বেইজিংয়ের সর্বোচ্চ ভবনে আঘাত
উড়োজাহাজটির পাইলটের ডায়েরিতে ‘আত্মহত্যার’ ইঙ্গিত, করতেন একাকী জীবনযাপন
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের সবচেয়ে উঁচু ভবনে গত শুক্রবার একটি ছোট উড়োজাহাজ আছড়ে পড়ার ঘটনায় নতুন তথ্য পাওয়া গেছে।
চীনের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই উড়োজাহাজের পাইলট তাঁর ডায়েরিতে ‘জীবন শেষ করে দেওয়া’ বা আত্মহত্যা নিয়ে লিখেছিলেন।
বেইজিংয়ের চাওইয়াং ডিস্ট্রিক্ট কর্তৃপক্ষের তরফে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই ঘটনায় এক বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। বিবৃতি অনুযায়ী, ঘটনাটির পেছনে ‘ব্যক্তিগত কারণ’ ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
সরকারি ওই বিবৃতিতে বলা হয়, দুর্ঘটনায় ৬৬ বছর বয়সী ওই পাইলট নিহত এবং আরও ১৩ জন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের কারও আঘাতই প্রাণঘাতী বা আশঙ্কাজনক নয়। তাঁদের একজনকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ওই সময় অফিস ছুটির পর লোকজন ঘরে ফিরছিলেন।
সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, দুর্ঘটনায় ৬৬ বছর বয়সী ওই পাইলট নিহত এবং আরও ১৩ জন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের কারও আঘাতই প্রাণঘাতী বা আশঙ্কাজনক নয়। আহত ব্যক্তিদের একজনকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বাণিজ্যিক এলাকায় এ ঘটনা ঘটায় বেইজিংয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। উড়োজাহাজের আঘাতে বেইজিংয়ের ১০৯ তলা সিআইটিআইসি টাওয়ারের কাচের দেয়ালে একটি বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। প্রাচীন চীনের একধরনের মদের পাত্রের আকৃতির সঙ্গে মিল থাকায় এ ভবনটিকে ‘জুন’ নামেও ডাকা হয়।
চাওইয়াং ডিস্ট্রিক্ট সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়, নিহত পাইলটের নাম শুধু ‘লিউ’ বলে শনাক্ত করা গেছে। তিনি প্রথমে দুই আসনের একটি প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজে অন্য একজনের সঙ্গে ওড়েন। এরপর বেইজিংয়ের শহরতলির একটি বিমানবন্দর থেকে তিনি একাই উড়োজাহাজটি নিয়ে উড্ডয়ন করেন। একপর্যায়ে নির্ধারিত রুট থেকে তিনি সরে যান এবং তাঁর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, লিউয়ের কোনো স্থায়ী চাকরি ছিল না। তিনি বিবাহবিচ্ছিন্ন ছিলেন ও একাকী জীবন যাপন করতেন। ভুগছিলেন অনিদ্রা ও দুশ্চিন্তাজনিত সমস্যায়। তাঁর ডায়েরিতে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার বিষয়ে একাধিকবার উল্লেখ ছিল।
উড়োজাহাজটি যদি আর কয়েক সেকেন্ড উড়তে পারত, তবে সেটি ঝাংনানহাইয়ের দিকেও আঘাত হানতে পারত। এমন কিছু ঘটলে তা বেইজিংয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য হতো বড় ধাক্কা।বিল বিশপ, চীনবিষয়ক বিশ্লেষক
উল্লেখ্য, উড়োজাহাজটি যেখানে আছড়ে পড়ে, সেটি ক্ষমতাসীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সদর দপ্তরের এলাকা ঝংনানহাই থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
শুক্রবারের ওই সংঘর্ষে সিআইটিআইসি টাওয়ারের একপাশের অংশে বড় গর্ত তৈরি হয়। পরে বোর্ড লাগিয়ে সেটি ঢেকে দেওয়া হয়।
ঘটনাটি নিয়ে জল্পনা–কল্পনা বাড়ছে। বিশ্বের অন্যতম কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকা একটি দেশের আকাশসীমায় কীভাবে উড়োজাহাজটি ঢুকল, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।
চীনে সেন্সরশিপ কোনো নতুন বিষয় নয়। দেশটিতে প্রকাশ্যে কমিউনিস্ট পার্টি, এটির শীর্ষ নেতা কিংবা সরকারের সমালোচনা করতে কমই দেখা যায়। কোনো আলোচনাকে যদি সরকারের প্রতি সমালোচনামূলক বলে মনে হয়, সেটি রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে বা স্পর্শকাতর কোনো বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে তা দ্রুতই অনলাইন ও জনপরিসর থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।
লিউয়ের কোনো স্থায়ী চাকরি ছিল না। তিনি বিবাহবিচ্ছিন্ন ছিলেন ও একাকী জীবন যাপন করতেন। ভুগছিলেন অনিদ্রা ও দুশ্চিন্তাজনিত সমস্যায়। তাঁর ডায়েরিতে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার বিষয়ে একাধিকবার উল্লেখ ছিল।
তবে এবারের সেন্সরশিপ শুধু এসব বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শুক্রবারের ঘটনার পর সিআইটিআইসি টাওয়ারের ছবি এবং ভবনটিকে ঘিরে তৈরি নানা মিম চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ঘটনাটির নাটকীয় ভিডিও চিত্রও মুছে ফেলা হয়েছে ইন্টারনেট থেকে।
বেইজিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এলাকা হিসেবে চিহ্নিত প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটারজুড়ে আকাশসীমায় উড়োজাহাজ চলাচল স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ। এর মধ্যে আছে তিয়েনআনমেন স্কয়ার ও ঝংনানহাই। কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত ঝংনানহাইতে দেশের শীর্ষ নেতারা বসবাস ও কাজ করেন।
চীনবিষয়ক বিশ্লেষক বিল বিশপ ওই ঘটনাকে বড় ধরনের নিরাপত্তাব্যর্থতা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, উড়োজাহাজটি যদি আর কয়েক সেকেন্ড উড়তে পারত, তবে সেটি ঝাংনানহাইয়ের দিকেও আঘাত হানতে পারত। এমন কিছু ঘটলে তা বেইজিংয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য হতো বড় ধাক্কা।
নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে বেইজিং সম্প্রতি ড্রোন ব্যবহারের নিয়ম আরও কঠোর করেছে। এখন রাজধানীতে কোনো ড্রোন আনা বা বাইরে নিয়ে যাওয়ার আগে নিবন্ধন করতে হয়।
শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষণাবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট রেমন্ড কুয়ো বলেন, বেশির ভাগ ড্রোনের তুলনায় বড় আকারের একটি ছোট উড়োজাহাজ শহরের বিশাল অংশের ওপর দিয়ে উড়ে এসে ঝাংনানহাইয়ের এত কাছে পৌঁছে যেতে পেরেছে। এটি ক্ষমতাসীনদের জন্য রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর এবং একই সঙ্গে বড় ধরনের নিরাপত্তাত্রুটিরও ইঙ্গিত দেয়।
রেমন্ডের মতে, ঘটনাটি পাইলটের ভুল বা উড়োজাহাজের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ঘটতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, এটি ‘ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানোর সম্ভাবনা’ও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।