১৫-১৬ থেকে ৩২-৩৫ বছরের মধ্যে। ৪০ বছরের বেশি বয়সী রোগী আমি খুব কমই দেখেছি।’

শাফকাত হোসেনের বিছানার পাশেই বসে ছিলেন তাঁর বন্ধু আলী। গায়ের শাল দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছছিলেন তিনি।

ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেন আলী। এরপর তিনি বলেন, ‘আমরা কেবল সাধ্যের মধ্যে আটার দাম, বিদ্যুৎ আর আমাদের মৌলিক অধিকারগুলো চেয়েছিলাম। এর বদলে আমাদের ভাইদের হত্যা করা হচ্ছে। আমাদের অপরাধ কী ছিল? কেন আমাদের ওপর তাজা গুলি ছোড়া হচ্ছে?’

জেএএসির বিক্ষোভকারীরা বলছেন, বিদ্যুতের দাম, শিক্ষা, চিকিৎসাসেবাসহ নিজেদের অধিকার আদায়েই তাঁদের এই আন্দোলন। গত অক্টোবরে পাকিস্তান ও পিএকে সরকারের সঙ্গে তাঁদের একটি চুক্তি সই হয়েছিল। সেটি তাঁদের সহায়তার জন্যই করা হয়েছিল। জেএএসি বলছে, সেই চুক্তি বাস্তবায়ন করা হয়নি।

তবে স্থানীয় সরকার এর সঙ্গে একমত নয়। তাদের দাবি, এই গোষ্ঠীটি সশস্ত্র। চলমান নির্বাচন বানচাল করতেই তারা এসব করছে। তাই বিক্ষোভকারীদের আঞ্চলিক রাজধানী মুজাফফরাবাদ অভিমুখে পদযাত্রা করতে দিতে রাজি নয় সরকার।

গত জুনে জেএএসিকে নিষিদ্ধ করা হয়। তাদেরকে বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তবে এই আখ্যা দেওয়াকে প্রত্যাখ্যান করেছে জেএএসি। তাদের দাবি, তারা শান্তিপূর্ণ। আর বিদেশে থাকা পিএকে সম্প্রদায়ের কাছ থেকে তারা অর্থ পেলেও, ভারত তাদের কোনো অর্থ দেয় না।

আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর আইনসভার দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন এক নারী। মুজাফফরাবাদ, পাকিস্তান। ২ আগস্ট ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

এই গোষ্ঠীটি বলছে, তারা নিজেরা কোনো সহিংসতা শুরু করেনি, বরং তারাই এর শিকার। পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীই তাদের ওপর গুলি চালিয়েছে।

ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় এবং রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ বা পাহারায় থাকায় তথ্য পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শহরে প্রবেশের পর বিবিসির দল বেশ কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে। তারা জানিয়েছে, বিক্ষোভে অংশ নিতে গিয়ে গুলিতে তারা তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছে।

আসমা নামের এক নারী জানান, তাঁর একমাত্র ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর শোনার সময় তিনি নিজেও বিক্ষোভস্থলে ছিলেন।

ওই নারী বলেন, ‘আমরা কেবল আমাদের অধিকার চাইছিলাম। আমরা তো সন্ত্রাসী নই। কোনো মায়ের পক্ষে এর চেয়ে ভালো ছেলে চাওয়া সম্ভব নয়।’

আসমা আরও বলেন, ‘আমার ছেলে জানত, এতে ঝুঁকি আছে। কিন্তু সে বিশ্বাস করত, ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানোটা জরুরি। সে সব সময় বলত, ন্যায়সংগত কারণে জীবন দেওয়াটা সম্মানের ব্যাপার।’

সালমান নামের এক ব্যক্তি তাঁর ভাইকে হারিয়েছেন।

সালমান বলেন, ‘পরিবারে সে ছিল সবার ছোট আর সবার আদরের। এটা আমাদের জন্য এক বিরাট ক্ষতি।’

‘তবে একই সঙ্গে আমি গর্ববোধ করি, মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে সে নিজের জীবন দিয়েছে। সে কারও সঙ্গে মারামারি বা কাউকে আক্রমণ করেনি,’ যোগ করেন সালমান।

আইয়ুব একসময় সশস্ত্র বাহিনীতে চাকরি করতেন। তিনিও তাঁর ছেলেকে হারিয়েছেন। তবে তিনি পাকিস্তান সরকার বা সেনাবাহিনীকে দোষারোপ করেননি। এর বদলে তিনি পিএকে সরকারের দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি বলেন, তারাই আধা সামরিক বাহিনীকে ডেকে এনেছে।

আইয়ুব বলেন, ‘আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। আমি জেনারেল জিয়া-উল-হক এবং জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সামরিক শাসনের আমল দেখেছি। কিন্তু এখন যা ঘটছে, এমনটা আমি জীবনেও দেখিনি। আমার মতে, এটি চরম অবিচার।’

আইয়ুব বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো অন্যায় করেনি। বিক্ষোভকারীদের কেউই কোনো অন্যায় করেনি।’

পিএকে সরকার বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে—এমন অভিযোগ তারা প্রত্যাখ্যান করছে। তারা বলছে, যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়েছে, জননিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলেছে বা আইনি কর্তৃপক্ষের কাজে বাধা দিয়েছে, পুলিশ কেবল তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিয়েছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে খাবারের সংকট রয়েছে। অনেক বিক্ষোভকারী নিজেদের কাছে থাকা খাবার একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিচ্ছিলেন। বেশির ভাগ দোকানপাট ছিল বন্ধ। কয়েকজন বিবিসিকে জানান, মোটরসাইকেলের পেছনে করে চালের বস্তা লুকিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

জেএএসির মূল কমিটির সদস্য ওমর নাজির। বিবিসির প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট

গাছ ফেলে শহরে ঢোকার কিছু রাস্তা আটকে দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, জেএএসি এই কাজ করেছে। প্রধান সড়কের অন্যান্য প্রবেশমুখে এখন নিরাপত্তাচৌকি বসানো হয়েছে।

পিএকে সরকার বলেছে, রাওয়ালাকোটে খাবার বা চিকিৎসা সরঞ্জাম ঢোকায় তারা বাধা দিচ্ছে—এমন কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা। বরং তারা এগুলো ভেতরে নিতে সাহায্য করছে।

কর্তৃপক্ষ বারবার বলেছে, জেএএসি একটি সহিংস গোষ্ঠী। তারা ড্রোনে তোলা কিছু ভিডিও প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, ওই ভিডিওতে ছাদে বন্দুক হাতে যাঁদের দেখা যাচ্ছে, তাঁরা জেএএসির সদস্য।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কর্মকর্তারা কিছু বন্দুক দেখিয়েছেন। তাঁরা বলেন, এগুলো ওই গোষ্ঠীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁরা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হতাহত হওয়ার খবরও জানিয়েছেন।

কর্মকর্তারা আরও বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে এক ব্যক্তি স্বীকার করেছেন, আধা সামরিক বাহিনীর একেকজন কর্মকর্তাকে হত্যার জন্য তাঁকে এক কোটি রুপি পুরস্কার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

জেএএসির মূল কমিটির সদস্য ওমর নাজির এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বর্তমানে রাওয়ালাকোটেই অবস্থান করছেন। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রাণ হারিয়েছেন।

ওমর নাজির বলেন, ‘দেখুন, হয়তো এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আমি সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না।’

নাজির আরও বলেন, ‘তবে আমার বিশ্বাস, তাদেরই নিয়ন্ত্রণে থাকা নির্দিষ্ট কিছু লোককে আমাদের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমন লোক নিশ্চিতভাবেই আমাদের মধ্যে উপস্থিত ছিল।’

নাজিরের দাবি, ‘আমি মনে করি, নিজেদের বয়ানের যৌক্তিকতা প্রমাণ করার জন্যই তারা নিজেরা এসব কাজ করে থাকতে পারে। আমি নিশ্চিত করে কোনো দাবি করছি না, তবে আমাদের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো সহিংসতা চালানো হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই।’

নিজেদের মধ্যে অন্য লোক ঢুকে পড়ার এই দাবির পক্ষে নাজির কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ বলেছে, জেএএসি তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

জেএএসির যেসব বিক্ষোভে আমরা উপস্থিত ছিলাম, সেখানে বিবিসির দল কোনো অস্ত্র বা গোলাগুলির চিহ্ন দেখেনি। তবে রাতে বারবার গুলির শব্দ শোনা গেছে। কে বা কারা, কী লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছিল, তা স্পষ্ট ছিল না।

চারপাশের পরিবেশ ছিল উত্তেজনাপূর্ণ ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা। কখন পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে মোড় নেবে, তা কেউই জানে না।

নাজির বলেন, তাঁদের গোষ্ঠী আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবে আপাতত আরও বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।