উত্তর কোরিয়ার আয়ের উৎসগুলো
উত্তর কোরিয়ার পরমাণু পরীক্ষায় চরম নাখোশ প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়া ও তার মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। উভয়েই দরিদ্র অথচ পরমাণুশক্তির অধিকারী উত্তর কোরিয়াকে শায়েস্তা করতে দেশটির ওপর কঠোর বাণিজ্য ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা চায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা সদ্য আরেক দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন উত্তর কোরিয়ার ওপর। কিন্তু বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে যার অর্থনীতি সবচেয়ে কম বাণিজ্য-নির্ভর, তাকে এভাবে শায়েস্তা করার চেষ্টায় কতটা ফল আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অতি নিভৃতিকামী উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির অবস্থা আসলে কেমন? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া খুব কঠিন। কেননা, দেশটি কখনো তাদের বাণিজ্যের পরিসংখ্যান জানায় না। তেমনি জানায় না এর সম্পদের পরিমাণ। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ব্যাংক অব কোরিয়া) কিছু তথ্য-উপাত্ত দিয়ে উত্তরের অর্থনীতির হালহকিকত জানায়। তাদের তথ্যের উৎস বিভিন্ন দেশের সরকারি সংস্থা, নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৯৯১ সাল থেকে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরছে। এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঘটেছে ১ শতাংশ। ব্যাংক অব কোরিয়া জানায়, ২০১৪ সালে উত্তর কোরিয়ায় মোট আমদানি ও রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৯৯০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ২৪০ কোটি ডলার বাণিজ্য হয়েছিল দক্ষিণের সঙ্গে। এখন বন্ধ থাকা দুই কোরিয়ার যৌথ বাণিজ্য উদ্যোগ কেসং শিল্পপার্ক উত্তর কোরিয়ার আয়ের একটি বড় উৎস।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য: উত্তর কোরিয়ার বড় বন্ধু প্রতিবেশী বিশ্বশক্তি চীন। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বড় সহায়তাকারী ও বৃহৎ বাণিজ্য সহযোগীও চীন। দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার নিয়ন্ত্রিত কোরিয়া ট্রেড-ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এজেন্সির হিসাব অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া চীনে কয়লা, খনিজদ্রব্য, পোশাক ও কিছু খাদ্য সামগ্রী রপ্তানি করে। আর চীন থেকে আমদানি করে পেট্রোলিয়াম গ্যাস, ইস্পাত, যন্ত্রাংশ, গাড়ি ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী।
দক্ষিণ কোরিয়া বা যুক্তরাষ্ট্র উত্তরের পরমাণু পরীক্ষার পর তাদের শাস্তি দিতে যতই তৎপর হোক, চীন যে তা মেনে নেবে না, তা স্পষ্ট। উত্তর কোরিয়ার সরকারের নাজুক অবস্থা তাদের সীমান্তে শরণার্থীর বড় ঢল নামাতে পারে, এটা চীন জানে। ২০১৪ সালে উত্তর কোরিয়ার মোট বাণিজ্যের ৭৪ শতাংশই হয়েছে চীনের সঙ্গে।
কেসং শিল্পপার্ক: দুই কোরিয়ার মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের পর ২০০৪ সালে সীমান্তের কাছে কেসং শিল্পপার্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৫৬০ কোটি ডলার আয় করেছে উত্তর কোরিয়া। এ সময়ের মধ্যে দক্ষিণের ১২০টির বেশি কোম্পানিতে উত্তরের ৫৪ হাজারের বেশি মানুষের চাকরি হয়। উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক বিতর্কিত রকেট উৎক্ষেপণের পর দক্ষিণ কোরিয়া সাময়িকভাবে কেসং বন্ধ করে কর্মীদের সেখান থেকে সরিয়ে নেয়। উত্তর কোরিয়া এই শিল্পপার্ক থেকে অর্জিত অর্থ পরমাণু অস্ত্র বানাতে ব্যয় করছে—এটাই দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ। তবে উত্তর কোরিয়া সত্যিই ওই অর্থ পরমাণু অস্ত্র বানাতে ব্যবহার করছে কি না, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত কোনো তথ্য দেয়নি দক্ষিণ কোরিয়া।
বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি: উত্তর কোরিয়া বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ২০০০ সালের পর থেকে দেশটি বিদেশে জনশক্তি রপ্তানিতে নামে। আর এখন দেশটির আয়ের বড় উৎস এটি। কোরিয়া ট্রেড-ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এজেন্সির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অন্তত ৪০টি দেশে ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ উত্তর কোরীয় কর্মী আছে। উত্তর কোরিয়ায় মানবাধিকার-সংক্রান্ত জাতিসংঘের বিশেষ দূত মারজুকি দারুসমান বলেন, গত বছর দেশটির পাঁচ হাজারেরও বেশি প্রবাসী শ্রমিক ১২০ কোটি থেকে ২৩০ কোটি ডলার আয় করেছেন। উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকেরা মূলত রাশিয়া, চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের রেস্তোরাঁ ও নির্মাণ খাতে কাজ করছেন।
পর্যটন: উত্তর কোরিয়ার আয়ের একটি ক্রমবর্ধমান উৎস পর্যটন খাত। দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন, ২০১৪ সালে প্রায় এক লাখ পর্যটক আসেন। এর বেশির ভাগই চীনের পর্যটক। মাঝেমধ্যে উত্তর কোরিয়া দেশে আসা পর্যটকদের গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহসহ নানা অভিযোগে আটক করে। এরপরও এ শিল্প এগোচ্ছে।