সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মোদি সরকার যেসব কূটনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হয়েছে, সেসবের একটির মুখোমুখি হয় গত মাসে। সর্বশেষ এ সংকটের শুরু মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর স্ত্রী হজরত আয়েশা (রা.)-কে নিয়ে বিজেপির মুখপাত্র (বিশ্বজুড়ে নিন্দা ও সমালোচনার মুখে সাময়িক বরখাস্ত) নূপুর শর্মা ও শীর্ষ পর্যায়ের আরেক বিজেপি নেতার অবমাননাকর মন্তব্যকে ঘিরে।

বিজেপি নেতা-নেত্রীর মন্তব্যের নিন্দা জানিয়ে তাঁদের ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়েছে উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) সদস্যসহ এক ডজনের বেশি মুসলিম দেশ। এই দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বেশ মজবুত। চাপের মুখে বিজেপি বাধ্য হয়ে এক বিরল বিবৃতি জারি করে। তাতে বলা হয়, ‘তারা সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।’

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম টুইটারে সাংবাদিক জুবায়েরের অনুসারীর সংখ্যা পাঁচ লাখের (আধা মিলিয়ন) বেশি। সম্ভবত তিনিই প্রথম সাংবাদিক, যিনি কোনো সংবাদ চ্যানেলে নূপুর শর্মার টেলিভিশন বিতর্কের একটি ক্লিপ শেয়ার করেন। ওই বিতর্কেই মহানবী (সা.)–এর বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য করেন নূপুর।

মহানবী (সা.)–কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার সুযোগ দেওয়ায় ওই টেলিভিশন নেটওয়ার্কের মালিকপক্ষ ও অনুষ্ঠানের উপস্থাপকের সমালোচনা করেন মোহাম্মদ জুবায়ের। তবে সেখানে তিনি নূপুর শর্মার নাম উল্লেখ করেননি।

পরে আল-জাজিরাকে জুবায়ের বলেন, ‘আমি ওই অনুষ্ঠানের উপস্থাপকের ওপর বেশি চটেছিলাম। কারণ, তিনি তাঁকে (নূপুর শর্মা) কথা বলা সুযোগ করে দিয়েছেন। যখন অবমাননাকর মন্তব্য করা হলো, তাঁকে থামানো হয়নি। আমার খুবই খারাপ লেগেছিল। এ কারণেই (উপস্থাপকের ওপর বেশি রাগ হওয়ায়) যখন আমি টুইট করেছিলাম, নূপুর শর্মার নাম উল্লেখ করিনি বা তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্ট সামনে আনিনি।’
মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, ‘আমি তাঁদের (বিতর্কের আয়োজক নিউজ চ্যানেলের মালিকপক্ষ ও উপস্থাপিকাকে) সামনে আনতে (মুখোশ উন্মোচন করতে) চেয়েছিলাম। আসলে আমার লক্ষ্য ছিল ওই নিউজ চ্যানেল।’

মহানবী (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্যকে ঘিরে যখন মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বড় ধরনের কূটনৈতিক সংকট দেখা দেয়, তখন বিজেপির অনেক সমর্থক জুবায়েরকে গ্রেপ্তার করার দাবি তোলেন। টুইটারে ‘অ্যারেস্ট জুবায়ের’ হ্যাশট্যাগও ব্যবহার করতে দেখা যায়।

চলতি মাসের শুরুর দিকে ৩৯ বছর বয়সী এই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, তিনি বলেছেন, কয়েকজন ডানপন্থী হিন্দু সন্ন্যাসী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের (মুসলিমদের) প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত। ওই সন্ন্যাসীরা তাঁদের নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের অন্তত একজন এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর গণহত্যা চালানোরও ডাক দিয়েছিলেন। গত ২৭ জুন জুবায়েরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অল্ট নিউজের পথচলা

ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের বেঙ্গালুরু শহরের বাসিন্দা জুবায়ের ১০ বছরের বেশি সময় ধরে টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান নকিয়ায় সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১৭ সালে তিনি গুজরাটের আহমেদাবাদ শহরের আরেক সফটওয়্যার প্রকৌশলী প্রতীক সিনহাকে সঙ্গে নিয়ে অল্ট নিউজ প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রথম দিকে অল্ট নিউজে পুরোপুরি সময় দিতে পারেননি জুবায়ের। সংবাদমাধ্যমটি চালাতে প্রতীক সিনহার পাশে থেকে সহায়তা করে যাচ্ছিলেন তিনি। কারণ, তখনো তিনি নকিয়ার চাকরি ছাড়েননি। পরে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে চাকরি ছেড়ে পুরোদমে অল্ট নিউজে সময় দেওয়া শুরু করেন।


জুবায়ের-প্রতীক জুটির হাত ধরে প্রথম সফলতা আসে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ করা একটি প্রতিবেদন ভুয়া প্রমাণের মধ্য দিয়ে। ওই প্রতিবেদনে ফ্লাডলাইটের একটি ছবিকে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের বলে দাবি করে মন্ত্রণালয়। ছবিটি আসলে স্পেন-মরক্কো সীমান্ত থেকে তুলেছিলেন স্পেনের একজন আলোকচিত্রী। পরে বিষয়টি সংশোধন করে নিতে বাধ্য হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এর পর থেকে বেশ কিছু মিথ্যা দাবি ও ভুয়া খবরের প্রকৃত চিত্র ফাঁস করেছে অল্ট নিউজ। এর মধ্যে অনেকগুলোই ছিল ক্ষমতাসীন বিজেপি ও দলটির সমর্থকদের শেয়ার করা। এসবের জেরে জুবায়ের ও প্রতীককে গত পাঁচ বছরে একাধিক মামলা এবং নানা হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে।

বিজেপির ইসলামবিদ্বেষী কর্মকাণ্ড ফাঁস

মহানবী (সা.)–কে নিয়ে নূপুর শর্মার কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের বিষয়টি সামনে আনেন জুবায়ের। এর আগে চলতি বছরের শুরুর দিকে কয়েকটি ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি। ভিডিওগুলো ছিল ভারতের উত্তরাঞ্চরের শহর হরিদ্বারে ডানপন্থী সন্ন্যাসীদের আয়োজন করা বিতর্কিত একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের। সেখানে মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালাতে অস্ত্র ধরার আহ্বান জানানো হয় হিন্দুদের প্রতি।

ভিডিওগুলো সামনে আসার পর ওই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়া কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করতে বাধ্য হয় পুলিশ। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কট্টরপন্থী হিন্দু সন্ন্যাসী যতি নরসিংহানন্দ। অবশ্য পরে জামিনে মুক্তি পান তিনি।
পরে গত এপ্রিলে ভারতের বিতর্কিত সন্ন্যাসী বজরঙ্গ মুনি দাসের একটি ভিডিও ফাঁস করেন জুবায়ের। ভিডিওতে মুনি দাসকে উত্তর প্রদেশের সীতাপুর জেলায় ভাষণ দিতে দেখা যায়। সেখানে তিনি মুসলমান নারীদের ধর্ষণ করার হুমকি দেন। এরপর মুনি দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তিনিও জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।


এসব ভিডিও প্রকাশের জের ধরে ডানপন্থী হিন্দুরা জুবায়েরকে ‘ইসলামপন্থী’ ও ‘জিহাদি’ বলে সরাসরি আখ্যায়িত করেন। তাঁদের অভিযোগ, জুবায়ের উদ্দেশ্যমূলকভাবে এসব করছেন। এমনকি তাঁর ও অল্ট নিউজের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও তোলেন তাঁরা।

এদিকে ঘৃণা ছড়ানোর নানা অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহে পুলিশকে সহায়তাও করেছে অল্ট নিউজ। গত বছরের জুলাইয়ে ভারতের বেশ কয়েকজন মুসলিম নারীকে ‘সুল্লি ডিলস’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপে ভুয়া নিলামে তোলা হয়। ওই নারীদের মধ্যে ছিলেন অধিকারকর্মী ও সাংবাদিকেরাও।

গত জানুয়ারিতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। ‘বুল্লি বাই’ নামের একই ধরনের আরেকটি ভুয়া নিলাম অ্যাপে ১০০ জনের বেশি মুসলিম নারীর ছবি দেওয়া হয়। এ দুই অ্যাপ তৈরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে পুলিশের তদন্তে সহায়তা করে জুবায়ের ও তাঁর সংবাদমাধ্যম।

এসব কাজে জড়িত থাকার কারণে ডানপন্থী নানা হিন্দু গ্রুপ ও বিজেপির ঘনিষ্ঠদের চক্ষুশূল হয়ে পড়েন জুবায়ের। গত মাসে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে জুবায়েরের বিরুদ্ধে অন্তত পাঁচটি এফআইআর করা হয়। এসব অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেন তিনি। গ্রেপ্তার এড়াতে মাসখানেক পরিবার থেকে দূরেও ছিলেন।

আল-জাজিরাকে জুবায়ের বলেন, ‘পরিবারের সবাই আমার কারণে খুবই ভয়ে থাকেন। এমনকি তাঁরা আমাকে কাজ না ছাড়লে বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথাও বলেছেন। তাঁরা চাইতেন না আমি বাসা ছেড়ে চলে যাই। তবু এ কথা বলতেন এটা ভেবে, যদি আমি কাজ বন্ধ করি।’

‘মুসলিম পরিচয়ের জন্য টার্গেট’

জিয়া উস সালাম দ্য হিন্দু পত্রিকার একজন সাংবাদিক ও লেখক। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘জুবায়ের সেটিই করেছেন, যা ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমগুলো করতে ব্যর্থ হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গণমাধ্যমের উচিত সরকার বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মিথ্যা প্রচার-প্রচারণা উদ্‌ঘাটন করা। কিন্তু গণমাধ্যমগুলো তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই জুবায়ের ও তাঁর মতো অন্যদের মাধ্যমে এটা প্রকাশিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। জুবায়ের ঠিক তা-ই করেছেন।’

অল্ট নিউজের সহপ্রতিষ্ঠাতা সিনহা বলেন, তিনি ও জুবায়ের নানাভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। সিনহার দাবি, তবে সহকর্মী জুবায়ের তাদের (সরকারের) শিকার হয়েছেন মূলত তাঁর মুসলিম পরিচয়ের জন্য।

আল-জাজিরাকে সিনহা বলেন, ‘জুবায়ের তাঁর কাজ ও নীতিতে খুবই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একজন মানুষ।’

‘হুমকি সব সময়ই ছিল ও আগামী দিনও থাকবে, বিশেষ করে জুবায়েরের জন্য। কেননা তিনি একজন স্পষ্টবাদী কণ্ঠস্বর। ওই সব লোক, বিশেষত বিজেপির মধ্যে যাঁরা আছেন ও দলটির সমর্থকেরা স্পষ্টবাদী কণ্ঠস্বর ভীষণভাবে অপছন্দ করেন। তাই জুবায়েরের মতো ব্যক্তিদের দমাতে সম্ভব সবকিছু করবেন তাঁরা,’ বলেন সিনহা।
সম্প্রতি মহানবী (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের জের ধরে দেশ-বিদেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে জুবায়ের বলেছিলেন, তাঁর ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে হুমকি বেড়ে গেছে। তিনি বলেছিলেন, ‘এখন আমার মনে হয়, হুমকি গুরুতর হয়ে উঠেছে। কেননা অনেকে অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন; তাঁরা ভাবছেন, (মুসলিম বিশ্বের চাপে) ভারতকে এখন মাথা নোয়াতে হবে। তাঁরা এ-ও মনে করছেন, (ভারতের জন্য) নূপুর হুমকি হয়ে উঠছেন এবং এর সবই ঘটছে আমার জন্য; আমিই একমাত্র ব্যক্তি, যে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।’

নানা হুমকি সত্ত্বেও জুবায়ের বলছিলেন, তাঁকে যদি বলা হয়, এখন তিনি টেলিকম পেশা না ফ্যাক্ট–চেকিং, এর কোনটা বেছে নেবেন; তখন তিনি বলবেন, শেষেরটিই বেছে নেবেন। জুবায়ের বলেন, তিনি এটা চালিয়ে যাবেন, কেননা দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক সংবাদমাধ্যম বিদ্বেষের বিষয়গুলো সামনে আনছে না।

জুবায়েরকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

এদিকে বিবিসির খবরে বলা হয়, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মোহাম্মদ জুবায়েরকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন। বুধবার সর্বোচ্চ আদালত তাঁকে কারাগার থেকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ারও আদেশ দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, তাঁকে কারাগারে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই।


ভাষান্তর: মো. আবু হুরাইরাহ্‌ ও শেখ নিয়ামত উল্লাহ

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন