নেপালের সাধারণ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দেশটির নির্বাচন কমিশন এই ফলাফল প্রকাশ করেছে। এতে র্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহর নেতৃত্বাধীন ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। গত ছয় দশকের বেশি সময়ের মধ্যে নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো দলের জন্য এটি সবচেয়ে বড় জয়।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, ২৭৫ আসনবিশিষ্ট নেপালের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে আরএসপি এককভাবে ১৮২টি আসন নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে সরাসরি নির্বাচনে ১২৫টি এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে ৫৭টি আসন পেয়েছে দলটি। দুই–তৃতীয়াংশ আসন থেকে মাত্র দুই আসন কম পেয়েছে তরুণদের এই দল।
আরএসপির এই বিপুল উত্থানের বিপরীতে নেপালের পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। নেপালি কংগ্রেস মাত্র ৩৮টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (সিপিএন–ইউএমএল) ২৫টি আসনে জিতে তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে।
চীন ও ভারতের মাঝখানে অবস্থিত তিন কোটি মানুষের এই দেশে গত বছরের সেপ্টেম্বরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞার জেরে তরুণদের (জেন-জি) নেতৃত্বে ব্যাপক আন্দোলন হয়। দুর্নীতিবিরোধী ওই বিক্ষোভে সৃষ্ট সংঘর্ষে ৭৭ জন নিহত হলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অলির সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এরপর পরিস্থিতি সামাল দিতে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে প্রধান করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। এই সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। সেই গণ–অভ্যুত্থানের পর গত ৫ মার্চ দেশটিতে প্রথমবারের মতো এই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
পুরো নির্বাচনে আধিপত্য বিস্তার করা বালেন্দ্র শাহ একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারবিরোধী র্যাপ গান গেয়ে রকস্টারের খ্যাতি পেয়েছিলেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় সমভূমি ‘মাধেশ’ থেকে উঠে আসা প্রথম প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন তিনি। অথচ ওই অঞ্চলের ছোট আঞ্চলিক দলগুলো এবার একটি আসনও জেতেনি।
নির্বাচনী প্রচারে আরএসপি মূলত দুর্নীতি দমন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আগামী পাঁচ বছরে দেশের ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারের অর্থনীতিকে বাড়িয়ে দ্বিগুণের বেশি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বিশাল এই সাফল্যের মধ্যেও দলটির জনপ্রিয় নেতা ও সাবেক টেলিভিশন উপস্থাপক রবি লামিছানের বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র সঞ্চয় প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল তছরুপের অভিযোগ সামনে এসেছে। তিনি অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বর্তমানে জামিনে মুক্ত আছেন।
কংগ্রেস ও ইউএমএল প্রধানদের পদত্যাগের দাবি
কাঠমান্ডু পোস্ট–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর নেপালি কংগ্রেস ও সিপিএন-ইউএমএলের শীর্ষ নেতাদের ওপর পদত্যাগের চাপ বাড়ছে।
‘জেন–জি’ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল রাজনৈতিক দলগুলোতে নেতৃত্ব পরিবর্তন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে নেপালি কংগ্রেস গগন থাপাকে সভাপতি নির্বাচিত করলেও দলের ভেতর অসন্তোষ ছিল।
অন্যদিকে কে পি শর্মা অলিকে ক্ষমতা থেকে সরানো হলেও গত বছরের নভেম্বরে তিনি আবার দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
নির্বাচনে গগন থাপা ও অলি—দুজনকেই নিজ নিজ দল থেকে হবু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা দুজনই নিজ নিজ আসনে হেরেছেন। তাঁদের দলও অত্যন্ত খারাপ ফল করেছে। এই ব্যর্থতার দায় নিয়ে এখন নেতৃত্বে পরিবর্তনের দাবি উঠেছে।
কংগ্রেস নেতা গগন থাপা পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও দলের সহসভাপতি বিশ্বপ্রকাশ শর্মা তাঁকে এখনই সরে না দাঁড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, এই হারের জন্য এককভাবে থাপাকে দায়ী করা ঠিক হবে না। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নেপালি কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানে গগন থাপার ভাগ্য এবং পরাজয়ের কারণ নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হবে।
তবে সিপিএন-ইউএমএল এখনো আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে ইউএমএলের ভেতরেও বিদ্রোহী নেতারা অলির বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছেন। জেন–জি আন্দোলনের পর অলিকে নেতৃত্ব থেকে সরানোর চেষ্টা করা হলেও নভেম্বরের সম্মেলনে তা সফল হয়নি। ফলে তাঁর নেতৃত্বেই দল নির্বাচনে যায়।
ইউএমএলের উপমহাসচিব যোগেশ ভট্টরাই দলের প্রধান অলিকে পদত্যাগের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, অলি যদি পদে বহাল থাকেন তবে দলকে অপ্রত্যাশিত পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। ভট্টরাই বলেন, ‘আমাদের দল এভাবে চলতে পারে না। এখন কঠোর পর্যালোচনার সময় এসেছে এবং এই পর্যালোচনা দলের নেতৃত্ব নিয়েও হতে পারে।’