এনডিটিভির এক্সপ্লেইনার
নেপালে কেন বারবার বিপর্যয় নেমে আসছে, হিমালয়ের বুকেই কি বিপদ লুকিয়ে আছে
নেপালের রাসুয়া জেলায় গত বুধবার সকাল ৯টার দিকে ভোটকোশি নদী থেকে ধেয়ে আসে ভয়াবহ পানির ঢল, তছনছ করে দেয় তিব্বত ও চীন সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো। সেই ঢল ভাটির দিকে এগিয়ে গিয়ে মেশে ত্রিশূলী নদীতে। এ ঘটনায় ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও তিব্বতে এ পর্যন্ত ৪৭২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। এখনো নিখোঁজ প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন। তাঁদের মধ্যে ৮ শতাধিক বিদেশি পর্যটক।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ মাসের মধ্যে ভোটকোশি থেকে ত্রিশূলী পর্যন্ত এই ৩০ কিলোমিটার নদী অববাহিকায় এটিই দ্বিতীয় বড় বিধ্বংসী বন্যা। ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূতাত্ত্বিক গঠনের কারণে নেপাল যে বিশ্বের অন্যতম প্রধান দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল, এই বন্যা যেন তারই আরেকটি প্রমাণ।
আসলে এটি নিছক আবহাওয়াজনিত কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এর পেছনে কাজ করেছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একদিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমালয়ের তাপমাত্রা ক্রমাগত বেড়ে চলায় হিমবাহ গলে বিভিন্ন ভঙ্গুর জায়গায় বিপুল পরিমাণ পানি জমছে। অন্যদিকে ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটনিক প্লেটের সংঘর্ষে হিমালয়ের পাহাড়গুলো এখনো অবিরাম নড়াচড়া করছে, বদলে যাচ্ছে সেগুলোর গঠন।
আসলে কী ঘটেছিল
ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে এখন পর্যন্ত মূলত তিনটি ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে, তবে সব কটির মূল সূত্র আসলে একই।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল দেশটির পার্লামেন্টে বলেছেন, গত বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে একটি ভূমিকম্পের কারণে বড় ধরনের ভূমিধস ঘটে, যা নদীর গতিপথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। পরে পানির চাপে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে নেমে আসে এই বিপর্যয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) ওই সময় তিব্বতের গোসাইকুন্ডা থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি কম্পন রেকর্ড করেছিল। পরে অবশ্য তারা জানায়, এটি প্রকৃত ভূকম্পন ছিল না, বিশাল আকৃতির ভূমিধসের কারণেই এই কম্পন তৈরি হয়েছিল।
বিজ্ঞানীদের আরেকটি ব্যাখ্যাও প্রায় একই দিকে ইঙ্গিত করে। আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্রের (আইসিআইএমওডি) বিজ্ঞানী শাশ্বত সান্যাল সিএনএনকে বলেন, ভোটকোশির শাখা নদী লেন্দে খোলায় ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত। হিমবাহ থেকে বিশাল বরফ ও পাথরের স্তূপ ধসে পড়ে নদীটির গতিপথ সাময়িকভাবে আটকে দেয়। পরে পানির চাপে তা ভেঙে তৈরি করে বিশাল স্রোত। আর সেটিই রূপ নেয় আকস্মিক বন্যায়।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও হিমবাহ বিশেষজ্ঞ রিজান ভক্ত কায়স্থও নেপাল ও চীনের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলোচনার পর একই ধরনের ধারণা দিয়েছেন। তিনি জানান, গত বছরও ঠিক একইভাবে লেন্দে খোলা নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ হয়ে বন্যা হয়েছিল।
নদীটির উজানে হিমবাহ অঞ্চলের পানির গতিপথে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে গত ২৪ আগস্টের স্যাটেলাইট ছবি যাচাই করা হচ্ছে। দুর্যোগের আগে ও পরের ছবি বিশ্লেষণে সেখানে আচমকা বড় বড় স্রোত তৈরি হতে দেখা গেছে।
তিনটি ব্যাখ্যারই সারকথা এক—হিমালয়ের একটি পাহাড়ি নদীর পথ কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেখানে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ পানি একপর্যায়ে প্রলয়ঙ্করী রূপ নেয়।
এই দুর্যোগের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে চীন-নেপাল সীমান্তের রসুয়াগাড়ী ক্রসিংয়ে। সেখানে প্রধান সীমান্ত গেটের দিকে যাওয়ার মূল সেতুটি পানির তোড়ে সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। সেখানে বহু মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই অঞ্চল আগেও একাধিকবার এমন বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাক্ষী হয়েছে।
শত শত বছর ধরে একই ঘটনা
হিমালয়ের এই অঞ্চলে হিমবাহ গলে সৃষ্ট হ্রদের বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যা বা অভ্যন্তরীণ সুনামির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। শত শত বছর ধরে এমন বহু প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগের সাক্ষী নেপাল। আঞ্চলিক গবেষণা সংস্থা আইসিআইএমওডির সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে হিমালয়ের হিন্দুকুশ পর্বতমালায় হিমবাহের বরফ গলে যাওয়ার হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে এই হিমবাহ ও তার অববাহিকায় থাকা নদীগুলোর ভাটি অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় ২০ লাখ মানুষ এখন চরম ঝুঁকিতে আছেন।
তিব্বতের উজানে হিমবাহ হ্রদ ভেঙে গত বছরও একই ধরনের বন্যা হয়েছিল। তবে এরও বহু আগে, ১৯৮১ সালের জুলাইয়ে তিব্বতের ঝাংঝাংবো উপত্যকার একটি হিমবাহ হ্রদ আচমকা প্লাবিত হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের পরবর্তী এক পর্যালোচনায় বলা হয়, তখন বন্যার কারণ জানা যায়নি; কয়েক বছর পর চীনাবিজ্ঞানীদের একটি গবেষণায় এর কারণ স্পষ্ট হয়।
নেচার ও সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত সেই গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ওই বন্যায় ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন, ধ্বংস হয়ে যায় ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সান কোশি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র। ১৯৬৪ ও ১৯৮৩ সালের বড় বন্যার পেছনেও মিলেছে একই যোগসূত্র।
নেপালে এ ধরনের বিপর্যয়ের ইতিহাস আরও পুরোনো। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশটিতে অতীতে হিমবাহ হ্রদ ভেঙে মোট ২৪টি বড় বন্যার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১৪টির উৎপত্তি নেপালে এবং ১০টির তিব্বতে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রায় ৪৫০ বছর আগে নেপালের সেতি কোলা নদী অববাহিকায় মাছাপুছরে হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ধসে পড়েছিল। সেই ধসে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে ধেয়ে আসা কোটি কোটি টন কাদা ও পাথর পোখরা উপত্যকাকে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ মিটার গভীর ধ্বংসস্তূপে ঢেকে দিয়েছিল।
গত বছর নেপাল-চীন সীমান্তের ঠিক এই পয়েন্টে হওয়া বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণও চিহ্নিত করেছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষকেরা। তাঁদের পর্যালোচনা অনুযায়ী, মূলত সীমান্ত থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উজানে ও ৫ হাজার ১৫০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাদ হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ আকস্মিক ভেঙে যাওয়ার কারণে ২০২৫ সালের ৮ জুলাইয়ের সেই বন্যা হয়েছিল।
উজানে জমে থাকা পানি
হিমালয়ের বুকে হিমবাহ গলে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে এমন শত শত হ্রদ। বরফ গলে পাহাড়ের উপরিভাগে জমে থাকা এই বিপুল পানি যেন একেকটি টাইমবোমা। এগুলো চরম বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ২০২০ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, কোশি, গণ্ডকী ও কর্ণালী নদী অববাহিকায় সব মিলিয়ে হিমবাহ হ্রদ আছে ৩ হাজার ৬২৪টি, যার মধ্যে ৪৭টিকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২৫টি তিব্বতে, ২১টি নেপালে ও ১টি ভারতে।
তবে এমন তালিকা দিয়ে সব সময় আসন্ন দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয় না। কারণ, গলে যাওয়া হিমবাহের উপরিভাগে তৈরি এই অস্থায়ী হ্রদগুলো কয়েক মাসের মধ্যে আকারে বড় হয়ে যায় এবং হঠাৎ ফেটে পড়ে। ফলে একটি তালিকা তৈরি করে প্রকাশ করার আগেই তা পুরোনো বা অকার্যকর হয়ে পড়ে। যেমন ২০২৫ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার জন্য দায়ী হ্রদটির অস্তিত্বই দুর্যোগের আগে বিজ্ঞানীদের তালিকায় ছিল না।
চীন কি নেপালকে সতর্ক করেছিল
হিমালয় অঞ্চলে প্রতিটি প্রলয়ঙ্করী বন্যার পরই একই প্রশ্ন বারবার সামনে আসে। নেপাল কেন আগেভাগে এই দুর্যোগের কোনো আভাস পায় না?
২০২৫ সালের জুলাইয়ের বিপর্যয়ের পর নেপালের জলবায়ু ও আবহাওয়া বিভাগের মহাপরিচালক স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলেন, তিব্বত অঞ্চলের জলবায়ু বা হিমবাহ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার মতো কার্যকর কোনো দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা নেপালের নেই। চীন মাঝেমধ্যে ভারী বৃষ্টির আগাম সতর্কতা দেয় বটে; কিন্তু হিমবাহ হ্রদ ফেটে পড়ার মতো ঘটনা কেবল বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে ঘটে না।
নেপালি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গত বছরের আকষ্মিক বন্যার সময়ও কোনো আবহাওয়া বা বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস কেন্দ্র থেকে তাঁরা সতর্কবার্তা পাননি। বন্যার পানি নেপালে ঢোকার মাত্র এক ঘণ্টা আগে তাঁরা প্রথম খবর পান, তা-ও কোনো পূর্বাভাস সংস্থা থেকে নয়, সীমান্তে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীরাই তাঁদের বিষয়টি জানান।
গত বছরের সেই ভয়াবহ বন্যার পর নেপাল সরকার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদারে চীনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা দিতে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘের ‘গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড’ প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের একটি অনুদানও অনুমোদন করে।
তবে এত উদ্যোগের পরও সীমান্তজুড়ে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা দেওয়ার মতো কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। নেপালের চলতি সপ্তাহের এই বিপর্যয়ই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
টেকটনিক প্লেটের সংঘর্ষ, চিরস্থায়ী সংকট
হিমবাহের বরফ গলে যাওয়া, হ্রদ ফেটে পড়া কিংবা আগাম সতর্কবার্তার ব্যবস্থার অভাব নেপালের জন্য সাময়িক সংকট মনে হতে পারে। কিন্তু এর বাইরে দেশটির এমন একটি ভৌগোলিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, যা একেবারেই চিরস্থায়ী।
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে নেপাল ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটনিক প্লেটের চরম সংঘাত-অঞ্চলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই দুটি বিশাল প্লেট প্রতিবছর প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিমিটার গতিতে একে অপরের দিকে এগিয়ে এসে ধাক্কা খাচ্ছে।
প্রায় পাঁচ কোটি বছর আগে এই দুই প্লেটের মুখোমুখি প্রচণ্ড সংঘর্ষেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল প্রাচীন টেথিস মহাসাগর। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় হিমালয় পর্বতমালা। সে সময় পৃথিবীর ভূত্বক প্রচণ্ড শক্তিতে ভাঁজ হয়ে ওপরে উঠে গিয়ে তৈরি করে এই বিশাল পর্বতমালা ও তার সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলো।
ভূবিজ্ঞানীদের ভাষ্য, কোটি বছর আগে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ আজও থামেনি। অত্যন্ত ধীরগতিতে হলেও তা এখনো চলছে। সক্রিয় এই ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার কারণেই হিমালয়কে পৃথিবীর সবচেয়ে তরুণ ও দ্রুত বর্ধনশীল পর্বতমালা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অনবরত এই ধাক্কার কারণে হিমালয় পর্বতমালা এখনো প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫ মিলিমিটার করে ওপরের দিকে উঠছে। আর এই চিরস্থায়ী ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণেই নেপাল বারবার ভয়াবহ ভূমিকম্প ও ভূমিধসের মুখে পড়ছে।
বন্যা বা ভূমিধসের জন্য নেপালে এখন আর বড় কোনো ভূমিকম্পের প্রয়োজন হয় না, মাঝারি বা মৃদু কম্পনই যথেষ্ট। ২০১৫ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের মতো বড় বিপর্যয়ের কারণে এই অঞ্চলের পাহাড়ের ঢালগুলো আগে থেকেই আলগা ও ভঙ্গুর হয়ে আছে। ফলে এখন সামান্য ঝাঁকুনিতেই ধসে পড়ছে সেই আলগা মাটি ও পাথর।
গত বুধবারের বিপর্যয়ই তার সবশেষ উদাহরণ। সেদিন কোনো প্রকৃত ভূমিকম্প না হওয়া সত্ত্বেও কেবল একটি বড় ভূমিধসের কারণে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ কম্পনই পাহাড়ের একটি পুরো ঢাল ধসিয়ে দিতে যথেষ্ট ছিল। সেই ধসের মাটি-পাথর নদীর গতিপথ পুরোপুরি আটকে দেয়, যা পরে রূপ নেয় এক প্রলয়ঙ্করী আকস্মিক ঢলে।
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু এই সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলের ঠিক দক্ষিণেই অবস্থিত। গত বুধবারের বন্যার পানি ও পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে ভেসে আসা কোটি কোটি টন কাদা-পাথর নদী উপত্যকা বেয়ে ধেয়ে যায় কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত বিদুরের মতো জনবসতিগুলোর দিকে।
অপরিকল্পিত উন্নয়নও দায়ী
নেপালের এই সর্বনাশের পেছনে সর্বশেষ যে কারণটি কাজ করছে, তা দেশটির নির্মাণশৈলী ও ভুল জায়গায় গড়ে তোলা অবকাঠামো। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, চীন-নেপাল বাণিজ্য করিডর বা মহাসড়ক নির্মাণের সময় হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণের সম্ভাব্য এই ঝুঁকিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। নদীর অববাহিকা ও প্লাবনভূমি ঘেঁষেই গড়ে তোলা হয়েছে বড় বড় স্থলবন্দর ও কাস্টম অফিস।
চেংডুর চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেন হ্যাজার্ডস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের গবেষক নীতেশ খাড়কা ও তাঁর দলের এক যৌথ গবেষণা বলছে, হিমবাহ হ্রদ ভেঙে বন্যা হলে চীন ও নেপাল—দুই দেশেই এর প্রভাব পড়তে পারে। এতে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে প্রায় ১০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ চীন-নেপাল মহাসড়ক, ১০৩টি সেতু, ২টি বড় স্থলবন্দর এবং দুই দেশে থাকা ৩ হাজার ৩০১টি স্থাপনা।
বাস্তবেও তার প্রমাণ মিলেছে। নেপাল-চীন সীমান্তের রসুয়াগাড়ী ক্রসিংয়ের কাছেই অবস্থিত তিমুরে কাস্টমস ফাঁড়িটি গত ১৩ মাসে দুবার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। গত বুধবারের এই আকস্মিক বিপর্যয়ে ভারতের কৈলাস মানস সরোবর–যাত্রার পুণ্যার্থীসহ বহু পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন।