বিশ্লেষণ
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প আবার প্রমাণ করলেন, কোন বিভ্রান্ত জগতে তাঁর বাস
যেমনটা ধারণা করা হয়েছিল, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের বৈঠকটি তেমনই হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবারের এই শীর্ষ বৈঠকের আলোচনা জাপান সরকারের প্রত্যাশা অনুযায়ী গড়ায়নি।
ন্যাটো জোটসহ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্রদেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলায় যোগ দিতে অসম্মতি প্রকাশ করায় অনেকটা ক্ষুব্ধ হয়েই ট্রাম্প বলেছিলেন, এদের সহযোগিতা তিনি আর প্রত্যাশা করছেন না এবং ওয়াশিংটন একাই যুদ্ধ চালিয়ে নেবে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী টোকিও থেকে যাত্রা শুরু করার এক দিন আগে ট্রাম্প এ রকম মন্তব্য করায় প্রধানমন্ত্রী নিজে এবং জাপানি প্রতিনিধিদলের সদস্যরা কিছুটা হলেও হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলেন। তাঁরা ধরে নিয়েছিলেন, জাপানের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে দেখা বিষয়টি শীর্ষ বৈঠককে সেভাবে প্রভাবিত করবে না এবং শুল্ক ও বাণিজ্যের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে জাপানের প্রত্যাশিত বিনিয়োগসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যান্য বিষয় নিয়ে তাঁরা খোলামেলা আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
এতটা আশাবাদী হওয়া যে ঠিক হবে না, তা জাপানের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম এবং একদল বিশেষজ্ঞ শুরুতেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, কথা ও কাজে মিল না থাকাটা ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সুতরাং শীর্ষ বৈঠকে সুযোগমতো ঠিকই বিষয়টি তিনি তুলে ধরবেন এবং পারস্য উপসাগর এলাকায় রণতরি পাঠিয়ে যুদ্ধে সরাসরি যোগ দেওয়ার আহ্বান জাপানের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি জানাবেন। একই সঙ্গে তাঁরা আরও বলেছিলেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রীর উচিত হবে, এমন পরিস্থিতির জন্য তাঁর জবাব তৈরি করে রাখা।
তাঁদের সেই প্রত্যাশা এখন কেবল সঠিকই প্রমাণিত হয়নি, একই সঙ্গে ট্রাম্প আরও দেখিয়ে দিয়েছেন, অপ্রাসঙ্গিক কতিপয় বিষয় উত্থাপন করে প্রতিপক্ষকে কীভাবে অপ্রস্তুত করে দেওয়া যায়, রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যে চলা আলোচনায় নিয়মবহির্ভূত গণ্য হওয়া সেই খেলায় তিনি কতটা সিদ্ধহস্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের চালানো যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আহ্বান প্রতিহত করার জুতসই যে অস্ত্র জাপানের প্রধানমন্ত্রীর হাতে ধরা ছিল, তা হচ্ছে, আইনগত বৈধতার দিকগুলো প্রতিপক্ষকে স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেওয়া। জাপানের সংবিধান বিদেশে সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেশের আত্মরক্ষা বাহিনীকে দেয় না। সশস্ত্র বাহিনীর নামকরণ বলে দিচ্ছে, এদের দায়িত্ব হচ্ছে বাইরের হামলা থেকে দেশকে রক্ষা করা, আগ বাড়িয়ে অন্য কারও ওপর হামলা চালানো নয়। ফলে টোকিও বরাবর চেষ্টা করেছে সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার ভেতরে সীমিত থাকা অবস্থায় যতটা সম্ভব শান্তি রক্ষার বহুজাতিক বৈদেশিক মিশনে অবদান রাখতে।
এতটা ঢাকঢোল পিটিয়ে মিত্রদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের একলা চলার মনোভাব ব্যক্ত করার পরও জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকে জাপানের প্রতি সেই অনুরোধ করেই ট্রাম্প ক্ষান্ত ছিলেন না। জবাবে তাকাইচি কিছুটা নিচু কণ্ঠে জাপানের অপারগতার বিষয়টি তুলে ধরার পরেও ট্রাম্প ঝট করে এ রকমও বলে বসেন যে তাঁর বিশ্বাস, ন্যাটো জোটের বিপরীতে থালার দিকে জাপান এগিয়ে আসছে। থালার দিকে জাপানের এগিয়ে আসার মতো মন্তব্যের মধ্যেও একধরনের তাচ্ছিল্যের ভাব ফুটে ওঠে, যেটাও ট্রাম্পের আরও একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ট্রাম্প আরও বলেন, তাকাইচির সঙ্গে চমৎকার সম্পর্ক তিনি বজায় রাখছেন। প্রচুর পরিমাণে মার্কিন সমরাস্ত্র কেনার জন্য জাপানের প্রশংসাও করেন তিনি।
পার্ল হারবারের তুলনা
শীর্ষ বৈঠক শেষ হয়ে যাওয়ার পর ওভাল অফিসে আয়োজিত দুই নেতার যৌথ সংবাদ সম্মেলনে হঠাৎ আরও একটি বিতর্কিত তুলনার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে তাকাইচির জন্য বিরক্তির কারণ তৈরি করে দেন ট্রাম্প। জাপানের প্রধানমন্ত্রী যদিও কোনো রকম মন্তব্য না করে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকদের একজন ট্রাম্পের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ সামরিক হামলা শুরু করার আগে জাপান ও অন্য মিত্রদের তিনি জানিয়েছিলেন কি না? উত্তরে ট্রাম্প বলেন, শক্ত হাতে তাঁরা এগিয়ে গিয়েছিলেন এবং সবার মধ্যে বিস্ময় তৈরি করে নিতে কাউকেই তাঁরা এ নিয়ে কিছু বলেননি। এটুকু বলার পর আরেকটি বিব্রতকর মন্তব্য তিনি করেন। তা হলো, বিস্ময়ের বিষয়টি জাপানের চেয়ে অন্য কেউ কি আর ভালো বোঝে? প্রশ্নবোধক এ মন্তব্য করার পর তাকাইচির দিকে মুখ ফিরিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, ‘পার্ল হারবার নিয়ে আমাকে আপনি বলেননি কেন? ঠিক তো? তাই না?’ তাকাইচির তখন অবাক হওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।
১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে হাওয়াই দ্বীপের পার্ল হারবারে অরক্ষিত অবস্থায় বন্দরে নোঙর করা মার্কিন কয়েকটি রণতরি জাপান বিমান হামলা চালিয়ে ডুবিয়ে দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার যে অভিযোগ উত্থাপন করা হচ্ছে, তা হলো আগে থেকে না জানিয়ে যুদ্ধ শুরু করার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করে জাপান। আন্তর্জাতিক চুক্তির অধীন আমাদের এই যুগে যুদ্ধের একটি প্রচলিত নিয়ম হচ্ছে, একটি রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার আগে যুদ্ধের লক্ষ্য সেই প্রতিপক্ষকে জানিয়ে দেওয়া। জাপান অবশ্য আজ পর্যন্ত সেই অভিযোগ স্বীকার না করে বলে আসছে যে অস্পষ্ট কিছু দিক এখানে রয়ে গেছে, যা কিনা জাপানের যুদ্ধ ঘোষণার বার্তাকে আড়াল করে রাখছে।
তবে বিস্তারিত সেই আলোচনায় না গিয়েও যে প্রশ্ন সংগতভাবেই তোলা যায়, তা হলো ইরানের কাছে যুদ্ধ ঘোষণার বার্তা যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েল পাঠিয়েছিল কি না? শীর্ষ বৈঠকে দেওয়া ট্রাম্পের উদ্ধৃতি থেকে আমরা পরিষ্কার বুঝে নিতে পারি যে সে রকম কোনো বার্তা হামলা শুরু করা দুই দেশ দেয়নি এবং প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেই এখনো তারা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের পার্ল হারবার প্রসঙ্গ টেনে আনা আমাদের সামনে ভিন্ন যে বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে, তা হলো ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে অজ্ঞতার কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে তারপরও শক্তির দাপটে কথা বলে যাওয়ায় কোনো রকম রাখঢাক দেশটির নেই।
জাপান-মার্কিন শীর্ষ বৈঠক অবশ্য এ রকম অপ্রীতিকর এবং অনাহূত কিছু ত্রুটির বাইরে মসৃণভাবেই এগিয়ে গেছে। তাকাইচি সেখানে ট্রাম্পকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখতে জাপান প্রস্তুত আছে। বৈঠক–পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে তিনি উল্লেখ করেছেন, যুদ্ধ পরিহার করা দেশের সংবিধানের আওতায় জাপান কী করতে পারে এবং কী করতে পারে না, আইনগত সে অবস্থান বিস্তারিতভাবে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সামনে তুলে ধরেছেন।
শীর্ষ বৈঠকে অবশ্য মার্কিন নেতার স্তুতি গাওয়া থেকে তাকাইচি বিরত থাকেননি। তিনি প্রশংসা করে বলেছেন, ট্রাম্প হচ্ছেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি বিশ্বজুড়ে শান্তি ও সমৃদ্ধি এনে দিতে পারেন। অন্যদিকে জাপানের সংলগ্ন অঞ্চলজুড়ে আরও বেশি আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠা চীনের প্রসঙ্গটি ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দিয়ে তাকাইচি বলেছেন, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় নিরাপত্তার পরিবেশ ক্রমে আরও জটিল হয়ে উঠছে।
ইরান পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে হুমকির মুখে পড়া শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর শীর্ষ বৈঠকে বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করা হলেও এর বাইরে অর্থনীতি ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাপান ও মার্কিন সরকার সংকটের মুখে পড়া ধাতুর সরবরাহ নিশ্চিত করে নিতে প্রস্তাবিত একটি বহুপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তির কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানের দূরবর্তী একটি দ্বীপের চারপাশের সমুদ্রে বিরল ধাতু আহরণ এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করার একটি সমঝোতা স্মারকও দুই দেশ স্বাক্ষর করেছে।
এর বাইরে দ্বিপক্ষীয় একটি শুল্কচুক্তির অধীন জাপানের প্রতিশ্রুত দ্বিতীয় দফার বিনিয়োগে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও অন্যান্য প্রকল্পের জন্য ৭৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের ঘোষণাও তাঁরা দেন। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোম্পানির জড়িত থাকা ১৩টি প্রকল্পে সহায়তা প্রদানের ইচ্ছাও দুই দেশের সরকার ব্যক্ত করেছে। জাপানের নেতৃস্থানীয় কোম্পানি মিতসুবিশি মেটেরিয়াল, সুমিতোমো মেটাল মাইনিং কোম্পানিসহ আরও কয়েকটি জাপানি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এসব প্রকল্পে যুক্ত থাকবে।
তাকাইচি শুক্রবার আর্লিংটন জাতীয় সমাধি পরিদর্শন করবেন এবং তিন দিনের সফর শেষ করে শনিবার তাঁর দেশে ফেরার কথা।