মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলে নিয়ে যাওয়ায় চীনের কতটা ক্ষতি হবে

মিরাফ্লোরেস প্রাসাদে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোর সঙ্গে লাতিন আমেরিকায় নিযুক্ত চীনের শীর্ষ দূত চিউ শিয়াওছি। ২ জানুয়ারি ২০২৬, কারাকাসছবি: রয়টার্স

যখন মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের একদম কেন্দ্রে বিতর্কিত এক অভিযানের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো লাতিন আমেরিকায় নিযুক্ত চীনের বিশেষ দূত চিউ শিয়াওছির সঙ্গে হাসিমুখে ছবি তুলছিলেন এবং বেইজিংয়ের নেতৃত্বের প্রশংসা করছিলেন।

কারাকাসের মিরাফ্লোরেস প্রাসাদে হাসিমুখে কথা বলার সময় মাদুরো চীনের কূটনীতিক চিউ শিয়াওছিকে বলছিলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে তাঁর ভ্রাতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জানাই, তিনি বড় ভাইয়ের মতো।’

এর কয়েক ঘণ্টা পরেই মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট ‘ডেল্টা ফোর্স’–এর কমান্ডোরা স্ত্রীসহ মাদুরোকে তাঁর শয়নকক্ষ থেকে তুলে নিয়ে যান। ফলে চীন এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। তারা লাতিন আমেরিকায় তাদের অন্যতম বিশ্বস্ত সঙ্গীকে হারিয়ে ফেলল।

চীন-ভেনেজুয়েলা সম্পর্ক

চীন ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে কয়েক দশকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। রাজনৈতিক আদর্শের মিল ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার প্রতি দুজনেরই অনাস্থা এই বন্ধুত্বকে আরও মজবুত করেছে। ২০২৩ সালে দুই দেশের মধ্যে ‘যেকোনো পরিস্থিতির উপযোগী কৌশলগত অংশীদারত্ব’ তৈরি হয়, যার ফলে বেইজিং ভেনেজুয়েলাকে বিপুল অর্থনৈতিক সাহায্য ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছিল।

ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেলের বড় অংশ যায় চীনে। আর চীনের কোম্পানিগুলো সেখানে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।

ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ দুই দেশের সেই সম্পর্কে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, ভেনেজুয়েলার তেল এবং এই অঞ্চলে চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের ভবিষ্যৎ কী হবে।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর বন্দী অবস্থার এ ছবি ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

চীনের প্রতিক্রিয়া ও সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক

বেইজিং এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বের মোড়ল’–এর মতো আচরণ করার অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘উইবো’তে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সোমবার রাত পর্যন্ত এ–সংক্রান্ত পোস্টগুলোতে ৬৫০ কোটির বেশি ভিউ হয়েছে।

অনেক ব্যবহারকারী বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাঁদের বাড়ির পেছনের দেশ (ভেনেজুয়েলা) থেকে একজন নেতাকে তুলে নিয়ে যেতে পারে, তবে চীন কেন তাইওয়ানের ক্ষেত্রে এমনটা করতে পারবে না?

চীন দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে নিজেদের এলাকা বলে দাবি করে আসছে। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে তা দখলের শপথ নিয়ে রেখেছে।

চীনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান

অনলাইনে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাইওয়ান দখলের উত্তেজনা থাকলেও চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘দাদাগিরি’ বা হীন কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম না নিয়ে বলেন, ‘একতরফা গুন্ডামি আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা নষ্ট করছে।’ তিনি সব দেশকে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানান।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া লিখেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র যাকে “নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা” বলে, আসলে তা তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষা আর লুটপাটের এক ব্যবস্থা।’

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে চীন এখন সরব হলেও ২০২২ সালে যখন রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করেছিল, তখন চীন রাশিয়ার নিন্দা না করে উল্টো যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোকেই দোষ দিয়েছিল।

তেল সরবরাহ ও অর্থনীতি

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভেনেজুয়েলার এ ঘটনায় চীনের তেল সরবরাহে খুব বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ, ভেনেজুয়েলার বর্তমান তেল উৎপাদন অনেক কমে গেছে। তা ছাড়া চীনের যেসব ছোট বেসরকারি শোধনাগার ভেনেজুয়েলা থেকে জ্বালানি তেল কিনত, তারা মূলত সস্তায় পাওয়ার কারণেই কিনত।

ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, চীন হয়তো তেল কেনা চালিয়ে যেতে পারবে। তবে সেই বিশাল ছাড় আর থাকবে না।

গত ১০ বছরে চীন ভেনেজুয়েলাকে ৬ হাজার ২০৫ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে, যা দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দেশে চীনের দেওয়া ঋণের অর্ধেক। ফলে ভেনেজুয়েলা বিশ্বের বৃহত্তম চীনা অর্থ সহায়তাপ্রাপ্ত দেশে পরিণত হয়েছিল।

ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে নিউইয়র্কের আদালতে নিয়ে যাচ্ছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। এ সময় তাঁর কপালে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। ৫ জানুয়ারি ২০২৬, ম্যানহাটান
ছবি: রয়টার্স

‘তাইওয়ান ভেনেজুয়েলা নয়’

ভেনেজুয়েলার ঘটনা দেখে চীন উৎসাহিত হতে পারে কি না, এমন প্রশ্নে তাইওয়ান খুব একটা বিচলিত নয়। তাইওয়ানের ক্ষমতাসীন দলের আইনপ্রণেতা ওয়াং টিং-ইউ বলেন, ‘চীন যুক্তরাষ্ট্র নয়, আর তাইওয়ানও ভেনেজুয়েলা নয়। চীন সব সময়ই তাইওয়ানের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে। কিন্তু তাদের সেই সক্ষমতা (যুক্তরাষ্ট্রের মতো) নেই।’

বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম ইয়াং বলছেন, এ ঘটনা তাইওয়ান দখলের ব্যাপারে চীনের পরিকল্পনাকে সরাসরি বদলে দেবে না। কারণ, তাইওয়ান দখল করতে হলে চীনকে তার নিজের অর্থনীতি এবং সামরিক সক্ষমতার কথা ভাবতে হবে।

তবে ওই আইনপ্রণেতা সতর্ক করে বলেন, ‘তাইওয়ানের জন্য শিক্ষা হলো, পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজনে সামরিক শক্তির ব্যবহার এখন পৃথিবীতে ‘নতুন এক স্বাভাবিক’ বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। তাইওয়ানকে নিজের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে।’

লাতিন আমেরিকায় প্রভাব

রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক ড্যান ওয়াং বলছেন, মাদুরোর পতন বেইজিংয়ের জন্য একটি বড় কৌশলগত ধাক্কা। তবে বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে চীনের যে বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে, সেখান থেকে চীনা কোম্পানিগুলোকে সরানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে। কারণ, তাতে ওই অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বেইজিং এখন হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থটুকু রক্ষার চেষ্টা করবে।