নাচের মঞ্চ থেকে এবার যুদ্ধের ময়দানে রোবট—চীন কি ভবিষ্যতের যুদ্ধ বদলে দিচ্ছে

চীনের বেইজিংয়ের ‘ন্যাশনাল স্পিড স্কেটিং ওভাল’–এ দ্বিতীয় ‘বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমস’–এ অংশ নিচ্ছে একটি হিউম্যানয়েড রোবট। ২৬ আগস্ট ২০২৬ছবি: রয়টার্স

চীনে গত মাসে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমস’–এ মানুষের মতো দেখতে রোবট (হিউম্যানয়েড রোবট) লাফিয়েছে, বক্সিং করেছে, নেচেছে। দ্রুতগতির কয়েকটি রোবট ১০০ মিটার দৌড়ে কিংবদন্তি উসাইন বোল্টের চেয়েও বেশি গতি তুলেছে।

রোবটগুলোর সক্ষমতা বাড়তে দেখে দর্শকেরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। আবার রোবটের হোঁচট খাওয়ার দৃশ্যও তাঁদের আনন্দ দিয়েছে। সহজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিমে জায়গা করে নেওয়ার মতো ছিল এসব দৃশ্য।

দুই দিন পর এ আয়োজন থেকে ভিন্ন এক বার্তা দেয় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সরকারি সংবাদপত্র। ‘পিএলএ ডেইলি’ গবেষকদের আহ্বান জানায় গবেষণাগারে তৈরি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিকে দ্রুত সামরিক প্রশিক্ষণক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়ার কাজ ত্বরান্বিত করতে। লক্ষ্য, রোবটকে ‘যোদ্ধা’ হিসেবে তৈরি করা।

চীনের প্রতিরক্ষা খাত মানবসদৃশ রোবটের সামরিক ব্যবহার নিয়ে গবেষণা বাড়াচ্ছে। ভবিষ্যতে যুদ্ধে এসব রোবট মোতায়েনের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। চীনের সামরিক বাহিনীর শতাধিক ক্রয় বিজ্ঞপ্তি, গবেষণাপত্র, পেটেন্ট, সরকারি নথি ও প্রকাশনা এবং প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পেয়েছে রয়টার্স।

ব্যাংক অব আমেরিকা (বিওএ) গ্লোবাল রিসার্চের হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বে যত হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহ করা হয়েছে, তার প্রায় ৯৫ শতাংশই তৈরি করেছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সামরিক রোবট তৈরির সময় চীনের দ্রুত বেড়ে ওঠা রোবটশিল্পের সহায়তা পাচ্ছে পিএলএ।

আগে প্রকাশ্যে না আসা এসব নথিতে দেখা যায়, যুদ্ধক্ষেত্রে হিউম্যানয়েড রোবটকে কীভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, তা বুঝতে সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। রোবট ও সেগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রযুক্তি কেনার চেষ্টাও চলছে। সেনাসদস্যদের সঙ্গে রোবট কীভাবে কাজ করতে পারে, তা নিয়েও গবেষণা হচ্ছে।

২০২৫ ও ২০২৬ সালে এসব কর্মকাণ্ডে গতি আসে। গবেষণায় গুরুত্ব পাচ্ছে রোবটের আশপাশের পরিবেশ বোঝার ক্ষমতা, বিভিন্ন বস্তু ধরা ও নাড়াচাড়া করার দক্ষতা এবং রোবটকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য।

ব্যাংক অব আমেরিকা (বিওএ) গ্লোবাল রিসার্চের হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বে যত হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহ করা হয়েছে, তার প্রায় ৯৫ শতাংশই তৈরি করেছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সামরিক রোবট তৈরির সময় চীনের দ্রুত বেড়ে ওঠা রোবটশিল্পের সহায়তা পাচ্ছে পিএলএ।

চীনের রোবট নিয়ে এ সামরিক গবেষণা দেখাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে সামরিক প্রযুক্তি কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আধা স্বয়ংক্রিয় ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ড্রোন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে পথ নির্ধারণ ও লক্ষ্য শনাক্ত করে। এতে নজরদারি ও হামলার ধরন বদলে গেছে। রোবট ব্যবহার করে রসদ বহন এবং হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধারের কাজও হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এ সংঘাত থেকে চীনের সামরিক বাহিনী কীভাবে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করছে, তা আগেও নথিবদ্ধ করেছে রয়টার্স।

রাশিয়ার হামলার মধ্যে দক্ষিণ ইউক্রেনের একটি অজ্ঞাত স্থানে ফ্রন্টলাইনের কাছে কাজ করার সময় ৪২২তম আনম্যানড সিস্টেমস রেজিমেন্ট ‘লুফটওয়াফে’র এক ইউক্রেনীয় সেনা একটি র‍্যাম-২এক্স হামলাকারী ড্রোন উৎক্ষেপণের স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন। ২০২৬ সালের অজ্ঞাত তারিখে ছবিটি তোলা
ছবি: রয়টার্স

সামরিক প্রযুক্তির এ পরিবর্তনের ফলে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর আগ্রহ বাড়ছে।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের যন্ত্র ও মহাকাশ প্রকৌশলের অধ্যাপক ডেনিস হং বলেন, ‘যেখানে মানুষকে পাঠাতে চাই না, সেখানে রোবট পাঠানো যায়—রোবট তৈরির অন্যতম প্রধান কারণ এটি। একটি রোবট হারানোর অর্থ যদি একজন মানুষের জীবন বাঁচানো হয়, তবে প্রয়োজনে সেই রোবটকে বিসর্জন দেওয়া যেতে পারে।’

চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলজি (এনইউডিটি) সামরিক খাতে হিউম্যানয়েড রোবটের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি। এনইউডিটি পিএলএর প্রধান গবেষণাপ্রতিষ্ঠান।

তবে চীন পিএলএর কোনো সক্রিয় ইউনিটে অস্ত্রধারী হিউম্যানয়েড রোবট নামিয়েছে—এমন প্রমাণ পায়নি রয়টার্স। এসব রোবট চালাতে এখনো অনেক শক্তি লাগে। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রদর্শনের বাইরে এগুলো খুব একটা নির্ভরযোগ্যও নয়।

কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির যন্ত্র প্রকৌশলের অধ্যাপক অ্যারন জনসন বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক ধরনের অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি হয়। এসব পরিস্থিতি রোবটের সক্ষমতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

যেখানে মানুষকে পাঠাতে চাই না, সেখানে রোবট পাঠানো যায়—রোবট তৈরির অন্যতম প্রধান কারণ এটি। একটি রোবট হারানোর অর্থ যদি একজন মানুষের জীবন বাঁচানো হয়, তবে প্রয়োজনে সেই রোবটকে বিসর্জন দেওয়া যেতে পারে।
ডেনিস হং, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের যান্ত্রিক ও মহাকাশ প্রকৌশলের অধ্যাপক

শহরের যুদ্ধে

চীনের সামরিক বাহিনী শহুরে যুদ্ধে রোবট ব্যবহারের একটি ভবিষ্যৎ চিত্রও সামনে আনছে।

এ ক্ষেত্রে এনইউডিটির গবেষকেরা ছয়টি যুদ্ধরোবটকে দুটি আক্রমণকারী দলে ভাগ করার এক পরিকল্পনা করেছেন। দলে হিউম্যানয়েড রোবটের পাশাপাশি রোবট-কুকুর বা চালকবিহীন যান থাকবে। এসব রোবট স্থলসেনাদের সঙ্গে কাজ করে শত্রুর দখলে থাকা ভবন তল্লাশি ও শত্রুমুক্ত করবে—এক তলা থেকে অন্য তলা, এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে গিয়ে।

শহরে এ ধরনের অভিযান পরিচালনাকারী বাহিনীর ধারণা ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে এনইউডিটির শিয়ান পরীক্ষাকেন্দ্রের গবেষকদের প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে তুলে ধরা হয়। গবেষণায় এমন সরঞ্জাম ব্যবহার করে একটি শহুরে আক্রমণকারী বাহিনীর মডেল তৈরি করা হয়, যা গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে। তবে রোবটগুলো যুদ্ধে কখন ও কীভাবে শক্তি প্রয়োগ করবে, কোন ধরনের অস্ত্র বহন কিংবা বেসামরিক মানুষের মুখোমুখি হলে কেমন আচরণ করবে—এসব বিষয়ে গবেষণাপত্রে কিছু বলা হয়নি।

হিউম্যানয়েড রোবটের ভারসাম্য, পরিবেশ বোঝার ক্ষমতা ও দীর্ঘ সময় কাজ করার সক্ষমতার উন্নতি হলে ভবন, সুড়ঙ্গ কিংবা জাহাজের ভেতরের মতো জায়গায় এসব রোবট কাজে লাগতে পারে বলে মনে করেন তাইওয়ানের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চের গবেষক জুও-মিন চৌ।

জুও-মিন বলেন, দুটি হাত ও দুটি পা থাকায় তাত্ত্বিকভাবে হিউম্যানয়েড রোবট একই সঙ্গে চলাফেরা, ওপরে ওঠা এবং বিভিন্ন বস্তু ধরা বা নাড়াচাড়া করার কাজ করতে পারে।

বেইজিংয়ের ন্যাশনাল স্পিড স্কেটিং ওভালে বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমসের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে ইউনিট্রি রোবোটিকসের একটি হিউম্যানয়েড রোবট। ২৬ আগস্ট ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

তবে শুধু নজরদারি বা রসদ বহনের মতো তুলনামূলক সহজ কাজে চার পা, ট্র্যাক বা চাকার ওপর চলা রোবট ব্যবহার করা সস্তা ও সহজ। ফলে এসব রোবটকে বড় পরিসরে মোতায়েন করাও সহজ।

চীনের সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ভাষ্যেও হিউম্যানয়েড রোবটের সম্ভাব্য ভূমিকা আরও বিস্তৃত করে দেখা হচ্ছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ‘পিএলএ ডেইলি’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হিউম্যানয়েড রোবটের কাজ যুদ্ধক্ষেত্রে সহায়তা করা থেকে ভবিষ্যতে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর্যায়ে যেতে পারে। সেখানে এমন একটি সম্ভাবনার কথাও আলোচনা করা হয়, যেখানে একজন মানুষ কোনো জীবিত ব্যক্তিকে লক্ষ্য হিসেবে নিশ্চিত করার পর রোবটকে তাঁর ওপর গুলি চালানোর অনুমতি দেওয়া হতে পারে।

গত ডিসেম্বরে পিএলএর ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও প্রকাশ করে। সেখানে একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংঘাতে রোবটকে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে দেখা যায়।

চীনই অবশ্য একমাত্র দেশ নয়, যে সামরিক কাজে হিউম্যানয়েড রোবটের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীও সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য হিউম্যানয়েড রোবটের সক্ষমতা তৈরির জন্য একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। উদ্দেশ্য, ভবিষ্যতে এসব রোবট যেন সেনাসদস্যদের সঙ্গে কাজ করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বলেছে, এ রোবটের সম্ভাব্য ব্যবহারের তালিকায় রয়েছে নজরদারি, নিরাপত্তা, বাধা অপসারণ, বিপজ্জনক পদার্থ মোকাবিলা এবং শহুরে এলাকায় আক্রমণ ও প্রতিরক্ষামূলক অভিযান।

এ বছর সর্বোচ্চ ১০টি চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশেষজ্ঞদের সামনে তাদের প্রযুক্তি পরীক্ষা করবে। এরপর নির্বাচিত প্রযুক্তির উন্নয়নে সর্বোচ্চ ১২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত অর্থ দেওয়া হতে পারে।

তবে দুই ও চার পায়ের রোবট তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প চীনের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। রয়টার্স গত মাসে এক প্রতিবেদনে জানায়, হিউম্যানয়েড ও চার পায়ের রোবট তৈরিতে বিশ্বের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি চীনের ইউনিট্রি। প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া রোবট-কুকুরের নকশায় এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যার গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী অর্থ দিয়েছিল।

পেন্টাগন ও যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।

বেইজিংয়ে ন্যাশনাল স্পিড স্কেটিং ওভালে বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমসে দড়ি টানাটানি প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে ইউনিট্রির হিউম্যানয়েড রোবট ও বিএএআইয়ের ‘থর’ (টুওয়ার্ডস হিউম্যান-লেভেল হোল-বডি রিঅ্যাকশন) সিস্টেম। ২৫ আগস্ট ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

শত্রুপক্ষের এলাকায় অনুপ্রবেশ

২০২৪ সাল থেকে সামরিক কাজে হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারে চীনের আগ্রহ বাড়তে শুরু করে। ওই বছর এনইউডিটি ও চীনের একাডেমি অব মিলিটারি সায়েন্সেস একটি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিবিষয়ক ফোরাম আয়োজন করে। সেখানে হিউম্যানয়েড রোবটের সামরিক ব্যবহার নিয়ে একটি অধিবেশন ছিল। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে এনইউডিটি জবাব দেয়নি।

এক বছর পর ২০২৫ সালে এনইউডিটি হিউম্যানয়েড রোবটকে স্পষ্টভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের সরঞ্জাম হিসেবে উপস্থাপন করে। ওই বছরের জুনে একটি প্রতিযোগিতায় শত্রুপক্ষের এলাকায় অনুপ্রবেশের মহড়া চালানো হয়। সেখানে রোবটকে শত্রুপক্ষের এলাকায় ঢুকে পড়া, ওই এলাকার মানচিত্র তৈরি এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য খুঁজে বের করার কাজ দেওয়া হয়।

আরেকটি মহড়ায় রোবট দিয়ে সামরিক ঘাঁটিতে পরিচয় যাচাই, শৃঙ্খলাব্যবস্থা পরিদর্শন ও নিরাপত্তা টহলের কাজও করা হয়।

সামরিক বিশ্ববিদ্যালয় ওই প্রতিযোগিতাকে হিউম্যানয়েড রোবটকে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়ার পথে কার্যকারিতা যাচাইয়ের পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করে।

চীনের সামরিক বাহিনীর ক্রয়সংক্রান্ত নথিতেও শেষ পর্যন্ত এ লক্ষ্যই প্রতিফলিত হয়েছে।

২০২৫ সালের মে মাসে পিএলএ হিউম্যানয়েড রোবট কেনা, সেগুলো স্থাপন এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের জন্য একটি দরপত্র আহ্বান করে।

চার মাস পর আরেকটি ক্রয় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। সেখানে যোগাযোগের ঠিকানা হিসেবে এনইউডিটির একটি ই-মেইল ছিল। বিজ্ঞপ্তিতে এমন একটি ব্যবস্থা চাওয়া হয়, যার সাহায্যে হিউম্যানয়েড রোবট বুদ্ধিমানের মতো আশপাশ বুঝতে ও নিখুঁতভাবে বিভিন্ন কাজ করতে পারবে।

নথিতে খুব বেশি তথ্য ছিল না। দরপত্রের মাধ্যমে কেনাকাটা শেষ হয়েছিল কি না, তা জানতে পারেনি রয়টার্স। কেনা হয়ে থাকলে কোন প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছিল বা কোন মডেলের রোবট সরবরাহ করেছিল, তা-ও জানা যায়নি।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে ‘পিএলএ ডেইলি’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হিউম্যানয়েড রোবটের কাজ যুদ্ধক্ষেত্রে সহায়তা করা থেকে ভবিষ্যতে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর্যায়ে যেতে পারে। সেখানে এমন একটি সম্ভাবনার কথাও আলোচনা করা হয়, যেখানে একজন মানুষ কোনো জীবিত ব্যক্তিকে লক্ষ্য হিসেবে নিশ্চিত করার পর রোবটকে তাঁর ওপর গুলি চালানোর অনুমতি দেওয়া হতে পারে।

আরেকটি সামরিক ক্রয় নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে পিএলএ হিউম্যানয়েড রোবটের ক্যামেরা, রাডার ও চলাচলের তথ্য সংগ্রহ করার একটি ব্যবস্থা তৈরিতে প্রায় ৩ লাখ ডলার বরাদ্দ করে। রোবট কোন ধরনের ভূমিতে চলতে পারবে, সে তথ্যও সংগ্রহের কথা বলা হয়।

এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, চীনের সামরিক বাহিনীর আগ্রহ এখন আর শুধু রোবটকে শারীরিক অবয়বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা নয়; মঞ্চ বা নিয়ন্ত্রিত প্রদর্শনীর বাইরে রোবটকে কাজে লাগানোর প্রযুক্তিও তারা তৈরি করতে চায়। এর মধ্যে রয়েছে রোবটের আশপাশ বোঝা, বিভিন্ন বস্তু ব্যবহার করা ও রোবটকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা। প্রতিরক্ষাবিষয়ক গবেষকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে হিউম্যানয়েড রোবটকে কাজে লাগানোর জন্য এগুলো অপরিহার্য।

আরও পড়ুন

দূর থেকে পরিচালনা

২০২৬ সালের মধ্যে হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির কাজ সামরিক গবেষণার গণ্ডি পেরিয়ে চীনের প্রতিরক্ষাশিল্পেও ছড়িয়ে পড়েছে।

চীনের নরিনকোর তৈরি ফুসি রোবটটি পূর্ণ আকারের হিউম্যানয়েড রোবট। এটিকে প্রহরার দায়িত্ব, সব ধরনের আবহাওয়ায় নজরদারি, বুদ্ধিমানভাবে টহল দেওয়া ও বিপজ্জনক কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হচ্ছে।

বেইজিংয়ে ন্যাশনাল স্পিড স্কেটিং ওভালে বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমসে ১০০ মিটার দৌড়ে দলীয় সেমিফাইনালের সময় তিয়াংগং হিউম্যানয়েড রোবটগুলোর পাশে পড়ে গিয়ে ভেঙে পড়েছে একটি অনার হিউম্যানয়েড রোবট। ২৫ আগস্ট ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

ফুসিকে একটি দূরনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। এর মাধ্যমে মানুষ দূর থেকে রোবটটি পরিচালনা করতে পারে। এতে রোবটকে নিজে থেকে সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হিউম্যানয়েড রোবটের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। নরিনকো এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।

অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ম্যালকম ডেভিস বলেন, হিউম্যানয়েড রোবট এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী হয়নি। তিনি বলেন, ‘তবে ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এগুলো ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।’

আজকের দিনে দূর থেকে পরিচালিত হলেও ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করা রোবট তৈরি হলে নৈতিকতার প্রশ্নও সামনে আসবে।

আরও পড়ুন

যুদ্ধের আইন অনুযায়ী, যোদ্ধা ও বেসামরিক মানুষকে আলাদা করে শনাক্ত করতে হয়। আহত বা আত্মসমর্পণকারী যোদ্ধাদের ওপরও হামলা করা যাবে না।

আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি) সতর্ক করেছে, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থার পক্ষে এ ধরনের আত্মসমর্পণের মতো পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হতে পারে। কারণ, এমন সিদ্ধান্ত নিতে পরিস্থিতি, আচরণ ও উদ্দেশ্য বুঝতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহারের আগে আইনি পর্যালোচনা ও বাস্তব পরিবেশে পরীক্ষা করতে হবে। অস্ত্র ব্যবহারের সময় কমান্ডার ও পরিচালনাকারীদের যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গত মার্চে বলেছিল, এআইচালিত অস্ত্র মানুষের নিয়ন্ত্রণেই থাকা উচিত।

এসব উদ্বেগ থাকলেও সামরিক কাজে হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে চীন। চায়না একাডেমি অব মিলিটারি সায়েন্সেসের গবেষক ওয়াং ইয়ংহুয়া নভেম্বরে প্রকাশিত এক মন্তব্যে লিখেছেন, হিউম্যানয়েড রোবট এখনো ঠিকভাবে চলাফেরা করতে, আশপাশ বুঝতে ও বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করতে পারে না। এসব সমস্যার সমাধান হয়নি।

হিউম্যানয়েড রোবটকে সামরিক বাহিনীতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে হলে প্রযুক্তিতে বড় উন্নতি করতে হবে। উৎপাদন খরচ কমাতে হবে ও শিল্পকারখানায় অনেক রোবট তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে।

এসব শর্ত পূরণ হলে, ওয়াং লিখেছেন, ‘হিউম্যানয়েড রোবট যুদ্ধক্ষেত্রে দলে দলে নামবে।’

আরও পড়ুন