১১ বছর পর নেপালে বড় দুর্যোগ, নতুন করে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা

উদ্ধারের পর এক ব্যক্তিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। বুধবার নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলীতেছবি: রয়টার্স

নেপালের রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার নদীতীরবর্তী এলাকায় বুধবার সকালটা শুরু হয়েছিল আর দশটি দিনের মতোই। রাতে কোনো বৃষ্টি হয়নি। সকালের আকাশ ছিল পরিষ্কার, রৌদ্রোজ্জ্বল। স্থানীয় বাসিন্দারা দৈনন্দিন কাজে বেরিয়েছিলেন। কেউ বাজারে, কেউ কর্মস্থলে, কেউবা যাচ্ছিলেন সীমান্ত–পথের দিকে। কাঠমান্ডুর সঙ্গে তিব্বতের লাসাকে যুক্ত করা সড়কে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছিলেন পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরা।

কিন্তু সকাল গড়াতেই তিব্বতের দিক থেকে হঠাৎ বিপুল ঢলের সঙ্গে নেমে আসে বরফ, পাথর ও কাদার স্রোত। কয়েক মিনিটের মধ্যে চিরচেনা দৃশ্য বদলে যায় পুরোপুরি। ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ভাসিয়ে নিয়ে যায় সেই প্রবল ঢল।

ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নেপালে ৩৮৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় দেড় হাজার মানুষ। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭০০ জন বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতের নাগরিক।

আরও পড়ুন

জাতিসংঘ জানিয়েছে, নেপালে বন্যা-ভূমিধসের পর এ পর্যন্ত ৭৯৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকাজে ৩০ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ উদ্ধার অভিযানে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে আগ্রহ প্রকাশ করলেও নেপাল জানিয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

এদিকে চীনের তিব্বতেও ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তিব্বত ও নেপালের যে স্থানে হিমবাহ ও পাথরধস হয়েছে, সেখানে আগামী ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবার বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নেপালে ১১ বছর পর এটাই সবচেয়ে বড় দুর্যোগ। ২০১৫ সালের এপ্রিলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে দেশটিতে প্রায় ৯ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলেন।

নেপালের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিলেন, ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের বরফ ও পাথর ধসে পড়ে বন্যা হয়ে থাকতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, হিমবাহের বরফ ও পাথর ধসে পড়ার সময় যে কম্পন তৈরি হয়েছিল, সেটিই প্রথমে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে রেকর্ড হয়ে থাকতে পারে। ধসে পড়া বরফ, পাথর ও মাটি নদীর পানির সঙ্গে মিশে প্রবল ঢল তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ বন্যারূপে হাজির হয়।

নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী এলাকার একটি সড়ক ও বাড়িঘর কাদায় ঢেকে গেছে। ২৬ আগস্ট ২০২৬
ছবি: রয়টার্স
আরও পড়ুন

ভূমিধস ১০ ঘণ্টায় তিব্বত থেকে নেপালের ভাটিতে

কাঠমান্ডু পোস্ট–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের সেন্টার অব হাইড্রোলজি অ্যান্ড ওয়াটার রিসোর্সেস রিসার্চের ফ্লাড ফোরকাস্টিং ডিভিশনের কারিগরি প্রতিবেদনে বুধবারের বন্যার গতিপথ ও সময়ের একটি প্রাথমিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি কম্পন রেকর্ড করা হয়। এর ২৮ মিনিট পর, সকাল ৯টা ৫ মিনিটে কর্তৃপক্ষ খবর পায়, তিব্বতের দিক থেকে প্রবল ঢল ভোতেকোশি নদীতে প্রবেশ করেছে। সেখান থেকে ঢলটি ভোতেকোশি হয়ে ত্রিশূলী নদীতে নামে এবং দ্রুত ভাটির দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

ঢলের খবর পাওয়ার পরই নদীতীরবর্তী জনপদগুলোতে সতর্কবার্তা পাঠানো শুরু হয়। সকাল ৯টা ১৫ থেকে ৯টা ১৬ মিনিটের মধ্যে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ান জেলার নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের ছয় লাখের বেশি এসএমএস পাঠিয়ে সতর্ক করা হয়।

বেলা ১১টা ২৬ মিনিটে মালেখুর ফুরকে পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যায়। মাত্র ১৭ মিনিট পর, বেলা ১১টা ৪৩ মিনিটে বন্যার পানিতে ফুরকে সেতু ও আশপাশের স্থাপনা ভেসে যায়। বেলা একটার দিকে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হয়, ঢল মুগলিন এলাকা পার হয়ে গেছে। এরপর দেবঘাট পর্যন্ত ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়।

বেলা ৩টা ২০ মিনিটের দিকে ঢল নারায়ণী-দেবঘাট এলাকায় পৌঁছায়। এক ঘণ্টা পর, বিকেল চারটায় দেবঘাটে নদীর পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৫৭ মিটারে ওঠে। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে সেখানে পানির উচ্চতা কমতে শুরু করে।

প্রাথমিক হিসাবে, বন্যার সঙ্গে প্রায় দুই কোটি ঘনমিটার অতিরিক্ত পানি নেমে আসে। অর্থাৎ তিব্বতের দিক থেকে ভোতেকোশিতে প্রবেশের পর ঢলটি প্রায় ১০ ঘণ্টায় ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী পেরিয়ে দেবঘাটে পৌঁছে যায়।

আরও পড়ুন

বন্যা যেভাবে শুরু হয়

রয়টার্স ও কাঠমান্ডু পোস্ট জানায়, দুর্যোগের কারণ নিয়ে এখনো বিশ্লেষণ চলছে। তবে স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর ঢাল থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধস নেমে লহেন্দেখোলা নদীতে পড়ে। এতে লহেন্দে নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে গিয়ে একটি প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়। পরে সেই বাঁধ ভেঙে বিপুল পানি, বরফ, পাথর ও কাদার স্রোত প্রবল বেগে ভাটির দিকে নেমে আসে।

লাংটাং লিরুংয়ের উচ্চতা ৭ হাজার ২৪৫ মিটার। পর্বতটি পুরোপুরি নেপালের ভেতরে। সেখান থেকে নেমে আসা ধ্বংসাবশেষ লহেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। বর্ষার পানিতে সেখানে সাময়িক একটি হ্রদ তৈরি হওয়ার পর সেটি ভেঙে প্রবল স্রোত ভোতেকোশির দিকে নেমে আসে।

নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটিও বরফ ও পাথরের ধসকে বন্যার প্রধান সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে রাসুয়াগাধি সীমান্ত ক্রসিংয়ের প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে বড় ধরনের ধসের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন

সেকেন্ডে প্রায় ৫০ মিটার বেগে ধসের স্রোত

চীনের সরকারি ভূতত্ত্ববিদ গুও ঝাওচেং বলেন, উঁচু পার্বত্য এলাকায় বরফের ধস থেকে ধ্বংসাবশেষের এই প্রবাহ তৈরি হয়েছে। পথে সেটি পাথর ও কাদা সঙ্গে নিয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। স্রোতটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৫০ মিটার বেগে ছুটে যায় এবং চীনের অংশে তা ২০ কিলোমিটারের বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এত দ্রুত সবকিছু ঘটায় মানুষ নিজেদের রক্ষার তেমন সময় পাননি।

নেপাল রেডক্রস জানিয়েছে, কয়েকটি গ্রাম পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা

বন্যার তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করার বিষয়ে সতর্ক রয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তবে এর পেছনে উষ্ণতা বৃদ্ধির ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা। নিউজিল্যান্ডের আর্থ সায়েন্সেসের বিজ্ঞানী সাইমন কক্স বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উঁচু পর্বতে বরফ ও পাথর অস্থিতিশীল হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তাপমাত্রা বাড়লে বরফ গলার পানি বাড়ে এবং বরফ জমা-গলা ও বৃষ্টির ধরন বদলে যায়। এতে কোনো কোনো এলাকায় পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে বড় ধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তসরকারি সংস্থা আইসিআইএমওডির বিশেষজ্ঞ ফারুক আজমের মতে, ভারী তুষার গলা ও ভূকম্পন—এ দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবেও বরফ ও পাথরের ধস শুরু হতে পারে।

জাতিসংঘের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ বছরের সামান্য বেশি সময়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে নেপালের তুষারাবৃত পাহাড়ের মোট বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গলে গেছে। আগের দশকের তুলনায় সর্বশেষ দশকে নেপালের হিমবাহ গলার হার ৬৫ শতাংশ বেড়েছে।

কাদা-জলে তলিয়ে যাওয়া রাস্তায় হতাহত ও জীবিত ব্যক্তিদের সরিয়ে নিতে উদ্ধারকারীরা এক্সক্যাভেটর ব্যবহার করছেন। দেবঘাট, নুয়াকোট, নেপাল, ২৬ আগস্ট
ছবি: এএফপি
আরও পড়ুন

নতুন বন্যার আশঙ্কা

এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, নতুন করে তৈরি হওয়া একটি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে আটকে থাকা হ্রদ নিয়ে। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গিরং এলাকার উজানে ওই হ্রদে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছে। আগামী তিন দিনে সেখানে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমতে পারে। এতে প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে গিয়ে নতুন করে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, পানির প্রবাহ ১ সেপ্টেম্বরের দিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

আরও পড়ুন

স্বজনদের অপেক্ষা, চলছে উদ্ধার

নেপালে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী নদীতীর ও ভাটির এলাকায় নিখোঁজদের সন্ধান করছে। দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টারে করে খাবার, তাঁবু ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কাঠমান্ডুর হাসপাতালগুলোতেও নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে ভিড় করছেন মানুষ। ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে পুলিশ ডেস্কে নিখোঁজ ব্যক্তিদের নাম ও ছবি টানানো হয়েছে। কোনো অ্যাম্বুলেন্স এলেই স্বজনেরা ছুটে যাচ্ছেন এই আশায় যে হয়তো ভেতরে তাঁদের প্রিয়জন আছেন।

বন্যায় স্বজন হারানো ৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বারাল রয়টার্সকে বলেন, কাদার বিশাল ঢল তাঁর ঘরে ঢুকে পড়লে তিনি স্ত্রীকে ছাদে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তীব্র স্রোত তাঁর স্ত্রীর হাত ছিনিয়ে নেয়। এখনো কাদার নিচে স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়ার আশায় আছেন তিনি।

আরও পড়ুন