নেপালে জেন-জি আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত ওলি আবার নির্বাচনে, কোন সমীকরণে
সময়টা ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। নেপালে জেন–জি আন্দোলনে সরকার পতন হয়। পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি। দেখা দেয় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। ওই আন্দোলনের ছয় মাস হওয়ার আগেই আগামীকাল বৃহস্পতিবার হিমালয়–কন্যা নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত কে পি শর্মা ওলিও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এই নির্বাচনে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নেপালজুড়ে ব্যাপক হারে জেঁকে বসা দুর্নীতির রাশ টানা ও বেকারত্ব নিরসনের বিষয়গুলো এবারের নির্বাচনে বড় প্রভাবক হতে পারে। সেই সঙ্গে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্বাচনে মূল শক্তি কারা
বেশ কিছু রাজনৈতিক দল ও কয়েকজন রাজনীতিবিদ নেপালের এবারের নির্বাচনে আলাদা করে নজর কেড়েছেন। তাই ভোটের এ লড়াইয়ে তাঁদের দিকে আলাদা দৃষ্টি থাকবে। তাঁদের একজন ৩৫ বছর বয়সী তরুণ রাজনীতিক বালেন্দ্র শাহ। ‘বালেন শাহ’ নামে পরিচিত তিনি। একসময় তিনি ছিলেন র্যাপার। পরে রাজধানী কাঠমান্ডুর মেয়র হয়েছিলেন।
র্যাপার থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া বালেন শাহ ভোটের মাঠে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলির মুখোমুখি হচ্ছেন। ঝাপা–৫ আসনে লড়বেন তাঁরা। এই আসন ওলির দীর্ঘদিনের নিরাপদ দুর্গ হিসেবে পরিচিত।
বালেন শাহ এবারের নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি) হয়ে লড়ছেন। ২০২২ সালের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আরএসপি চতুর্থ অবস্থানে ছিল। বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, এবারের নির্বাচনে দলটি আরও ভালো করতে পারে। দলটির পক্ষ থেকে বালেন শাহকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
এবারের সাধারণ নির্বাচনে আরেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নেপালি কংগ্রেস। দলটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবার পরিবর্তে ৪৯ বছর বয়সী গগন থাপাকে নেতা নির্বাচিত করেছে। কাজেই গগন থাপা আরেকজন প্রভাবশালী প্রার্থী।
ভোটের লড়াইয়ে থাকা অন্য প্রধান পক্ষগুলোর মধ্যে রয়েছে কে পি শর্মা ওলির দল নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (ইউএমএল)। দলটি সর্বশেষ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছিল। এ ছাড়া মাওবাদী নেতা পুষ্প কমল দহল প্রচণ্ডর নেতৃত্বাধীন নেপালি কমিউনিস্ট পার্টিও এবারের নির্বাচনে প্রভাবশালী একটি পক্ষ।
নজর ঝাপা–৫ আসন
নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় ঝাপা অঞ্চলের পাঁচটি সংসদীয় আসনের একটি ঝাপা-৫। আসনটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি। তবে এবার সেখানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন বালেন শাহ। কাজেই ৫ মার্চের নির্বাচনে এই আসন অন্যতম প্রধান রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
সেই সঙ্গে কাঠমান্ডু উপত্যকার ১৫টি আসনের দিকে সবার বিশেষ নজর থাকবে। কারণ, শহুরে ভোটারদের সমর্থন কোন দিকে ঝুঁকছে, সেটার ইঙ্গিত এসব আসন থেকে মিলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রভাবক হবে যেসব বিষয়
নেপালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরের জেন–জি আন্দোলনে দেশটিতে ৭৭ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট, সুপ্রিমকোর্ট, সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি আর বেসরকারি ভবন পুড়িয়ে দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করার ঘটনায় বড় পরিসরে সহিংস আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে লাগামহীন দুর্নীতি, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা নিয়ে আগে থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। এ বিষয়গুলো আগামীকালের সাধারণ নির্বাচনেও প্রভাবক হয়ে উঠবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, সুশাসন, বেকারত্ব কমিয়ে আনা—বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে মোটাদাগে এসব বিষয়ে বিশেষ জোর দিয়েছে। বিগত সরকারের পতনের পেছনে যেসব বিষয় গণ–অসন্তোষ উসকে দিয়েছিল, সেসবকে গুরুত্ব দিতে দলগুলো এ কৌশল বেছে নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় পদে আসীন ব্যক্তিদের সম্পদের বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে নেপালি কংগ্রেস।
ভূরাজনৈতিক প্রভাব
নেপালের এবারের সাধারণ নির্বাচনে ভূরাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দেশটির রাজনীতিতে ঐতিহাসিকভাবে প্রতিবেশী ভারতের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। নেপালের এবারের নির্বাচনও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে দিল্লি।
অতীতে নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সঙ্গে ভারতের টানাপোড়েনের সম্পর্ক ছিল। এর কারণ, দিল্লি মনে করে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে কে পি শর্মা ওলি ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে সক্রিয় ছিলেন।
নেপালে বেইজিংয়ের প্রভাবও ব্যাপক। চীন এবারের নির্বাচনের দিকে সতর্ক নজর রাখছে। চীনের প্রত্যাশা, নেপালের পরবর্তী যেকোনো সরকার আগামী দিনে তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’সহ অন্যান্য স্বার্থের অনুকূলে থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রও এবারের নির্বাচনে ভূমিকা রাখছে। যদিও কৌশলগত স্বার্থের প্রশ্নে ওয়াশিংটনের অবস্থান দিল্লির কাছাকাছি।
ফলাফল কবে
নেপালের নির্বাচন কমিশন ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬৫ সংসদীয় আসনের ফলাফল ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে ব্যালট বাক্স সংগ্রহ করতে সাধারণত এক দিন সময় লেগে যায়।
দায়িত্বে থাকা প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাম প্রসাদ ভান্ডারি স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ১১০টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করতে আরও দু–তিন দিন সময় লাগতে পারে।
নেপালের পার্লামেন্টে মোট আসন ২৭৫টি। তার মধ্যে ১৬৫টি আসনে জয়–পরাজয় নির্ধারিত হয় সরাসরি ভোটে, অর্থাৎ ওই আসনের প্রতিটিতে যে দলের প্রার্থী বেশি ভোট পান, তিনি জয়ী হন। অন্য ১১০টি আসন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত মোট ভোটের অনুপাতে বণ্টিত হয়।