রাখাইনের বাজারে প্রাণঘাতী হামলার তীব্র নিন্দা ফলকার টুর্কের
মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের একটি বাজারে দেশটির সামরিক বাহিনীর বিমান হামলার নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক। গত সোমবারের ওই হামলায় ক্রেতা-বিক্রেতা, পরিবহনশ্রমিক, অন্যান্য বেসামরিক নাগরিকসহ অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন।
পরদিন মঙ্গলবার ওই হামলার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেন টুর্ক।
জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টুর্কের বক্তব্য প্রকাশ করা হয়।
সেখানে বলা হয়, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর রাখাইনে চালানো সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর মধ্যে এটি একটি। জানা গেছে, সোমবার দুপুরের দিকে কিয়াউকতাও শহরে সেনাবাহিনী ওই হামলা চালায়। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুরাও রয়েছে।
এ ঘটনায় অন্তত ৫৮ জন আহত হয়েছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে। হতাহত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
খবরে বলা হয়েছে, সোমবার বাজারে ব্যস্ত সময়ে ওই হামলা চালানো হয়। তখন বাজারে ২০০টির বেশি দোকান খোলা ছিল এবং বাজার ও এর আশপাশে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। ওই বাজারের দোকানগুলো রাখাইন, রোহিঙ্গা, হিন্দু, দেইংনেটসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। সব সম্প্রদায়ের মানুষ ওই বাজারে কেনাকাটা করতে আসেন।
মিয়ানমারে এই হামলাগুলো সারা দেশে বেসামরিক নাগরিকদের চরম দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে। তবে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ।
ফলকার টুর্ক বলেন, ‘সর্বশেষ এই হামলা যুদ্ধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার বিষয়টি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে।’
টুর্ক বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আওতায় যুদ্ধে জড়িত পক্ষগুলোকে অবশ্যই হামলার ক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, আনুপাতিকতা এবং সতর্কতা অবলম্বনের নীতি মেনে চলতে হবে।’
টুর্ক বলেন, ‘এই হামলাগুলো দেশজুড়ে বেসামরিক মানুষের ভয়াবহ দুর্দশার চিত্র তুলে ধরছে। তবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মানুষের পরিস্থিতি অন্য যেকোনো এলাকার চেয়ে বেশি ভয়াবহ।’
বেশ কয়েক বছর ধরেই মিয়ানমার চরম সহিংসতার শিকার। দেশটির জনগণ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারপ্রধান দেশটিতে ক্রমাগত ঘটে চলা মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে যথেচ্ছ গ্রেপ্তার, নির্যাতন, যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, গুম, জোরপূর্বক শ্রম আদায় এবং জোর করে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ।
এসব ঘটনা বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের ওপর প্রভাব ফেলছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।
মালয়েশিয়া মিয়ানমারের প্রায় পাঁচ হাজার নাগরিককে ফেরত পাঠানোর একটি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু করার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই কিয়াউকতাও শহরে হামলার এ ঘটনা ঘটেছে। হাইকমিশনার মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষকে এ প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ফলকার টুর্ক পরিস্থিতির ভয়াবহতার কথা বিবেচনায় নিয়ে কাউকে মিয়ানমারে ফেরত না পাঠানোর জন্য ধারাবাহিকভাবে আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
ফলকার টুর্ক বলেন, ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনে জর্জর একটি দেশে কাউকে জোর করে ফেরত পাঠানোর সময় এখন নয়। কারণ, মিয়ানমারে ফিরে গেলে অনেকেই আবারও একই ধরনের সহিংসতার শিকার হওয়ার বাস্তব ঝুঁকিতে পড়বেন।’
আন্তর্জাতিক আইনে ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ (জোরপূর্বক ফেরত না পাঠানোর) নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো নিষিদ্ধ, যেখানে তিনি নিপীড়ন, নির্যাতন, গুরুতর ক্ষতি বা অন্য কোনো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।
ফলকার টুর্ক বলেন, ‘ফিরে যাওয়া অনেক মানুষের জন্য কী অপেক্ষা করছে, তা নিয়ে খুব বেশি সন্দেহের অবকাশ নেই। সেখানকার পরিস্থিতি নিরাপদ বা স্থিতিশীল—কোনোটিই নয়। এ অবস্থায় কাউকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তকে সত্যিকার অর্থে স্বেচ্ছায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বলা যায় কি না, তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।’
এমন পরিস্থিতিতে কী করা যেতে পারে, তা নিয়েও পরামর্শ দিয়েছেন ফলকার টুর্ক। তিনি বলেন, ‘বরং বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মতো যেসব দেশ শরণার্থীদের আশ্রয় দিচ্ছে, তাদের বিকল্প সমাধান খুঁজে দিতে এবং সহায়তা করতে অন্য দেশগুলোর এগিয়ে আসা প্রয়োজন।’
ফলকার টুর্ক বলেন, জীবনের ভয়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা লাখ লাখ মানুষকে অবশ্যই সুরক্ষা দিতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, বিদেশে আশ্রয় ও নিরাপত্তা চাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের মৌলিক মানবাধিকারকে যথাযথভাবে বিবেচনা করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।