চীনের তৈরি কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা পেতে যাচ্ছে ইরান

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে চীন ও ইরানের জাতীয় পতাকা। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ফাইল ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে চীনে তৈরি কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম চালান কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পেতে পারে ইরান। এ চুক্তির বিষয়ে জানেন, এমন তিনটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে। তবে চীন এই খবর ‘পুরোপুরি ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, চীনের তৈরি সর্বোচ্চ ৪০০টি কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা কিনছে ইরান। এ চুক্তির মূল্য ৬০ থেকে ৭০ মিলিয়ন (৬ থেকে ৭ কোটি) ডলার।

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের মুখে নিজেদের স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয় ইরান। এর মধ্যে চীন থেকে প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা কেনার উদ্যোগ সবচেয়ে বড়। এই যুদ্ধে ইরানের সামরিক স্থাপনা ও কৌশলগত অবকাঠামো রক্ষায় তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, চুক্তির আওতায় ৩০০ থেকে ৪০০টি ম্যান-পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম (ম্যানপ্যাডস) কেনা হচ্ছে। এর মধ্যে চীনে তৈরি কিউডব্লিউ-১২ ও এফএন-১৬ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।

সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ঝংকিং বাওশাং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্টের সঙ্গে এ চুক্তি সই হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ইরান ও চীনের সরবরাহকারীর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।

যুদ্ধের কয়েক মাস পর অস্ত্রভান্ডার পুনর্গঠন করতে চাইছে ইরান

বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে সূত্রগুলো নিজেদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হয়নি। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল; কিন্তু তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।

তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘এ–সংক্রান্ত প্রতিবেদন পুরোপুরি ভিত্তিহীন। চীন সব সময় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সংঘাতের অবসানে ভূমিকা রেখে আসছে।’

হংকংভিত্তিক ঝংকিং বাওশাং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্টের মূল প্রতিষ্ঠান বেইজিংভিত্তিক ঝং কিং বাওশাং গ্রুপের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে ই–মেইল করেছিল রয়টার্স। কিন্তু তারা তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানায়নি।

পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে চলা এ যুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে। মার্কিন–ইসরায়েলের হামলার জবাবে দফায় দফায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের অস্ত্রভান্ডার পুনর্গঠন করতে চাইছে তেহরান।

উন্নত যুদ্ধবিমান ও নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অস্ত্রের হামলা থেকে স্থির সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা রক্ষা করা কতটা কঠিন, তা এই যুদ্ধ থেকে স্পষ্ট হয়েছে।

গত ১৭ জুন একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধ ছিল। কিন্তু সম্প্রতি তা আবার শুরু হয়েছে। তবে গত শুক্রবার থেকে ইরানে হামলা বন্ধের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে ইরানও পাল্টা হামলা স্থগিতের কথা জানায়।

কিন্তু আজ বুধবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ইরাকে ইরান–সমর্থিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর একাধিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়। একই সময়ে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে আকস্মিক হামলা চালায় ইরান। এ হামলার জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে।

যুদ্ধের এই পর্যায়ে শত শত ম্যানপ্যাডস পেলে ইরানের স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে দেশটির সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর হবে।

সূত্রগুলো সতর্ক করে বলেছে, চুক্তি সই হলেও সরবরাহের সময়সূচি, পরিমাণ ও বাস্তবায়নের অন্যান্য বিষয় পরিবর্তন হতে পারে।

সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, উভয় পক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম দফায় পশ্চিম চীনের উরুমচি থেকে আকাশপথে এসব অস্ত্র পাঠানো হবে। এরপর তা পাকিস্তানের ভূখণ্ড হয়ে ইরানে পৌঁছাবে। তবে এসব অস্ত্র পাকিস্তান থেকে ইরানে আকাশপথে যাবে, নাকি সড়কপথে, তা স্পষ্ট করেনি সূত্রগুলো।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ (আইএসপিআর) বলেছে, ‘চীন থেকে ইরানে আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্র সরবরাহে পাকিস্তানের জড়িত থাকার যে জল্পনা চলছে, তা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও মিথ্যা।’

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্রের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হয়েছিল; কিন্তু তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

‘চীন ও ইরান অস্ত্র সরবরাহে স্থলপথ ব্যবহারের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে’

গত দুই দশকে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও রাডার–ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এগুলো দ্রুত বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, অল্পসংখ্যক সেনা দিয়ে পরিচালনা করা যায় এবং ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করা যায়। ফলে স্থায়ী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার তুলনায় এগুলোকে সহজে লক্ষ্যবস্তু বানানো কঠিন।

ইউরোপের একটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, তাদের দেশের কর্মকর্তারা ইরানের কাছে কিউডব্লিউ সিরিজের ম্যানপ্যাডস বিক্রির সম্ভাবনা নিয়ে কয়েকটি চুক্তির আলোচনা সম্পর্কে জানেন। এর মধ্যে কিউডব্লিউ-১২, কিউডব্লিউ-১৮ ও কিউডব্লিউ-১৯ ব্যবস্থাও রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ইরান কিউডব্লিউ-১২ ও কিউডব্লিউ-১৮ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চেষ্টা করছিল। তবে এ বিষয়ে কোনো চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে কি না, তা তাদের জানা নেই।

কিউডব্লিউ-১২ ও এফএন-১৬ হলো কাঁধে বহনযোগ্য, ইনফ্রারেড (তাপের সংকেত শনাক্তকারী) নির্দেশনানির্ভর ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা। নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন মোকাবিলা করতে এগুলো তৈরি করা হয়েছে। সহজে স্থানান্তর করা যায় বলে সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে এগুলো দ্রুত মোতায়েন করা সম্ভব।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, নতুন কিউডব্লিউ-১৮ ও কিউডব্লিউ-১৯–এর তুলনায় কিউডব্লিউ-১২ কম সক্ষম। তবে ড্রোন ও নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া লক্ষ্যবস্তু ঠেকাতে স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষার একটি কার্যকর স্তর হিসেবে এসব ব্যবস্থা কাজ করতে পারে।

দুটি পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্র ও একজন ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চীনের সামরিক সরঞ্জাম ও দ্বৈত ব্যবহারের উপযোগী যন্ত্রাংশ আরও গোপনে পরিবহন এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে স্থলপথ ব্যবহারের বিষয়টিও খতিয়ে দেখেছে তেহরান।

প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত আমদানি নিয়ে বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও ইরান নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদন এবং বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতার সমন্বয় অব্যাহত রেখেছে—অস্ত্র কেনার নতুন এই চুক্তির মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হয়েছে।

এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, চীনের কাছ থেকে জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার জন্য ইরান আলাদা একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছিল। ওই আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছিল রয়টার্স। তবে চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।