২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর এই আইনপ্রণেতারা আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসের (এপিএইচআর) সহযোগিতায় চার মাস দীর্ঘ একটি তদন্ত চালিয়েছেন।

আইনপ্রণেতারা বলছেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যেসব দেশ নিজেদের গণতন্ত্রের পক্ষে দাবি করে থাকে, তাদের অবিলম্বে মিয়ানমারের ছায়া জাতীয় ঐক্য সরকারকে (এনইউজি) দেশটির বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। একই সঙ্গে এনইউজি ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য তহবিল সরবরাহ করতে হবে, যাদের সঙ্গে এনইউজি জোটবদ্ধ হয়েছে।

এই আইনপ্রণেতারা বলছেন, জরুরি ভিত্তিতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তাঁদের দাবি, সামরিক অভ্যুত্থানের ১৯ মাস পরও জান্তা সরকার ক্ষমতা পোক্ত করতে পারেনি।
আইনপ্রণেতাদের দলটি আরও বলছে, মিয়ানমারের বিশাল অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে এনইউজির মিত্র বাহিনীগুলো ও অন্য জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর লড়াই চলছে। দেশটিতে অব্যাহত সহিংসতা অর্থনীতিকে দ্রুত পতনের প্রায় দ্বারপ্রান্তে এবং নজিরবিহীন এক মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

মিয়ানমারে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত। রাজনৈতিক অপরাধের কারণে নিরাপত্তা বাহিনী ১৫ হাজার মানুষকে আটক করেছে বলে জানা গেছে। কমপক্ষে ২ হাজার ৩৭১ জন রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীকে হত্যা করা হয়েছে।

‘সবচেয়ে শক্তিশালী সমর্থকেরা’

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের ঘটনায় দ্রুততার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিন্দা জানিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবরোধ আরোপ করলে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী একঘরে হয়ে পড়ে। কিন্তু জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং রাশিয়া, চীন এবং কিছু ক্ষেত্রে ভারতসহ তাঁর আন্তর্জাতিক মিত্রদের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে আছেন।

এতে বলা হয়, ‘অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা সংহত করতে ব্যর্থতা সত্ত্বেও এসব সরকারের সমর্থন ও স্বীকৃতি পেয়ে জান্তা সরকার টিকে থাকতে এবং বহু মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটাতে ও নিপীড়ন চালাতে সক্ষম হয়েছে।’

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যেকোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা দিয়েছে চীন ও রাশিয়া। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী মানবাধিকার লঙ্ঘনে চীন ও রাশিয়ার সরবরাহকৃত অস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনা অভ্যুত্থানের পর সতর্কতার সঙ্গে বিবৃতি দিলেও চীন এখন সামরিক জান্তার অন্যতম শক্তিশালী সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বৈধতার প্রশ্নে জান্তা সরকারকে নতুন জীবন দিয়েছে চীন।

অবশ্য চীনের বিপরীতে রাশিয়া শুরু থেকেই সামরিক বাহিনীর স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিলের (এসএসি) প্রতি দৃঢ় সমর্থন দিয়ে আসছে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী যখন বিক্ষোভকারীদের হত্যা করছে, তখন ২৭ মার্চ নেপিডোতে সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল মস্কো।

এ ছাড়া ক্রেমলিনে কমপক্ষে তিনটি অনুষ্ঠানে জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইংকে স্বাগত জানানো হয়েছে। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরের সফরের সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। এই সমর্থনের বিনিময়ে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনে সোচ্চার সমর্থন দিয়েছে মিয়ানমার।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের সামরিক শাসনের প্রতি ভারতের অবদানের ধরন হলো স্বীকৃতি প্রদান, বাণিজ্য এবং দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত ও স্বাভাবিক সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া।

‘নির্ধারক বিষয়’

এই পুরোটা সময় গণতন্ত্রের প্রভাবশালী সমর্থকেরা প্রমাণ করেছে, তারা ‘সংকট মোকাবিলায় কার্যকরভাবে সাড়া দিতে অক্ষম’। বিশেষ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞাগুলো ‘সমন্বয়হীন ও অনিয়মতান্ত্রিক’ প্রকৃতির হওয়ায় সেগুলো সফল হয়নি বলছে স্টেকহোল্ডাররা।

একইভাবে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাও সমন্বয়হীন। পাশাপাশি মিয়ানমার অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এন্টারপ্রাইজের (এমওজিই) মতো সামরিক বাহিনীর তহবিল জোগান দেওয়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে অনাগ্রহ রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ সুতোয় ঝুলছে। এ অবস্থায় সামরিক বাহিনীর ওপর বহির্বিশ্বের চাপ এবং প্রতিরোধ সংগ্রামের প্রতি সমর্থন সংঘাতের গতিপথ ঠিক করে দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারকের ভূমিকা রাখবে।’

এতে আরও বলা হয়, সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফেরাতে এবং ফেডারেল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মিয়ানমারের জনগণকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আরও সাহায্য করতে পারে এবং সেটা করা উচিত। আর এটা শুরু করা যেতে পারে অবনতিশীল মানবিক সংকট মোকাবিলার প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো, সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে অবৈধ জান্তা সরকারের ওপর চাপ তীব্রতর করা এবং এনইউজিকে মিয়ানমারের বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে।