অস্ট্রেলিয়ায় স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার অভিযোগ বাংলাদেশির বিরুদ্ধে
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক ব্যক্তি তাঁর স্ত্রী ও অটিজমে আক্রান্ত দুই ছেলেকে হত্যা করেছেন। কয়েক মাস আগে থেকেই খুব সতর্কভাবে তিনি এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেছিলেন। দেশটিতে ঘটে যাওয়া একই ধরনের আরেকটি হত্যাকাণ্ড থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি এ ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।
৪৭ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি গতকাল সোমবার রাতে নিজেই অস্ট্রেলিয়ার জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনি অপারেটরকে বলেন, ‘আমি আমার সন্তান আর স্ত্রীকে ছুরি দিয়ে হত্যা করেছি।’
পরে সিডনির ক্যাম্পবেলটাউনে ওই ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে পুলিশ তাঁর ৪৬ বছর বয়সী স্ত্রী এবং ৪ ও ১২ বছর বয়সী দুই ছেলের মরদেহ উদ্ধার করে।
অস্ট্রেলিয়ার দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ড পত্রিকার এক প্রতিবেদনে পুলিশের বরাত দিয়ে জানানো হয়, তিনজনের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতসহ গুরুতর জখমের চিহ্ন ছিল। ঘটনার নৃশংসতার কারণে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, এটি অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাগুলোর একটি।
ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগে তিনটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। আইনি কারণে তাঁর নাম প্রকাশ করা হয়নি।
ধারণা করা হচ্ছে, ওই ব্যক্তি বাসায় থেকে দুই সন্তানের দেখাশোনা করতেন। দুই শিশুরই মানসিক বিকাশজনিত সমস্যা ছিল। তাঁর স্ত্রী চাকরি করতেন। প্রায় এক দশক আগে পরিবারটি বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমায়।
আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, পার্থে ঘটে যাওয়া একটি হত্যাকাণ্ড–আত্মহত্যার ঘটনার বিষয়ে ওই ব্যক্তি জানতেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে অটিজমে আক্রান্ত সন্তানদের দেখাশোনার চাপ সামলাতে না পেরে সেখানে এক দম্পতি নিজেদের সন্তানদের হত্যা করে পরে আত্মহত্যা করেছিলেন।
পুলিশের অভিযোগ, সেই ঘটনার সংবাদ পড়ে ক্যাম্পবেলটাউনের এই বাবাও একই ধরনের হত্যার পরিকল্পনা শুরু করেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ক্যানসার ধরা পড়ার পর থেকে এই ব্যক্তি হতাশায় ভুগছিলেন বলে পুলিশকে জানান। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে তিনি রোগমুক্ত ছিলেন।
আজ মঙ্গলবার ক্যাম্পবেলটাউন লোকাল কোর্টে মামলার সংক্ষিপ্ত শুনানিতে হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ওই ব্যক্তিকে হাজির করা হয়নি। তিনি জামিনের আবেদনও করেননি।
আদালতের বাইরে ওই ব্যক্তির আইনজীবী জাওয়াদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশি হেফাজতে তাঁর মক্কেল মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক একটি ঘটনা। তিনি ভীষণ ভেঙে পড়েছেন।’
গতকাল রাতে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট মাইকেল মোরোনি বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকর্মীরা ‘অত্যন্ত ভয়াবহ সহিংসতার’ চিত্র দেখেছেন। তিনি জানান, বাড়ির ভেতর থেকে এমন কয়েকটি বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে, যেগুলো দিয়ে নিহত ব্যক্তিদের শরীরে জখম করা হয়ে থাকতে পারে। তবে বাড়িতে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া যায়নি।
মোরোনি বলেন, ওই ব্যক্তি আগে কখনো পুলিশের নজরে আসেননি এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের রেকর্ডও ছিল না। পরিবারটির সঙ্গে কমিউনিটিজ অ্যান্ড জাস্টিস বিভাগেরও আগে কোনো যোগাযোগ ছিল না।
মাইকেল মোরোনি বলেন, ‘আমি জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই, নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারগুলোর একটি হচ্ছে পারিবারিক সহিংসতা। এ ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত থাকবে।’
তদন্ত চলাকালে পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তির বাড়ির আশপাশের সড়ক ঘিরে ফেলে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলেন। হামলার সময় বাড়ির ভেতরে অন্য কেউ ছিলেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এক প্রতিবেশী সাংবাদিকদের বলেন, তিনি প্রায়ই শিশু দুটিকে বাড়ির বাইরে খেলতে দেখতেন। শিশুগুলো খুব হাসিখুশি ছিল।
আরেক প্রতিবেশী বলেন, পারিবারিক সহিংসতায় হত্যার খবর সব সময়ই তাঁকে হতবাক করে। কিন্তু যখন সেটা নিজের এলাকাতেই ঘটে, তখন বিশ্বাস করা আরও কঠিন হয়ে যায়।
পাশের আরেক বাসিন্দা বলেন, ফুল কেনার মতো টাকা তাঁর কাছে ছিল না। তাই নিজের বাগান থেকে ফুল কেটে ঘটনাস্থলে রেখে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘কীভাবে কেউ এটা করতে পারে? ওরা তো শিশু, একদমই শিশু।’
নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রিমিয়ার ক্রিস মিন্স বলেন, এ মর্মান্তিক হত্যার ঘটনায় মানুষ যেমন স্তম্ভিত ও শোকাহত, তিনিও তেমনি স্তম্ভিত। তিনি বলেন, আগামী জুনে রাজ্য বাজেটে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
আজ ক্রিস মিন্স বলেন, ‘আমরা পারিবারিক সহিংসতা মোকাবিলায় ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি সরাসরি সামনের সারির সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘এটুকুই যথেষ্ট নয়, মানুষ সেটাই বলছে।’
এর কয়েক দিন আগেই ‘অপারেশন আমারক’ নামে পারিবারিক সহিংসতাবিরোধী বিশেষ অভিযানে নিউ সাউথ ওয়েলসজুড়ে ৯৯৩ জনকে গ্রেপ্তার ও অভিযুক্ত করা হয়েছে। চার দিনের ওই অভিযানে দুই হাজারের বেশি অভিযোগ আনা হয়েছে।