অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে নজর ঘোরাতেই কি পাকিস্তান–আফগানিস্তান সংঘাত

পাকিস্তান–আফগানিস্তান সীমান্তে গোলাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাড়িটি। গতকাল পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বাজৌর এলাকায়ছবি: এএফপি

সপ্তাহখানেক আগে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে শুরু হওয়া লড়াই এখন বড় আকার ধারণ করেছে। গত অক্টোবরে এই দুই দেশের মধ্যকার সংঘাতকে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা ‘মিনি ওয়ার’ বা নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তবে ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হওয়া বর্তমান লড়াই এতটাই তীব্র যে একে তাঁরা এখন ‘ওপেন ওয়ার’ বা প্রকাশ্য যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করছেন। 

কারণ, এই লড়াই এখন আর শুধু পদাতিক বাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নেই। সীমান্তে দুই দেশের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে। ইতিমধ্যে পাকিস্তান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিকা প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের অন্তত তিনটি শহরে পাল্টা ড্রোন হামলা চালিয়েছে আফগানিস্তান। আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তারা পাকিস্তানের ভেতরে একাধিক সামরিক স্থাপনায় আঘাত করেছে।

বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে একের পর এক জঙ্গি হামলা। বিশেষ করে ইসলামাবাদের মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং বাজৌরে সেনাচৌকিতে হামলা। দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার যে প্রচেষ্টা তৃতীয় কয়েকটি দেশ শুরু করেছিল, এই হামলার ফলে সেগুলোও ব্যর্থ হয়। শুরু হয় ‘ওপেন ওয়ার’।

পাকিস্তানের দাবি, কাবুল আফগান তালেবান বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে, যারা সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। এরপর আফগানিস্তানের ভেতরে গিয়ে তারা আশ্রয় নিচ্ছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের ২ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার সীমান্তের বিভিন্ন অংশ দিয়ে জঙ্গিরা পাকিস্তানে প্রবেশ করছে। 

পাকিস্তানের বরাবরের বক্তব্য, ১৮৯৩ সালে এই সীমান্ত (ডুরান্ড লাইন নামেও পরিচিত) নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। এটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত। পরিবর্তন করার কোনো উপায় নেই। অন্যদিকে আফগানরা এই সীমান্তকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেয় না। এর কারণ, ১৮ শতকের মাঝামাঝি আফগান সাম্রাজ্য বর্তমান পাকিস্তানের পূর্ব দিকেও বিস্তৃত ছিল। অবশ্য সে সময় পাকিস্তানের জন্ম হয়নি। আফগানদের দাবি, ওই অংশ তাদের। 

বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে একের পর এক জঙ্গি হামলা। বিশেষ করে ইসলামাবাদের মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং বাজৌরে সেনাচৌকিতে হামলা। দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার যে প্রচেষ্টা তৃতীয় কয়েকটি দেশ শুরু করেছিল, এই হামলার ফলে সেগুলোও ব্যর্থ হয়। শুরু হয় ‘ওপেন ওয়ার’।
রকেট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি তালেবান সেনাদের। গতকাল আফগানিস্তানের তোরখাম সীমান্তে
ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তানকে যদি এই দাবি মেনে নিতে হয়, তাহলে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশ আফগানিস্তানের হাতে তুলে দিতে হয়, বেলুচিস্তানেরও কিছুটা চলে যায়। এটা পাকিস্তানের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এই নিয়েই লড়াই। পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের যখন সম্পর্ক ভালো থাকে, তখন সীমান্ত নিয়ে বিবাদ সামনে আসে না। বর্তমানে পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক একেবারে তলানিতে ঠেকেছে।

সম্পর্কের সর্বশেষ এই অবনতির শুরুটা গত বছরের অক্টোবর মাসে আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরের পর থেকে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতিকে সার্বিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন আফগানিস্তান-পাকিস্তান সংঘাত বিশেষজ্ঞরা।

কাবুলে আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। আফগানিস্তানের একটি সরকারি সূত্র এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে, এ কথা যেমন ঠিক যে কিছু আফগান তালেবান আফগানিস্তানে আছে, তেমনি এটাও ঠিক যে প্রধানত পাকিস্তানের বসবাসকারী তালেবান বা পাকিস্তানি তালেবানরা এই হামলা মূলত চালাচ্ছে।

পাকিস্তানকে যদি এই দাবি মেনে নিতে হয়, তাহলে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশ আফগানিস্তানের হাতে তুলে দিতে হয়, বেলুচিস্তানেরও কিছুটা চলে যায়। এটা পাকিস্তানের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এই নিয়েই লড়াই।

২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান পূর্ব আফগানিস্তানের নানগারহার ও পাকতিতায় টিটিপি আস্তানা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। এর প্রতিবাদে ২৬ ফেব্রুয়ারি আফগান তালেবান পাল্টা স্থল অভিযান শুরু করে এবং দাবি করে যে তারা পাকিস্তানের বেশ কিছু সামরিক চৌকি দখল করেছে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সাধারণভাবে বক্তব্য, বিভিন্ন দেশ অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে জনগণের নজর ঘোরাতে বাইরের শত্রুর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে পাকিস্তান একাধিক অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে রয়েছে, সেই কারণে তারাই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে।

তালেবান কাবুলে ক্ষমতায় আসার পর থেকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পর্যায়ে হামলা (টিটিপি ও বালুচ স্বাধীনতাকামী) বেড়েছে। পাকিস্তানের সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের বক্তব্য, এর পেছনে ভারতের ভূমিকা রয়েছে। এই বক্তব্যকে ভারত সব সময় ভিত্তিহীন বলেছে। পাকিস্তানের ভেতরে ২০২২ সালে ইমরান খানকে সরানো, জেলে রাখা নিয়ে এবং তাঁর ওপর অত্যাচারের অভিযোগ নিয়ে পাকিস্তান সরকার অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, এই অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে সে দেশের মানুষের নজর সরাতেও নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা হয়েছে। পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদের একটা হাওয়া তৈরি করেছে অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরাতে। 

পাকিস্তানের সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের বক্তব্য, এর পেছনে ভারতের ভূমিকা রয়েছে। এই বক্তব্যকে ভারত সব সময় ভিত্তিহীন বলেছে।

অন্যদিকে সেই একই কথা আফগানিস্তান সম্পর্কেও খাটে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার ২০২৬ সালের আগস্টে পাঁচ বছর পূর্ণ করবে। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা তারা কিছুটা সংহত করতে পেরেছে। আত্মঘাতী হামলা, বোমা বিস্ফোরণ বা সংখ্যালঘুদের ওপর সরাসরি আক্রমণ প্রায় হচ্ছে না। কিন্তু মৌলিক সমস্যাগুলো তারা সমাধান করতে পারেনি, যার অন্যতম ভঙ্গুর অর্থনীতি। আফগানিস্তানের অর্থনীতির অবস্থা খুবই খারাপ।

প্রতি মার্কিন ডলার সমান ৬৬ আফগানির মুদ্রা হলেও তা দিয়ে অর্থনীতির চেহারা বোঝা সম্ভব নয়। অর্থনীতির সার্বিক উন্নতি হচ্ছে না। চরম দারিদ্র্য, বিশেষত খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে, যুবকদের অধিকাংশই কর্মহীন, তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিত্যনতুন আইন প্রণয়ন করছে সরকার, যার অধিকাংশই দমনমূলক এবং অনেক ক্ষেত্রে তা নারীদের বিরুদ্ধে। উত্তর আফগানিস্তানে উজবেক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সরকারের ছোটখাটো সংঘাত চলছে। এটাও কাবুলকে চাপে রাখছে।

প্রতি মার্কিন ডলার সমান ৬৬ আফগানির মুদ্রা হলেও তা দিয়ে অর্থনীতির চেহারা বোঝা সম্ভব নয়। অর্থনীতির সার্বিক উন্নতি হচ্ছে না। চরম দারিদ্র্য, বিশেষত খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে, যুবকদের অধিকাংশই কর্মহীন, তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে।

এই অবস্থায় এখন একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হলে তালেবান নেতৃত্বাধীন ইসলামি আমিরাতের সরকারের কিছুটা সুবিধাই হয়। আফগান সরকারের তরফে অবশ্য অভিযোগ করা হয়েছে যে তারা বারবার ইসলামাবাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মেটাতে চেয়েছিল, যা ইসলামাবাদ চায়নি। দুই দেশের মধ্যে অবশ্য গত কয়েক মাসে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে, অন্তত ছয়টি দেশের মধ্যস্থতায়। কিন্তু গতকাল শুক্রবার বিকেলে এই যাবতীয় মধ্যস্থতা ব্যর্থ হয়েছে বলেই ধরে নিতে হচ্ছে।