সরকারি সূত্র জানায়, ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দেশটিকে সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক সংকট থেকে বের করে আনতে নতুন প্রেসিডেন্ট শিগগিরই মন্ত্রিসভা গঠন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা গত বুধবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিক্রমাসিংহের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর তিনি বিক্রমাসিংহের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং কীভাবে দেশকে আরও দুর্দশা ও বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

গতকাল সাজিথ প্রেমাদাসা টুইট করে বলেন, ‘বিরোধী দল হিসেবে আমরা মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের প্রচেষ্টার জন্য গঠনমূলক সমর্থন দিয়ে যাব।’ বিক্রমাসিংহের মন্ত্রিসভায় বেশ কয়েকজন বিরোধী আইনপ্রণেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সৃষ্ট বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং অব্যবস্থাপনার কারণে শ্রীলঙ্কা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ সমস্যা এবং রেকর্ড উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির শিকার হয়েছে। দেশটির ২ কোটি ২০ লাখ মানুষকে কয়েক মাস ধরে খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের ঘাটতি সহ্য করতে হচ্ছে।

হাজার হাজার বিক্ষোভকারী সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাঁদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। এর ফলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন গোতাবায়া। এতে দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পথ খুলে যায়।

বিক্রমাসিংহে তাঁর সহপাঠী এবং সাবেক জনপ্রশাসনমন্ত্রী দীনেশ গুনাবর্ধনকে ঐক্য সরকারে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে আরও দুজন রয়েছেন। বিক্রমাসিংহের ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, প্রধান বিরোধী দলের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য বিক্রমাসিংহের মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন। তিনি ঐক্য সরকার নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

বিক্রমাসিংহে গতকাল বিধানসভার নতুন অধিবেশন শুরু করতে পার্লামেন্ট ২৪ ঘণ্টার জন্য স্থগিত করেন। চিফ গভর্নমেন্ট হুইপ প্রসন্ন রানাতুঙ্গা সাংবাদিকদের বলেন, নতুন প্রেসিডেন্ট সংসদীয় কমিটি পুনর্গঠন করতে চান। কঠোরভাবে সুরক্ষিত পার্লামেন্ট কমপ্লেক্সে বিক্রমাসিংহে শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচার হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। একজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রচার বন্ধের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

নতুন সরকারের জন্য অগ্রাধিকার হবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে চলমান বেলআউট (অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার) আলোচনা চালিয়ে যাওয়া এবং টেকসই বৈদেশিক ঋণ পুনর্গঠন করা। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা রাতারাতি শ্রীলঙ্কার আর্থিক সংকটের জন্য উচ্চ ঋণের চীনা বিনিয়োগকে দায়ী করেছে। শ্রীলঙ্কার বৃহত্তম বিদেশি ঋণদাতা দেশ চীন। দেশটির ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক ঋণের ১০ শতাংশের বেশি চীন থেকে নেওয়া। শ্রীলঙ্কা সরকার গত এপ্রিল মাসে ঋণখেলাপি হয়।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্রমাসিংহে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে বিক্ষোভকারীদের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বিক্রমাসিংহে বলেছেন, বিক্ষোভের নামে কেউ অগণতান্ত্রিক পন্থার আশ্রয় নিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সহিংসতার কাছে মাথা নত করবেন না বলে জানান ছয়বারের এই প্রধানমন্ত্রী।

রাজধানী কলম্বোয় একটি বৌদ্ধমন্দিরে প্রার্থনা শেষে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বিক্রমাসিংহে বলেন, ‘তোমরা যদি সরকার উৎখাতের চেষ্টা করো, প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দখল করে রাখো, তবে তা গণতন্ত্র নয়। এগুলো আইনের পরিপন্থী কাজ।’ বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনপ্রত্যাশী নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠদের আকাঙ্ক্ষা ভূলুণ্ঠিত করতে চাওয়া স্বল্পসংখ্যক বিক্ষোভকারীকে আমরা কোনো সুযোগ দেব না।’

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরপরই বিক্রমাসিংহে পার্লামেন্টের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশের বিশেষ শাখা ও সেনা ইউনিটের সঙ্গে দেখা করেন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকের সুরক্ষা দেওয়ায় তিনি তাঁদের ধন্যবাদ জানান।

এদিকে শ্রীলঙ্কার অনেক বিক্ষোভকারীই নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহেকে মেনে নিচ্ছেন না। তাঁরা বিক্রমাসিংহেকে রাজাপক্ষেদের লোক বলে অভিযোগ করছেন। তাঁকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বিক্রমাসিংহে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমি রাজাপক্ষেদের বন্ধু নই। আমি জনগণের বন্ধু।’

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন