শক্তিশালী সব ক্ষেপণাস্ত্র হাতে রাখায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কাঁধে নিয়ে ঘুরছে উত্তর কোরিয়া। তবে এসব তোয়াক্কা করেন না দেশটির নেতা কিম জং–উন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ‘শত্রুদের’ হামলা থেকে নিজের দেশকে রক্ষা করতে এসব অস্ত্র কাছে রাখাটা অতি গুরুত্বপূর্ণ।

উত্তর কোরিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্রের সব পরীক্ষাই চালানো হয়েছে উত্তর হ্যামগিয়ং প্রদেশের পুনগিয়ে–রি এলাকায়। এলাকাটি পবর্তে ঘেরা। সেখানে প্রথম পরীক্ষা চালানো হয়েছিল ২০০৬ সালের অক্টোবরে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় হামলা চালাতেই হয়তো এসব অস্ত্র দিয়ে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছেন কিম। ১৯৫০ সালে এমনই চেষ্টা করেছিলেন তাঁর দাদা কিম ইল সাং। তবে সে সময় তা সফল হয়নি। কিমের আরেকটি লক্ষ্য হতে পারে, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে কখনো যুদ্ধ বাঁধলে সিউলের পাশে যেন ওয়াশিংটন না দাঁড়ায়, সে ব্যবস্থা করা।

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা

এখন পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্রের ছয়টি পরীক্ষা চালিয়েছে। এর মধ্যে চারটি পরীক্ষা হয়েছে কিম জং–উন ক্ষমতায় আসার পর। ২০১১ সালে ক্ষমতায় বসেন তিনি। শিগগিরই যদি উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়, সেটি হবে দেশটিতে এ ধরনের অস্ত্রের সপ্তম পরীক্ষা।

উত্তর কোরিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্রের সব পরীক্ষাই চালানো হয়েছে উত্তর হ্যামগিয়ং প্রদেশের পুনগিয়ে–রি এলাকায়। এলাকাটি পবর্তে ঘেরা। সেখানে প্রথম পরীক্ষা চালানো হয়েছিল ২০০৬ সালের অক্টোবরে। ওই পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণে কোনো বড় ভবন বা শহরের অংশ বিশেষ ধ্বংস হতে পারে। অপরদিকে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে সর্বশেষ পরীক্ষাটি চালানো হয়। ওই বোমা ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্র যে বোমা ফেলেছিল, সেগুলোর চেয়ে অন্তত ১৬ গুণ বেশি শক্তিশালী।

অলাভজনক সংস্থা বুলেটিন অব দ্য অ্যাটোমিক সায়েন্টিস্টসের কর্মকর্তা হ্যানস ক্রিসটেনসেন ও ম্যাট কোরদার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এই মুহূর্তে উত্তর কোরিয়ার হাতে যে পরিমাণ ‘ফিসাইল ম্যাটেরিয়াল’ রয়েছে, তা দিয়ে ৪৫ থেকে ৫৫টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা যাবে। এরই মধ্যে হয়তো ২০ থেকে ৩০টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে তারা। ফিসাইল ম্যাটেরিয়াল হলো পারমাণবিক বোমা তৈরির মূল উপাদান।  

উত্তর কোরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালাতে হলে দূরপাল্লার আইসিবিএম ব্যবহার করতে হবে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছোড়ার পর মহাশূন্যে প্রবেশ করে। এরপর লক্ষবস্তুতে আঘাত হানার আগে আবার দ্রুতগতিতে বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিবিএম বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসার সময় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপ থেকে সেটিতে থাকা পারমাণবিক বোমা রক্ষা করার প্রযুক্তি থাকতে হবে উত্তর কোরিয়ার কাছে।

তবে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তাঁদেরই একজন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক অঙ্কিত পান্ডা। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, পিয়ংইয়ংয়ের কাছে এখন হয়তো ৪০ থেকে ৭০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা। এই বোমাগুলো অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা উত্তর কোরিয়ার যে সপ্তম পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা নিয়ে কথা বলছেন, তার কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া গেছে সম্প্রতি স্যাটেলাইট থেকে ধারণ করা কিছু ছবি থেকে। ছবিগুলোতে দেখা গেছে পুনগিয়ে–রি এলাকায় নতুন করে সুড়ঙ্গ খোঁড়া হচ্ছে, গড়ে তোলা হচ্ছে বিভিন্ন ভবন। এর আগেও পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার সময় সেখানে একই ধরনের কাজ করা হয়েছিল।

এবারের পরীক্ষায় কী ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে? বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের গণবিধ্বংসী অস্ত্র এবং এসব অস্ত্রের বিস্তার রোধসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ ভ্যান ডাইপেন। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, মনে করা হচ্ছে ওই পারমাণবিক অস্ত্রটি হবে ‘বিশাল আকারের’। সেটি ২০১৭ সালে পরীক্ষা চালানো পারমাণবিক বোমার চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে।

এ ছাড়া কৌশলগত হামলা ও যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যবহারের জন্য স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রে ছোট আকারের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করে দেখতে পারে উত্তর কোরিয়া। পাশাপাশি একবারে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর জন্য একটি আইসিবিএমে অনেক পারমাণবিক অস্ত্র স্থাপন করে পরীক্ষা চালানো হতে পারে।

তবে শেষ পর্যন্ত কোন ধরনের পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হবে তা না–ও জানা যেতে পারে বলে মনে করেন ভ্যান ডাইপেন। তাঁর ভাষ্যমতে, উত্তর কোরিয়ার বাইরে থেকে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়ার সুযোগটা খুবই কম। এমনকি বিস্ফোরণের দিনক্ষণ জানার পরও বোমার প্রভাব কতোটুকু হয়েছে তা জানা কঠিন।

উত্তর কোরিয়া কি জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ায় হামলা চালাতে পারে

এটা ঠিক যে উত্তর কোরিয়ার হাতে অনেক পারমাণবিক অস্ত্র আছে। তবে প্রশ্ন হলো, সেগুলো দিয়ে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র বা দক্ষিণ কোরিয়ায় হামলা চালাতে তাদের সক্ষমতা কতটুকু। এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাঁদের মতে, উত্তর কোরিয়ার এই সক্ষমতা নির্ভর করছে দুটি বিষয়ের ওপর। একটি হলো, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র বা দক্ষিণ কোরিয়ায় মতো দূরত্বে পারমাণবিক বোমা হামলার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র উত্তর কোরিয়া কাছে আছে কি না। আরেকটি হলো, স্বল্প, মধ্যম ও দূরপাল্লার—বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রে তারা পারমাণবিক বোমা স্থাপন করতে পারবে কি না।

এই মুহূর্তে উত্তর কোরিয়ার প্রথম সক্ষমতাটি আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালাতে সক্ষম এমন ক্ষেপণাস্ত্র কয়েক দশক ধরে দেশটির কাছে রয়েছে। বলা যায় ২০১৭ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ছোড়া হোয়াসং–১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের কথা। সেটি ১২ হাজার ৮৭৪ কিলোমিটার দূরে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। আর চলতি বছরের মার্চে পিয়ংইয়ং দাবি করেছে, হোয়াসং–১৭ নামে আরও দূর পাল্লার একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় সফল হয়েছে তারা।  

তবে বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র স্থাপন করতে পারে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। গত বছর যদিও জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, পরিচয় প্রকাশে নারাজ এক সদস্য দেশ জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার এখন স্বল্প, মধ্য ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রে পারমাণবিক অস্ত্র স্থাপন করার সক্ষমতা রয়েছে। এই তথ্য যদি সত্য হয়, তাহলে কোনো সন্দেহই থাকবে না যে দেশটি প্রতিবেশীদের ওপর পারমাণবিক হামলা চালাতে পারবে।  

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পারমাণবিক হামলা চালানোর বিষয়টি কিন্তু পিয়ংইয়ংয়ের জন্য আলাদা। কারণ, আইসিবিএম প্রযুক্তি। উত্তর কোরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালাতে হলে দূরপাল্লার আইসিবিএম ব্যবহার করতে হবে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছোড়ার পর মহাশূন্যে প্রবেশ করে। এরপর লক্ষবস্তুতে আঘাত হানার আগে আবার দ্রুতগতিতে বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিবিএম বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসার সময় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপ থেকে সেটিতে থাকা পারমাণবিক বোমা রক্ষা করার প্রযুক্তি থাকতে হবে উত্তর কোরিয়ার কাছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক মার্ক ফিটজপ্যাট্রিক বলেন, ‘আইসিবিএমগুলো বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসার সময় তাপমাত্রার বিষয়টি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা উত্তর কোরিয়ার নেই বলে মনে করেন অনেকে। তবে আমি মনে করি, এই সক্ষমতা তাদের আছে।’  

প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কবল থেকে বাঁচতে চলতি বছরে ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নে কাজ করেছে উত্তর কোরিয়া। এ ছাড়া ট্রেন ও সাবমেরিনের মতো বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাটফর্ম থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে দেশটি। এসবের লক্ষ্য হলো, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শনাক্ত ও ধ্বংসের পথ বন্ধ করা। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সহজে বহন করতে তরল জ্বালানির পরিবর্তে সলিড ফুয়েল (জমাট বাঁধা জ্বালানি) ব্যবহার করা হচ্ছে।

এ গেল উত্তর কোরিয়ার সক্ষমতার কথা। এবার আলোচনা করা যাক দেশটি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিমত্তা নিয়ে। উত্তর কোরিয়ার প্রতিবেশী দেশ দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও সেনাবাহিনী রয়েছে। দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যাও উত্তর কোরিয়ার চেয়ে বহু গুণে বেশি।

গবেষক মার্ক ফিটজপ্যাট্রিকের ভাষ্যমতে, প্রশান্ত মহাসাগরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিনগুলো থেকে উত্তর কোরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো যাবে। এ ছাড়া হামলা চালাতে প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের গুয়াম দ্বীপ থেকে বি–৫২ বোমারু বিমান পাঠানো যেতে পারে। তাৎক্ষণিক হামলা চালাতে দ্বীপটিতে মোতায়েন করা ক্ষেপণাস্ত্রগুলোও ব্যবহার করা যেতে পারে। আর ক্যালিফোর্নিয়ায় মোতায়েন করা আইসিবিএমগুলো তো বাড়তি হিসেবে আছেই।

সব মিলিয়ে উত্তরপূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া—দুই দেশের উদ্দেশ্য একই ধরনের বলে মনে করেন মার্ক ফিটজপ্যাট্রিক। তাঁর ভাষায়, ‘সমরাস্ত্র সমৃদ্ধ করার মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়া চাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনকে যুদ্ধে জড়ানো ঠেকাতে। আর যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে এ অঞ্চলে অস্ত্র সাজিয়ে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হামলা ঠেকাতে।’