গত মাসের শেষে শুরু হওয়া সেই প্রদর্শনীতে দেখানো হচ্ছে জাপান ছাড়াও বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশিত একটি মাঙ্গা বা কমিকস বই। কমিকসটিতে হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা হামলার এক দশক পর শুরু হওয়া কাহিনির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ছবির গল্পের মধ্য দিয়ে।

জাপানের বাইরে তেমন পরিচিতি না থাকলেও কমিকসটি জাপানে বেশ পরিচিত। হিরোশিমার সেই প্রদর্শনীতে ১০টি ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশিত সেই কমিকসের বই আর সেই সঙ্গে কমিকসের জন্য আঁকা মূল ছবি দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। কোরীয়, ফরাসি, ইংরেজি, চীনা, স্প্যানিশ, ইতালিয়ান, পর্তুগিজ, হিন্দি, ভিয়েতনামি ও রুশ ভাষায় কমিকসটি অনুবাদ করা হয়েছে।

কমিকসটির প্রথম অনুবাদ প্রকাশিত হয় ২০০৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় এবং সর্বশেষ দশম ভাষার অনুবাদ রুশ সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ২০১৯ সালে। আর মূল যে বই জাপানে, সেটা প্রথম পাঠকদের সামনে আনা হয়েছিল ২০০৩ সালে। নামী কোনো প্রকাশনার হাত ধরে নয়; বরং গ্রন্থকারের নিজের খরচে প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম সেই সংস্করণ। সেই মাঙ্গা কাহিনির জনপ্রিয় হয়ে উঠতে সময় বেশি লাগেনি। কাহিনির করুণ উপস্থাপন এবং এর পেছনে থেকে যাওয়া যুদ্ধবিরোধী পরোক্ষ অথচ গভীর আবেদন জাপানে এটাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। এই কাহিনির ওপর ভিত্তি করে একই নামে কার্টুন ছবি তৈরি হয়েছে, মঞ্চস্থ হয়েছে নাটক।

জাপানের মাঙ্গা শিল্পী ফুমিইয়ো কোনোর প্রধান একটি কাজ হিসেবে গণ্য সেই কমিকস বইয়ের শিরোনাম হচ্ছে ‘ইয়ুনাগি নো মাচি, সাকুরা নো কুনি’, বাংলা ভাষায় যার অনুবাদ হবে, ‘শান্ত সন্ধ্যার শহর, সাকুরা ফুলের দেশ’। যে ঘটনার বর্ণনা লেখক-শিল্পী সেখানে তুলে ধরেছেন তার শুরু ১৯৫৫ সালে, হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা হামলার ১০ বছর পর। পাশাপাশি কাহিনির দ্বিতীয় অংশে প্রতিফলিত বর্ণনার পটভূমিতে আছে হিরোশিমা ও টোকিও। আর যে সময়ের কথা সেখানে বলা হয়েছে তা হলো ১৯৮৭ ও ২০০৪ সাল; অর্থাৎ পারমাণবিক বোমা হামলার আরও অনেক পরে। মর্মান্তিক সেই ঘটনার স্মৃতি মানুষের মনে অনেকটা ঝাপসা হয়ে এলেও এর পরোক্ষ প্রতিক্রিয়া ভুক্তভোগীদের মন থেকে মুছে যায়নি। পারমাণবিক বোমার ধ্বংসলীলা কিছু মানুষের জীবনে এখন পর্যন্ত গভীর রেখাপাত করে চলেছে—তার বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনা এই কাহিনিতে আমরা খুঁজে পাই।

প্রথম অংশের কাহিনি ‘শান্ত সন্ধ্যার শহর’-এ বলা হয়েছে মিনামি হিরানো নামের এক বালিকার কথা। পারমাণবিক বোমা হামলায় প্রাণে বেঁচে যাওয়ার পর ১৯৫৫ সালে যে ছিল বয়ঃপ্রাপ্তির সন্ধিক্ষণে। মা ফুজিমির সঙ্গে হিরোশিমা শহরের কেন্দ্রস্থলের কাছে ঘিঞ্জি এক মহল্লায় থাকতেন তাঁরা। হিরোশিমা তখনো পারমাণবিক বোমা হামলার পর অনেকটা বিধ্বস্ত এক শহর। হামলায় মিনামি হারিয়েছেন তাঁর বাবা ও দুই বোনকে।

ছোট ভাই আসাহি প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ইবারাকি জেলার মিতো শহরে খালার কাছে। খালা তাঁকে পালকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। মা ফুজিমি দরজির কাজ করে কষ্টে সংসার চালাচ্ছেন। মিনামিকে মা সব সময় বলেন, তিনি হচ্ছেন বোকার হদ্দ। তবে মিনামিও একসময় ছোট একটি সওদাগরি অফিসে কেরানির কাজ খুঁজে পান। এর পর থেকে মা ও কন্যা আসাহিকে দেখার জন্য মিতো শহরে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে অর্থ জমাতে শুরু করেন।

এদিকে মিনামির অফিসের এক পুরুষ সহকর্মী মিনামির প্রতি প্রেমে পড়েন। তবে এ প্রেম নিয়ে মিনামি ছিলেন অনেকটাই উদাসীন। কেন, তা আমরা জানতে পারি আরও পরে। হামলার পর চোখের আড়ালে থেকে যাওয়া প্রতিক্রিয়া যখন ধীরে ধীরে আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়।

মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় মায়ের দেখাশোনা করার জন্য মিনামি কয়েক দিন অফিসে অনুপস্থিত ছিলেন। তখন তাঁর সেই অফিস সহকর্মী ইয়ুতাকা উচিকোশি একদিন পরিবারের খোঁজ নিতে তাঁদের বাড়িতে উপহার নিয়ে চলে আসেন। এভাবে আরও কয়েকবার ইয়ুতাকা বাড়িতে এলে মিনামিও তাঁর প্রেমে পড়েন। একদিন ইয়ুতাকা মিনামির ঘনিষ্ঠ হলে মিনামির মনের আয়নায় প্রতিফলিত হতে শুরু করে অতীতের কিছু ঘটনা। যেখানে তিনি দেখেন পারমাণবিক বোমা হামলায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁরা যেন ক্রমেই তাঁকে ঠেলে দিচ্ছেন ইয়ুতাকার থেকে অনেক দূরে কোথাও। মিনামি তখন পালিয়ে যেতে শুরু করেন তাঁর সেই প্রেমিকের কাছ থেকে। সঙ্গে চলে বোমার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া ছোট বোন এবং এ রকম আরও অনেকে। মিনামির মনের আয়নায় আরও ভেসে ওঠে বোমা হামলার বছর দুয়েক পর তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হয়ে বড় বোনের মারা যাওয়ার দৃশ্য।

এক দিন পর অফিসে গিয়ে ইয়ুতাকার কাছে তিনি ক্ষমা চান এবং বলেন দুঃসহ অতীতকে ভুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছেন। তবে মিনামি চাইলেও ভাগ্য অজান্তেই তাঁকে নিয়ে অন্য খেলার প্রস্তুতি তত দিনে শুরু করে দিয়েছে। ক্রমাগত ক্লান্তি আর অবসাদ তাঁকে পেয়ে বসলে অল্প দিনেই তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন এবং জানা যায়, তেজস্ক্রিয়তার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া তাঁর শরীরেও বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। এর পর থেকে ক্রমে দ্রুত তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ইয়ুতাকাও অফিসের অন্য সহকর্মীরাও মিনামিকে ভুলে না গিয়ে তাঁকে সঙ্গ দিতে নিয়মিত হাসপাতালে যান। অন্যদিকে জীবিত যে ভাই মিতো শহরে খালার সঙ্গে থাকেন, তাঁর কথাও অসুস্থ অবস্থায় প্রায়ই মনে পড়ে মিনামির। এরপর সেই ভাই আর খালা যেদিন তাঁকে দেখার জন্য হাসপাতালে এসে উপস্থিত হন, সেদিনই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মিনামি।

দ্বিতীয় পর্বের কাহিনিতে আছে, মিনামির পরের প্রজন্মের পক্ষেও কীভাবে বোমা হামলার প্রভাব এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না, সেই বাস্তবতার প্রতিফলন। পুরো কাহিনিতে একক যে বলিষ্ঠ বার্তা আমাদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে তা হলো, হিরোশিমার ভুক্তভোগীরা চাইলেও হিরোশিমাকে ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। হিরোশিমার নৃশংসতা যে প্রজন্মের দেয়াল ভেদ করে ছায়ার মতো চলছে তাঁদের সঙ্গে, বেদনাদায়ক সেই বাস্তবতার কথাই করুণ মাঙ্গা কাহিনির স্রষ্টা আমাদের শুনিয়েছেন। হিরোশিমার সেই নৃশংসতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁদের সত্তা, যেখানে তাঁরা প্রতিনিয়ত শুনতে পান সেই সব নিকটজনের আর্তচিৎকার।

মিনামির যে গল্প লেখক আমাদের সামনে ছবি আর বর্ণনার মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন, সেই মিনামি তো অন্য কেউ নন, বরং তাঁদেরই একজন। অল্প বয়সে সুন্দর একটি জীবনের জন্য যাঁর দেখে যাওয়া স্বপ্ন পারমাণবিক বোমা ভেঙে দিয়েছে নিষ্ঠুরভাবে।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন