মিয়ানমারের বিরল খনিজ অঞ্চলে সামরিক জান্তার অভিযান জোরদার
যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে নতুন প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এক মাস পার হয়েছে। এমন সময় দেশটির জান্তা বাহিনী বেশ কয়েকটি সীমান্ত অঞ্চলে নতুন করে অভিযান শুরু করেছে। এর মধ্যে চীনের সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজসমৃদ্ধ এলাকা ও কিছু জরুরি বাণিজ্যপথ রয়েছে।
মিয়ানমারের কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মুখপাত্র ও বিশ্লেষকেরা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, আগের সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর গত মার্চে নতুন সেনাপ্রধান হন ইয়ে উইন ও। তিনি গত কয়েক বছরে শক্তিশালী হয়ে ওঠা জাতিগত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছ থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তঘাঁটি পুনরুদ্ধারে আগ্রাসী অভিযান শুরু করেছেন।
সামরিক বাহিনী বর্তমানে মূলত তিনটি অঞ্চলে অভিযান জোরদার করেছে। এগুলো হলো—ভারী বিরল খনিজ উপাদানসমৃদ্ধ চীন সীমান্তবর্তী কাচিন রাজ্য, ভারত সীমান্তবর্তী চিন রাজ্য এবং থাইল্যান্ডসংলগ্ন কারেন রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক করিডর।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহে এক সভায় ইয়ে উইন ও সেনাদের বলেন, সামরিক বাহিনী চিন রাজ্যের ফালাম শহর, কাচিন রাজ্যের মান্দালয় এবং মিতকিয়িনার মধ্যবর্তী একটি প্রধান সড়ক নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
মিয়ানমার–বিষয়ক বিশ্লেষক সাই কি জিন সো বলেন, ‘সামরিক বাহিনীর যুক্তি, মিয়ানমারের প্রাথমিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যপথগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া প্রয়োজন।...আমরা দেখতে পাচ্ছি, যেসব শহরে সীমান্ত বাণিজ্য গেট রয়েছে, সেগুলো পুনরুদ্ধারে সামরিক বাহিনী মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে।’
সামরিক বাহিনী শান্তির কথা বলে বারবার প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। তারা কোনো চুক্তির তোয়াক্কা করেনি। তাই তাদের প্রতি আস্থার অভাব রয়েছে। যা-ই চেষ্টা করুক না কেন, তারা ব্যর্থ হতে বাধ্য।
এ বিষয়ে জানতে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। মিয়ানমারের বিভিন্ন অংশে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকায় রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে এ সামরিক অভিযানের বিস্তারিত ও প্রাথমিক সাফল্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
সাবেক জান্তাপ্রধান ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং গত মাসে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে ১০০ দিনের মধ্যে শান্তি আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেন। অনেক জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী এ প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এর মধ্যেই অভিযান শুরু হয়েছে।
অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ২০২১ সালে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে দ্রুত বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নেয়। এর ফলে একাধিক জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদ্রোহী দল বেশ কিছু অঞ্চল থেকে সামরিক বাহিনীকে হটিয়ে দেয়।
সীমান্ত প্রবেশপথ
সামরিক বাহিনী উত্তর কাচিন রাজ্যের গভীরে প্রবেশের চেষ্টা করছে। তাদের লক্ষ্য, চীন সীমান্তবর্তী সেই খনি অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধার করা, যেখান থেকে বিশ্বের মোট ভারী বিরল খনিজের প্রায় অর্ধেক উৎপাদিত হয়। এসব খনিজ উপাদান উইন্ড টারবাইন বা বাতাসচালিত বিদ্যুৎযন্ত্র ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য একান্ত দরকারি।
সাবেক জান্তাপ্রধান ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং গত মাসে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে ১০০ দিনের মধ্যে শান্তি আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেন। অনেক জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী এ প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এর মধ্যেই অভিযান শুরু হয়।
কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মি (কেআইএ) ২০২৪ সালের অক্টোবরে কাচিন রাজ্যের এ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। তাদের মুখপাত্র ন এইচ বু বলেন, তারা নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করেছে। বিশেষ করে চিপউই ও পাংওয়া টাউনশিপ বা প্রশাসনিক অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিদ্র করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা আমাদের বন্দুকের নল দিয়ে তাদের (সামরিক বাহিনীকে) স্বাগত জানাব।’
মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ভারতের সীমান্তবর্তী পশ্চিম ফ্রন্ট তথা চিন রাজ্যেও তীব্র হামলা শুরু করেছে। এটি মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তসীমান্ত রসদ সরবরাহের পথ।
চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের মুখপাত্র সালাই ভ্যান বলেন, সামরিক বাহিনী হারানো এলাকা পুনরুদ্ধারে ব্যাপক বিমান হামলা চালাচ্ছে। ফলে প্রতিরোধ যোদ্ধারা ওই রাজ্যের ফালাম ও তনজং শহর থেকে কৌশলগত কারণে পিছু হটেছে।
রয়টার্সের আগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান থেকে আসা জেট ফুয়েলের অবৈধ সরবরাহ মিয়ানমার সামরিক বাহিনীকে তাদের ব্যাপক বোমা হামলা অব্যাহত রাখতে সাহায্য করছে। ১৫ মাসে তারা ১ হাজারের বেশি বেসামরিক স্থানে হামলা চালিয়েছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বে জ্বালানিসংকট তৈরি হলেও মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর হামলার তীব্রতা কমার কোনো লক্ষণ এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।
সামরিক বাহিনী থাইল্যান্ডের নিকটবর্তী মায়াবতী-ককারেক হাইওয়ে নিয়ন্ত্রণের জন্যও অভিযান শুরু করেছে। এটি একটি প্রধান বাণিজ্যিক পথ। ২০২৪ সালে কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন (কেএনইউ) সীমান্তবর্তী শহর মায়াবতীতে প্রবেশের পর থেকে সেখানে লড়াই তীব্র হয়েছে।
মিন অং হ্লাইং ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে বিরোধী দলগুলোকে আলোচনার টেবিলে আনার চেষ্টা করছে। যেসব দল ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে আলোচনায় বসাতে বিশেষ চেষ্টা চলছে, কেএনইউ তাদের অন্যতম।
কেএনইউর মুখপাত্র স তাউ নি বলেন, সামরিক বাহিনী শান্তির কথা বলে বারবার প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। তারা কোনো চুক্তির তোয়াক্কা করেনি। তাই তাদের প্রতি আস্থার অভাব রয়েছে। যা-ই চেষ্টা করুক না কেন, তারা তাতে ব্যর্থ হতে বাধ্য।