নির্বাচন–পরবর্তী গোলযোগের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। করোনা মহামারি–পরবর্তী অর্থনৈতিক অবস্থা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে সেখানে। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল মঙ্গলবার বেলা দুইটার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য সময়সীমা বেঁধে দেন রাজা। কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতাসীন জোট বারিসান ন্যাসিওনালের পক্ষ থেকে কোনো জোটকে সমর্থ না দেওয়ায় কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারেনি। জোটটি ৩০টি আসনে জয় পেয়েছে। তবে তারা কাউকে সমর্থন না দেওয়ায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

দেশটির সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত এখন রাজার হাতে। সাংবিধানিকভাবে তিনিই এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। দেশটির সংবিধানে রাজার পদটি আলংকারিক। তিনি সাধারণত রাজনৈতিক ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ কম করেন। কিন্তু বর্তমান অচলাবস্থা কাটাতে যাঁকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মনে করবেন, তাঁকে সরকারপ্রধান নিয়োগ করতে পারেন রাজা। গতকাল রাজা আল–সুলতান আবদুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন। সরকার গঠনের বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মালয়েশিয়ার নাগরিকদের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

আজ বুধবার তিনি আনোয়ার ইব্রাহিম, মুহিউদ্দিন ও বারিসান ন্যাসিওনালের আইনপ্রণেতাদের বৈঠকে ডেকেছেন। তবে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, ‘রাজার সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। তিনি তাতে শক্তিশালী সরকার গঠনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এ সরকার জাতি, ধর্ম, অঞ্চল বিবেচনায় আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে এবং অর্থনীতির দিকে গুরুত্ব দিতে পারবে।’

আনোয়ারের প্রগতিশীল জোট আসনের দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও এবারের নির্বাচনে মুহিউদ্দিনের জোটের দল ইসলামিক পার্টি দেশটিতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দলটি মালয়েশিয়ায় শরিয়াহ আইন চালুর কথা বলে প্রচার চালায়। দলটির উত্থান নিয়ে মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

এদিকে মালয়েশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের জাতি ও ধর্ম নিয়ে উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছে দেশটির পুলিশ। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে দেশটির শেয়ারবাজারে। গতকাল টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দেশটির শেয়ারের সূচকে পতন দেখা দিয়েছে। ইসলামিক পার্টির উত্থানে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। দেশটির জুয়া ও অ্যালকোহল পানের নীতিমালা নিয়ে সোচ্চার ইসলামিক পার্টি।

মালয়েশিয়া কয়েক বছর ধরেই রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে। কয়েক বছরের মধ্যে তিনজন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে মালয়েশিয়া। সম্প্রতি দেশটিতে ‘স্থিতিশীলতা’ ফেরানোর চেষ্টার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল সাবরি ইয়াকুব আগাম নির্বাচনের ডাক দেন। সাবরি ইয়াকুব ও মুহিউদ্দিনের জোট ক্ষমতাসীন জোট সরকারেরই অংশ। কিন্তু নির্বাচনে তাঁরা আলাদাভাবে লড়েছেন। এখন আনোয়ার ইব্রাহিম ও মুহিউদ্দিন উভয়ের পক্ষ থেকেই যথেষ্ট সমর্থনের কথা বলা হলেও কেউই সরকার গঠনে সমর্থকদের পাশে পাচ্ছেন না।

দেশটির ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের প্রভাষক নিক আহমেদ কামাল বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় সংখ্যালঘু সরকার গঠিত হতে পারে। অথবা রাজা আইনপ্রণেতাদের রায় নিয়ে তাঁদের পছন্দের প্রধানমন্ত্রী ঠিক করে দিতে পারেন। যদি সংখ্যালঘু সরকার গঠিত হয়, তবে পার্লামেন্ট চালুর পরপরই নতুন সরকারকে আস্থা ভোটের মুখে পড়তে হবে।’

নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল সাবরি ইয়াকুবের দল ইউনাইটেড মালয়জ ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (ইউএমএনও) নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট বারিসান ন্যাসিওনাল (বিএন) বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। ১৯৫৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে প্রতিটি সরকারে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে বারিসান। কিন্তু ২০১৮ সালে দলটি নির্বাচনে প্রথমবারের মতো হেরে যায়। তবে দুই জোটের লড়াইয়ের কারণে ২০২১ সালে ইসমাইল সাবরির নেতৃত্বে দলটি আবার ক্ষমতায় ফেরে। দুর্নীতির অভিযোগ বিশেষ করে, মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় তহবিল ওয়ান মালয়েশিয়ান ডেভেলপমেন্ট বেরহাদ বা ওয়ানএমডিবি লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে দলটির বিরুদ্ধে। কয়েক শ কোটি ডলারের অর্থ কেলেঙ্কারিতে মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের ১২ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। এটাই ইউএমএনও দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। এবারের নির্বাচনে তাদের এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচার চালান আনোয়ার ইব্রাহিম।

এবারের নির্বাচনে ছিলেন বর্ষীয়ান নেতা মাহাথির মোহাম্মদও। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ৯৭ বছর বয়সী মাহাথির মোহাম্মদ নিজের আসনেও হেরে গেছেন। এ পরাজয়কে তাঁর সাত দশকের রাজনৈতিক জীবনের ইতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।